সংবাদ শিরোনাম
নরসিংদীতে প্রথমবারের মতো সর্বাধুনিক কার ওয়াশ ও সার্ভিসিং সেন্টার উদ্বোধন | রাজধানীতে ছিনতাইয়ের প্রস্তুতিকালে ‘ফইন্নি গ্রুপের’ ৬ সদস্য আটক | এবার চমেক চিকিৎসকদের জন্য ‘নোবেল’ চাইলেন মেয়র নাছির | তানোরে অবৈধ এসটিসি ব্যাংক সিলগালা | ফাঁড়িতে আসামির মৃত্যু: পুলিশ-এলাকাবাসীর সংঘর্ষে আহত ৩৩, পাঁচ পুলিশ প্রত্যাহার | লালমনিরহাটে সহকারী পরিচালকের বেত্রাঘাতে স্কুলছাত্রী অজ্ঞান | সাগরে মৎস আহরণে নিষেধাজ্ঞা, ফিশারিঘাট হারিয়েছে চিরাচরিত রুপ | ‘আবরার পানি খাইতে চাইলে পানি দেওয়া হয় নাই’ | নান্দাইলে নিষিদ্ধ পলিথিন ব্যাগ রাখায় ৫০ হাজার টাকা জরিমানা | মাগরিবের আজানের ২০ মিনিটের মধ্যে ছাত্রীদের হলে ঢোকার নির্দেশ! |
  • আজ ২রা কার্তিক, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

গুটিকয়েক গডফাদারদের নিয়ন্ত্রণে  শাহ্ আলী থানা এলাকার ভয়াবহ মাদক সিন্ডিকেট!

৯:১৯ অপরাহ্ণ | বৃহস্পতিবার, জুলাই ২৫, ২০১৯ ঢাকা
Dhaka

নিজস্ব প্রতিবেদক, সময়ের কণ্ঠস্বর: ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপির) মিরপুর বিভাগের শাহ্ আলী থানা এলাকার  মাদক সিন্ডিকেটের আন্ডারওয়ার্ল্ডে তারা ডন হিসেবে পরিচিত। কেউ কেউ বলেন গডফাদার। তাদের হাতেই শাহ্ আলী থানা এলাকার মাদক সাম্রাজ্যের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ। ওয়ার্ড, থানা বা মহানগর পর্যায়ের নেতা পরিচয় দিয়ে খুশি হন তারা।

বাবুল তালুকদার, শাহ্ আলী থানা এলাকার মাদক সিন্ডিকেটের মহাগুরু বলা হয় তাকে। তবে সবসময়ই থাকেন ধরাছোঁয়ার বাইরে। স্থানীয় সর্বোচ্চ লেবেলের কয়েকজন সরকার দলীয় রাজনৈতিক নেতানেত্রীদের আশীর্বাদপুষ্ট হওয়ায় থানা পুলিশও বিব্রতকর পরিস্থিতিতে থাকে। স্থানীয়দের অভিযোগ, থানা এলাকার চিহ্নিত বেশিরভাগ মাদক ব্যবসায়ীদের অর্থের যোগানদাতা এই বাবুল তালুকদার। তবে তিনি থানা এলাকার চিহ্নিত মাদক সম্রাটদের অলিখিত গডফাদার হলেও এই বিশাল মাদক সম্রাজ্যে তার পদচারণা একটু কৌশলপূর্ণ। গুদারাঘাট ৯ তলার সামনের বস্তির মালিক এই বাবুল। আর এই বাড়ির কেয়ারটেকার হেনা পুলিশের তালিকাভুক্ত শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ী। এই বস্তির পুরোটাই একটি মাদকের আস্তানা। অনুসন্ধান বলছে মাদক সম্রাজী হেনাসহ চিহ্নিত নারী মাদক ব্যবসায়ীদের লক্ষ লক্ষ টাকার যোগান দেন বাবুল। তবে সেটি করেন তার স্ত্রীর মাধ্যমে।  আর এখানে কৌশলটি হলো,তিনি এই টাকা তাদেরকে মাসিক সুদের বিনিময়ে দিচ্ছেন বলে প্রচার করা।  স্থানীয়দের প্রশ্ন তাহলে তিনি যাদেরকেই এই লক্ষ লক্ষ টাকা ধার হিসেবে দেন;তাদের সকলেই এলাকার চিহ্নিত কুখ্যাত মাদক ব্যবসায়ী কেন। আসলে সুদে টাকা ধার দেওয়া হচ্ছে বলে এমন প্রচার শুধুমাত্র সমাজকে বোকা বানানোর জন্যে। মূলত এই মোটা অংকের অর্থ তিনি মাদক ব্যবসায় পুঁজি হিসেবে বিনিয়োগ করেন। বিনিময়ে মাদক ব্যবসায়ীদের নিকট থেকে সময়মতো বুঝে নেন লাভের মোটা অংশ। এছাড়াও এই বাবুল তালুকদারের বিরুদ্ধে এলাকার অসহায়দের কয়েক কোটি টাকা মূল্যের কয়কটি বাড়ি ও জমি জোরপূর্বক ভোগ দখলের অভিযোগও রয়েছে।

নিলুফা ইয়াসমীন নিলু, তার মাথাতেও স্থানীয় শীর্ষ সরকার দলীয় একাধিক নেতার ছায়া রয়েছে। আর সেটাকে পুজি করেই তিনি শাহ্ আলী থানা এলাকার দেহব্যবসায়ী চক্রের একজন গডফাদার ও শীর্ষ মাদক সম্রাজ্ঞী হয়ে উঠেছেন।  তবে একজন রাজনৈতিক নেত্রী হিসেবে নিলুফা ইয়াসমিন নিলুর মাদক ব্যবসায় জড়ানোর কারনটা একটু ভিন্ন। তিনি আগে শাহ্ আলী থানাসহ রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় নারীদের দিয়ে ফ্ল্যাটে ফ্ল্যাটে  অনৈতিক কার্যকলাপ পরিচালনা করতেন। এরই ধারাবাহিকতায় শিখেন ফেলেন ইয়াবা সেবন। এক পর্যায়ে তিনি পুরোপুরিভাবে ইয়াবায় আসক্ত হয়ে পড়েন। ফলাফল হিসেবে এখন তিনি এলাকার চিহ্নিত একজন মাদক সম্রাজ্ঞী। জনশ্রুতি রয়েছে এই নিলুফা ইয়াসমিন নিলু প্রতিদিন গড়ে ১৫/২০ টি ইয়াবা ট্যাবলেট সেবন করেন। যার মূল্য হিসেবে প্রতিদিন তাকে ব্যয় করতে হয় সর্বনিম্ন ৩-৪ হাজার টাকা। অর্থাৎ প্রতিমাসে শুধুমাত্র ইয়াবা সেবনের খরচ বাবদ তাকে ব্যয় করতে হয় সর্বনিম্ন নব্বই হাজার টাকা থেকে এক লাখ বিশ হাজার টাকা।

মূলত অতিমাত্রায় ইয়াবা ট্যাবলেট সেবনের এক পর্যায়ে সেই প্রয়োজনের অর্থের যোগান দিতে হিমশিম খেতে হয় তাকে। ফলে এক পর্যায়ে তিনি নিজেই হয়ে ওঠেন পুরোদস্তুর একজন মাদক সম্রাজ্ঞী। বর্তমানে থানা এলাকায় মাদক বিক্রেতা হিসেবে তার প্রচুর জনবল রয়েছে। তার রাজনেতিক প্রভাবের কাছে পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও অসহায়।

শামসুন্নাহার বুচি বছর কয়েক আগে শাহ্ আলী থানাধীন গুদারাঘাটে পুলিশের দেওয়া আগুনে বিশিষ্ট মাদক ব্যবসায়ী আলোচিত  বাবুল হত্যার ঘটনাটি নিশ্চয়ই সবার মনে আছে? পুলিশের আগুনে নিহত সেই আলোচিত  মাদক ব্যবসায়ী বাবুলের শালিকা এই শামসুন্নাহার বুচি। চিহ্নিত মাদক সম্রাট বাবুলকে চা-দোকানি দাবি করে তার নিহতের ঘটনায় কয়েকটি বেসরকারী টেলিভিশন ও জাতীয় পত্রিকায় তার পরিবারের পক্ষে সাক্ষাৎকার দেওয়ার পরপরই এলাকায় স্বয়ংক্রিয়ভাবে জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন বুচি। তারপর থেকে আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি তাকে। নিহত বাবুলের মাদক সম্রাজ্যের নেতৃত্ব বুঝে নেন। বর্তমানে তিনি শাহ্ আলী থানা এলাকার একজন কুখ্যাত ও শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ী হিসেবে পরিচিত। মাদক বিক্রেতা হিসেবে তারও রয়েছে প্রচুর জনবল।

আব্দুল মান্নান শেখ, কিছুদিন আগেও যিনি রাজধানীর কাওরানবাজারের একজন ক্ষুদ্র মাছ ব্যবসায়ী ছিলেন। কিন্ত মিরপুর এলাকার শীর্ষ একজন আওয়ামিলীগ নেতার আশীর্বাদক্রমে তিনি মিরপুরস্থ ৯৩ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামীলীগের নেতাবনেই যাওয়ামাত্রই যেন হাতে পেয়ে যান আলাউদ্দিনের  আশ্চর্য  চেরাগ। হঠাৎই হয়ে ওঠেন আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ। গড়ে তোলেন সম্পদের পাহার। সারদিন মদ্যপান করে মাতাল হয়ে ঘোরাফেরাই তার প্রধান কম্ম। এলাকার যত নিষিদ্ধ  জুয়ার আস্তানা রয়েছে,সবগুলিই চলে শেখ মান্নানের নিয়ন্ত্রণ ও নির্দেশনায়। আর জুয়ার আসর মানেই নানা প্রকার মাদকদ্রব্যের অবাধ সমাহার। চিড়িয়াখানার ঢালে মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্স,বক্সনগরসহ আশপাশে সকল মাদকের স্পট চলে তার নিয়ন্ত্রণেই। বক্সনগরের চিহ্নিত মাদক সম্রাট পাখী,আহমদ আলী ও বাঘা এই শেখ মান্নানের নেতৃত্বেই তাদের বিশাল মাদক সম্রাজ্য নিয়ন্ত্রণ করে। এদিকে চিড়িয়াখানার ঢালে কুমিরশাহ মাজারের কোটি কোটি টাকার জমি দখল করে ভোগ করেন তিনি। সরকারের উর্ধ্বতন মহলের নিষেধাজ্ঞা সত্বেও সনি সিনেমার সামনে থেকে চিড়িয়াখানা পর্যন্ত মূল  সড়কে বাজার বসিয়ে নিজস্ব  লোকজন দিয়ে চাঁদা হিসেবে প্রতিদিন আদায় করেন লক্ষ লক্ষ টাকা। তবে একজন দায়িত্বশীল আওয়ামীলীগ নেতা হিসেবে তার সারদিন মদ খেয়ে মাতাল হয়ে থাকার বিষয়ে এলাকাবাসী প্রকাশ্যে কোন প্রতিবাদ করতে না পারলেও মনে মনে খুবই ক্ষুব্ধ ও ঘৃনার চোখেই দেখেন শেখ মান্নানকে।

খলিল শিকদার। শাহ্ আলী থানা এলাকার মাদক সম্রাজ্যের পতিটি বাসিন্দারা তাকে “পিচ্চি” নামেই চেনে। তিনিও শাহ্ আলী থানা এলাকার আওয়ামীলীগের অঙ্গসংগঠনের একজন নেতা হিসেবে নিজেকে পরিচয় দিলেও মূলত তার একটি কাজ। এলাকার সকল মাদক ব্যবসায়ী ও স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কিছু অসৎ সদস্যের সাথে দিনরাত যোগাযোগ রাখাই তার কাজ। মানে তিনি মাদক ব্যবসায়ীদের মাদক ব্যবসা নির্বিঘ্ন রাখতে প্রশাসনকে ম্যানেজ করতে তাদের প্রতিনিধি ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কিছু অসৎ সদস্যের সোর্স। এলাকার মাদক ব্যবসায়ীদের নিকট থেকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নামে দৈনিক, সাপ্তাহিক,পাক্ষিক ও মাসিক নির্ধারিত বখরা আদায় করাই তার মূল কাজ। আর মাদক ব্যবসায়ীদের নিকট থেকে বখরা বাবদ আদায় করা বিপুল অর্থে একটা ভাগ নিজে রেখে বাকীটা পৌছে দেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কতিপয় অসৎ সদস্যের হাতে। তাছাড়া গুদারাঘাট কাজীফুরী মাদ্রাসা মাঠে মাদক সম্রাট রানা বাহিনী এই খলিলের ছত্রছায়াতেই প্রতিদিন হাজার হাজার পিছ ইয়াবা ট্যাবলেট বিক্রি করে।

এসকল মাদক সম্রাটদের গডফাদারদের বিষয়ে স্থানীয় প্রশাসনের নিকট সুনির্দিষ্ট তথ্য উপাত্ত থাকলেও ধরাছোঁয়ার বাইরেই রয়ে গেছেন তারা। সম্প্রতি সময়ের কণ্ঠস্বরে এ এলাকার মাদক ব্যবসায়ীদের বিষয়ে একাধিক সংবাদ পরিবেশন করা হলে সংশ্লিষ্ট থানা ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযান শুরুর পর চিহ্নিত অনেক মাদক ব্যবসায়ীই গা-ঢাকা দিয়েছেন। আত্মগোপনে থেকেও তাদের কেউ কেউ নিজ এলাকায় লোকবল দিয়ে মাদক ব্যবসা ঠিকই চালিয়ে যাচ্ছেন।

তবে এসকল চিহ্নিত গডফাদাররা ঠিকই বীরদর্পে এলাকায় ঘুরে বেড়াচ্ছেন। কিন্তু তাদের গ্রেফতার করার সাধ্য যেন কারো নেই। সব জায়গায় তাদের লোক আছে। মন্ত্রণালয়, প্রশাসনের শীর্ষ পর্যায়েও তাদের হাত রয়েছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। মাদকের গডফাদারদের অর্থের দাপটে অনেকটা অসহায় র‍্যাব-পুলিশসহ আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারীর বাহিনীর সদস্যরা। যার কারণে তাদেরকে আইনের আওতায় আনা যাচ্ছে না।

তবে এলাকাবাসীর দাবি,মাদক ব্যবসায়ীদের নয়;এই গডফাদারদের বিরুদ্ধে প্রশাসন আইনানুগ ব্যবস্থা নিলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে এলাকার মাদক ব্যবসা বন্ধ হয়ে যাবে। একজন মাদক ব্যবসায়ী গ্রেপ্তার হলে তাদের কিছুই আসে যায় না। তারা অপর একজনকে মাদক ব্যবসায়ী তৈরী করে ঠিকই তাদের মাদক ব্যবসা চালিয়েই যাবে। তাই শুধুমাত্র শাহ্ আলী থানা এলাকার মাদক ব্যবসায়ীদেরই নয়;মাদক ব্যবসায়ী তৈরীর কারখানা এই গডফাদাররা যেন এলাকায় বীরদর্পে না থাকতে পারে। তাদেরকে আইনের আওতায় আনতে পারলে শাহ্ আলী থানা এলাকার মাদক ব্যবসা শিকড় থেকে বন্ধ হয়ে যাবে। এসকল গডফাদারদের আইনের আওতায় আনা এখন সময়ের দাবি বলে মনে করেন এলাকাবাসী।

এবিষয়ে শাহ্ আলী থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) সালাউদ্দিন মিয়া সময়ের কণ্ঠস্বরকে বলেন,আমার থানা এলাকায় কোন মাদক ব্যবসায়ীর ঠাই হতে পারে না। আমরা মাদক নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করে আসছি। ইতোমধে এলাকার চিহ্নিত অনেক মাদক ব্যবসায়ীকে গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনতে সক্ষম হয়েছি। তবে মাদক ব্যবসায়ী প্রমাণিত হলে সে যেই হোক কোন ছাড় দেয়া হবে না। আইনের আওতায় এনে যথাযথ শাস্তির ব্যবস্থা করা হবে। তিনি বলেন, বর্তমান সরকার মাদকের বিষয়ে জিরো টলারেন্স নীতিতে তাই এ মাদকের সাথে কোন প্রকার আপোষ নয়।