সংবাদ শিরোনাম
কেরানীগঞ্জে প্লাস্টিকসামগ্রী তৈরি কারখানায় অগ্নিকাণ্ডে এ পর্যন্ত ৮জনের মৃত্যু | গ্রামবাসীর অর্থায়নে তৈরি হচ্ছে মৌলা নদীর উপর ‘স্বপ্নের জনতা’ ব্রীজ | নোবিপ্রবিতে শিক্ষক সমিতি নির্বাচনে লড়বে আওয়ামী পন্থী দুই দল | জাতীয় স্মৃতিসৌধ ১২-১৫ ডিসেম্বর সর্বসাধারণের প্রবেশ বন্ধ | বেনাপোল ইমিগ্রেশনের কার্যক্রম ৬টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত করার নির্দেশ জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের | টাঙ্গাইলে ফসলি জমির মাটি ইটভাটায় বিক্রি এলাকাবাসীর ক্ষোভ | কাপাসিয়ায় সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ৩, আহত ২ | শিশুকে ধর্ষণ করে রক্তাক্ত অবস্থায় ফেলে গেল ১৪ বছরের কিশোর! | বনানীতে বাসার পাশে মাটিতে পোঁতা চীনা নাগরিকের লাশ | যশোরের চৌগাছায় নববধূকে ধর্ষণ করল চা-দোকানি! |
  • আজ ২৭শে অগ্রহায়ণ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

ছেলেধরা খবরে দেশজুড়ে আতঙ্ক: গণপিটুনিতে প্রাণ যাচ্ছে নিরপরাধ মানুষের!

৫:৩১ অপরাহ্ণ | রবিবার, জুলাই ২১, ২০১৯ আলোচিত
Dhaka

পলাশ মল্লিক, চীফ রিপোর্টার, সময়ের কণ্ঠস্বর: শহর কিংবা গ্রাম, দেশ জুড়ে সাধারণ মানুষের কাছে নতুন আতঙ্কের নাম ছেলে ধরা! তবে শহরের চেয়ে গ্রামে এর প্রভাব পড়ছে অনেক বেশি। প্রতিটি বাবা-মা তাদের শিশু সন্তানদের নিয়ে বর্তমানে বেশ চিন্তিত। বাস্তব চিত্র যাই হোক না কেন  সমাজের নতুন আতঙ্ক এটি। পদ্মাসেতু নির্মাণে মানুষের মাথা লাগবে বলে একটি গুজব ছড়ানোকে কেন্দ্র করে সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন স্থানে ছেলেধরা সন্দেহে গণপিটুনিতে মর্মান্তিকভাবে কমপক্ষে ২৫ জন আহত এবং ৫ জন নিহত হয়েছেন। অন্যদিকে এই গুজবের কারণে বেড়াতে বা কাজে অপরিচিত কোন স্থানে গিয়ে নানা ভাবে হয়রানির শিকারও হচ্ছেন অনেকেই ।  তবে এ থেকে মুক্তির উপায় কি?  তাছাড়া ছেলেধরা সন্দেহে গণপিটুনির দায় নিবে কে? যাদের পরিবার ক্ষতিগ্রস্থ তাদের কি হবে?

গত কয়েকদিন ধরে সারা দেশে একটি খবর বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে তা হলো ঐ এলাকায় শিশুর কাটা মাথা সহ ছেলেধরা আটক হয়েছে। ঐ এলাকায় গিয়ে দেখা যায় আরেক ’ঐ’ এলাকার কথা যা বাস্তবে খুজেঁ পাওয়া যায় না, এভাবেই চলছে। দিন ‍দিন এর ভয়াবহতা আরও প্রকট হচ্ছে! ছেলেধরা রোগে যেন দিন দিন দেশের সবাই  আক্রান্ত হচ্ছে! আর যার কারণে প্রাণ দিতে হচ্ছে নিরপরাধ কিছু মানুষকে।

কোথাও কোথাও এমনও  শোনা গেছে বাজারের ব্যাগে ২/৩টা ‍বাচ্চার মাথা নিয়ে যাওয়ার ‍সময় ব্যাগে রক্ত দেখে ঐ এলাকার জনগন ছেলেধরা আটক করেছে। এবং বিষয়টি এই এলাকার জনৈক ব্যক্তি দেখে এসেছেন বলে প্রচার পায়, যা মুহূর্তেই কয়েক গ্রামে ছড়িয়ে পড়ে। এমন কয়েকটি খবর আমলে নিয়ে কাজ ‍শুরু করে ‍সময়ের কণ্ঠস্বরের অনুসন্ধানী দল যা পরবর্তীতে ভূয়া খবর প্রমানিত হয়।  গতকাল শনিবার সকালে আমাদের অনুসন্ধানী দলের কাছে এমনই এক খবর আসে। জানানো হয় গাজীপুর জয়দেবপুর চৌরাস্তায় বাজারের ব্যাগে কয়েকটা কাটা মাথা নিয়ে যাওয়ার সময় এক মহিলাকে আটক করা হয়েছে। ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায় স্থানীয় জনগন ছেলেধরা সন্দেহে এক মধ্য বয়সী নারীকে গণধোলাই দিয়েছেন। তার অপরাধ রাস্তার পাশে এক শিশুকে বিস্কুট খেতে দিচ্ছিলো সে, তা দেখে স্থানীয়রা ধারণা করেন মহিলাটি ছেলেধরা। সময়ের কণ্ঠস্বরের অনুসন্ধানে জানা যায়  গণধোলাইয়ের শিকার মহিলা মানষিকভারসাম্যহীন। তার বাড়ি নেত্রকোনা জেলাতে।  আর যারা ছেলেধরা বলে গণপিটুনির শিকার হয়েছেন তাদের অধিকাংশ মানষিক ভারসাম্যহীন অথবা ফেরি করে জীবিকা নির্বাহ করা খেটে খাওয়া মানুষ।

এরই ধারাবাহিকতায় গতকাল ‍শনিবার নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে নিজের মেয়েকে দেখতে গিয়ে ছেলেধরা সন্দেহে গণপিটুনিতে নিহত হন সিরাজ নামের ব্যক্তি। বাক ও শ্রবণ প্রতিবন্ধী হওয়ায় ঘটনার সময় কিছুই বলতে পারেননি সিরাজ। ১০ বছর আগে সিরাজের সঙ্গে বিয়ে হয় শামসুন্নাহারের। বিয়ের পরে তাদের মিঞ্জু নামে এক কন্যা সন্তান জন্ম নেয়। পরে ২০১৫ সালে সিরাজ শামসুন্নাহারকে নিয়ে সিদ্ধিরগঞ্জের সাইলো এলাকার মোহন চান্দের বাড়িতে ভাড়া বাসায় বসবাস শুরু করেন। বেশ কিছুদিন তাদের সম্পর্ক ভালোই ছিল।

এখানেই শামসুন্নাহারের সঙ্গে পরিচয় হয় মান্নান নামের এক ব্যক্তির। এরপর পরকীয়ায় জড়িয়ে পড়ে তারা। এরই পরিপ্রেক্ষিতে আট মাস আগে শামসুন্নাহার সিরাজকে তালাক দিয়ে মান্নানকে বিয়ে করে। শামসুন্নাহার ৭ বছরের কন্যা মিঞ্জুকেও তার কাছে নিয়ে আসেন। এরপর থেকে প্রতিবন্ধী সিরাজ নিজের মেয়ে মিঞ্জুকে দেখতে প্রায়ই সিদ্ধিরগঞ্জের পাগলা বাড়ি এলাকায় আসতেন। শনিবারও নিজের মেয়েকে দেখতে আসেন সিরাজ। কিন্তু ছেলেধরা সন্দেহে তাকে গণপিটুনিতে হত্যা করা হয়।

অন্যদিকে ঢাকার কেরানীগঞ্জের হজরতপুর ইউনিয়নের রসুলপুর গ্রামে গত শুক্রবার রাত সাড়ে আটটার দিকে ছেলেধরা সন্দেহে অজ্ঞাতপরিচয় দুই যুবককে গণপিটুনি দেওয়া হয়। এ ঘটনায় একজনের মৃত্যু হয়। অপরজনকে গুরুতর আহত অবস্থায় উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়েছে। জানা যায় ঘটনার দিন সন্ধ্যায় রসুলপুর গ্রামে শরীফ মিয়ার বাড়ির সামনে দুই যুবক ঘোরাফেরা করতে থাকেন। এলাকাবাসীর সন্দেহ হলে তাদের ঘোরাফেরার কারণ জিজ্ঞাসা করলে দুই যুবক ঠিকঠাক উত্তর দিতে না পারায় এলাকাবাসী ক্ষিপ্ত হয়ে দুই যুবককে পিটুনি দেয়। এতেই মারা যায় একজন।

ছেলেধরা গুজবে বাদ পরেনি রাজধানী ঢাকাও। গতকাল শনিবার রাজধানীর উত্তর বাড্ডা এলাকায় নিজের সন্তানদের স্কুলে ভর্তির খবর জানতে এসে গণপিটুনিতে নিহত হয় এক নারী।  ছেলেধরা সন্দেহে গণপিটুনির শিকার হন তিনি। জানাযায়, সকাল নয়টার দিকে উত্তর বাড্ডা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সামনে এ ঘটনা ঘটে।  পরে জানা যায়,  নিজের সন্তানকে ঐ ‍স্কুলে ভর্তি করা যাবে কিনা এ খোজঁ নিতেই বিদ্যালয়ে এসেছিলেন ঐ নারী।  এ সময় স্কুলের সামনে প্রবেশপথে থাকা অভিভাবকেরা তাঁকে ভেতরে যাওয়ার কারণ জানতে চান। ওই নারী সন্তানকে স্কুলে ভর্তি করাবেন বলে জানান। স্কুলে শিক্ষার্থী ভর্তি নেওয়া হচ্ছে না—জানিয়ে ওই নারীকে প্রধান শিক্ষিকার কক্ষে নেন তাঁরা। এ সময় চারপাশে খবর ছড়িয়ে পড়ে যে স্কুলে ছেলেধরা এসেছে। এ খবরে স্কুলে লোকজন ভিড় জমায়। এর কিছুক্ষণ পরই ছেলেধরা সন্দেহে স্কুলের বাইরে এনে ওই নারীকে মারধর করা হয়। পুলিশ ওই নারীকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসকেরা তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।

এ বিষয়ে পুলিশ সদর দপ্তর থেকে গতকাল শনিবার (২০ জুলাই) গণমাধ্যমে পাঠানো সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে দেশবাসীর কাছে আহ্বান জানানো হয়,  কাউকে ছেলেধরা সন্দেহ হলে গণপিটুনি না দিয়ে পুলিশের হাতে তুলে দেওয়ার জন্য। এতে আরও বলা হয়, ‘পদ্মাসেতু নির্মাণে মানুষের মাথা লাগবে বলে একটি গুজব ছড়ানোকে কেন্দ্র করে সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন স্থানে ছেলেধরা সন্দেহে গণপিটুনিতে মর্মান্তিকভাবে কয়েকজনের প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। গুজব ছড়িয়ে দেশের অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরি করা রাষ্ট্রবিরোধী কাজের সামিল এবং গণপিটুনি দিয়ে মৃত্যু ঘটানো ফৌজদারী অপরাধ।’

ছেলেধরা সন্দেহে গণপিটুনির শিকার হয়ে এ পর্যন্ত যতগুলো নিহতের ঘটনা ঘটেছে পুলিশ প্রত্যেকটি ঘটনা আমলেনিয়ে তদন্তে নেমেছে বলে জানানো হয়েছে। এসব ঘটনায় জড়িতদের আইনের আওতায় আনা হচ্ছে বলেও উল্লেখ করা হয় বিজ্ঞপ্তিতে।

তবে এ ধরণের গুজব থেকে জনসাধারণকে দুরে রাখতে জনসচেতনতা সৃষ্টি করতে প্রশাসন যেমন ব্যর্থ  হয়েছে তেমনি দেশের গণমাধ্যম গুলো। গণপিটুনী বলে দেশে যে হত্যা কান্ড ঘটানো হচ্ছে এর দায় কার ? যারা গণপিটুনির সাথে জড়িত, না কি যারা গুজব ছড়িয়ে এই পরিবেশটি তৈরি করেছেন তারা? নাকি আমাদের অসচেতনতা?  দোষ যারই হোক না কেন ‍যারা নির্মম এই ঘটনার শিকার হয়েছেন তাদের পরিবার রাষ্ট্রের কাছ থেকে কতটা সহযোগিতা পাচ্ছেন। নিহতদের পরিবার গুলোর প্রতি কি রাষ্ট্রের কোন দায় নেই?

Loading...