সংবাদ শিরোনাম
  • আজ ৬ই কার্তিক, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

কক্সবাজারে রোহিঙ্গা সংকট, কমেছে শ্রমিকের মজুরি

৩:২৭ অপরাহ্ণ | শুক্রবার, জুলাই ২৬, ২০১৯ জাতীয়
Ruhinga

তাহজীবুল আনাম, কক্সবাজার প্রতিনিধি: চলমান রোহিঙ্গা সংকটের কারণে কক্সবাজারের টেকনাফ ও উখিয়া উপজেলায় সব ধরনের শ্রমিকের মজুরি কমেছে। এরই ধারাবাহিকতায় গত বছর এ দুই উপজেলার স্থানীয় শ্রমিকদের আয় কমেছে ১৮০ কোটি টাকারও বেশি। বিপুল পরিমাণ আয় হারানোর কারণে এখানকার স্থানীয়দের মধ্যে দারিদ্র্যের প্রকোপও বেড়েছে। জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, রোহিঙ্গা উদ্বাস্তুদের আগমনের আগে টেকনাফে অকৃষি খাতের অদক্ষ শ্রমিকের মজুরি ছিল ৪১৭ টাকা। উদ্বাস্তু আগমনের পর তা ১৪ দশমিক ৩ শতাংশ কমে দাঁড়িয়েছে ৩৫৭ টাকায়। অন্যদিকে আগে কৃষি শ্রমিকের গড় দৈনিক মজুরি ছিল ৪২৩ টাকা, যা রোহিঙ্গারা আসার পর ১১ দশমিক ২৭ শতাংশ কমে দাঁড়িয়েছে ৩৭৫ টাকায়। আগে উখিয়া অঞ্চলে অকৃষি খাতের অদক্ষ শ্রমিকের দৈনিক গড় মজুরি ছিল ৪৫০ টাকা, যা পরে ৬ শতাংশ কমে দাঁড়িয়েছে ৪২৩ টাকায়। এখানে আগে কৃষি শ্রমিকের দৈনিক গড় মজুরি ছিল ৪৮৪ টাকা, যা পরে ১৭ দশমিক ৪১ শতাংশ কমে দাঁড়িয়েছে ৪০০ টাকায়।

এতে দেখা যায়, মজুরি হ্রাসের কারণে টেকনাফ ও উখিয়া অঞ্চলে দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাসরত জনসংখ্যা বেড়েছে প্রায় ২ দশমিক ৭ শতাংশীয় পয়েন্ট। এর মধ্যে টেকনাফ অঞ্চলে পভার্টি গ্যাপ রেশিও বেড়েছে ১ দশমিক ৪৭ শতাংশীয় পয়েন্ট। উখিয়ায় তা বেড়েছে ৫২ শতাংশীয় পয়েন্ট। উদ্বাস্তু ঢলের কারণে দরিদ্র হয়ে পড়েছে এখানকার প্রায় আড়াই হাজার পরিবার। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এলাকাগুলোয় দাম বেড়েছে জিনিসপত্রের।

রাজধানীর বনানীর ব্র্যাক সেন্টারে ‘ইমপ্যাক্টস অব দ্য রোহিঙ্গা রিফিউজি ইনফ্লাক্স অন হোস্ট কমিউনিটিজ’ শীর্ষক ওই প্রতিবেদন প্রকাশ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন। তিনি বলেন, রোহিঙ্গা উদ্বাস্তুদের কারণে আমরা নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছি। যেসব এলাকায় উদ্বাস্তু শিবির স্থাপন করা হয়েছে, সেগুলোয় দারিদ্র্য ও মূল্যস্ফীতি বেড়েছে এবং জীববৈচিত্র্য কমেছে। এছাড়া এসব এলাকায় স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। আশ্চর্যজনকভাবে এলাকাগুলোয় শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার হারও বেড়ে গেছে। এর কারণ হলো, এনজিওগুলো স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের নানা ধরনের চাকরি দিচ্ছে, যার ভবিষ্যৎ ফলাফল হবে নেতিবাচক।

তিনি বলেন, টেকনাফ ও উখিয়া অঞ্চলে যে পরিমাণ রোহিঙ্গা এসেছে, তা এসব এলাকার স্থানীয় লোকসংখ্যার দ্বিগুণ। রোহিঙ্গা সংকট শুধু পরিবেশ বা অর্থনীতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে না। এর কারণে দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা তৈরি হবে। বাংলাদেশে বর্তমানে যেসব উন্নয়ন প্রকল্প চলমান রয়েছে, সেগুলোও এর কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। রোহিঙ্গাদের কারণে যদি সন্ত্রাসবাদের আশঙ্কা তৈরি হয়, তবে তা বৈদেশিক বিনিয়োগকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে। একটি গণহত্যা ঠেকাতে বাংলাদেশ সরকার রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়েছিল। আর তাই বৈশ্বিক নেতাদের উচিত এ সমস্যা সমাধানে এগিয়ে আসা এবং রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে মিয়ানমারের ওপর চাপ প্রয়োগ করা।

ইউএনডিপির প্রতিবেদন বলছে, রোহিঙ্গা আগমনের কারণে কক্সবাজার ও এর আশপাশ এলাকার কৃষি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। উদ্বাস্তু শিবির স্থাপনের জন্য ব্যবহূত জমি চাষাবাদের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। রোহিঙ্গাদের কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে পরিবেশ। সংশ্লিষ্ট এলাকাগুলোর ৬ হাজার ১৩৬ একর বনাঞ্চল বিলীন হয়ে গেছে, যার মধ্যে ৪ হাজার ১৩৬ একর প্রাকৃতিক বন ও ২ হাজার ২৭ একর মানবসৃষ্ট বন। রোহিঙ্গাদের জন্য ২ লাখ ১২ হাজার ৬০৭টি অস্থায়ী ছাউনি, ৩০ কিলোমিটার রাস্তা ও ৮ হাজার ৫২৪টি পানির উৎস নির্মাণ করতে গিয়ে অনেক পাহাড় ধ্বংস করা হয়েছে। অঞ্চলগুলোয় ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ৫ থেকে ১৫ মিটার পর্যন্ত নিচে নেমে গেছে। একই সঙ্গে বেড়েছে পানিদূষণ।

রোহিঙ্গাদের কারণে বড় ধরনের ক্ষতি হলেও সংশ্লিষ্ট অঞ্চলগুলোর সামষ্টিক অর্থনীতিতে এর কিছু ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে বলেও প্রতিবেদনে উঠে আসে। এতে বলা হয়, দাতা সংস্থাগুলো রোহিঙ্গাদের জন্য যে অর্থ সরবরাহ করছে, তা স্থানীয় অর্থনীতিতে অবদান রাখছে। প্রতি ১ ডলার অনুদান স্থানীয় অর্থনীতিতে ২ দশমিক ৭ ডলারের সমপরিমাণ অবদান রাখছে। রোহিঙ্গা আগমনের ফলে সামাজিক নিরাপত্তা খাতেও ব্যয় বেড়েছে। উখিয়া ও টেকনাফ অঞ্চলে সুবিধাভোগী কাভারেজ ও তহবিল বিতরণ যথাক্রমে ১৬ ও ২০ শতাংশ বেড়েছে।

ইউএনডিপির গবেষণা প্রতিবেদনটি তৈরিতে সহায়তা করে পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশ (পিআরআই)। প্রতিষ্ঠানটির গবেষণা পরিচালক ড. এমএ রাজ্জাক বলেন, এখানে মূলত দৃশ্যমান অর্থনৈতিক সূচকগুলোই দেখানোর চেষ্টা করা হয়েছে। সামাজিক অনেক বিষয় এতে অন্তর্ভুক্ত করা সম্ভব হয়নি।

পিআরআইয়ের চেয়ারম্যান ড. জাইদি সাত্তার বলেন, মিয়ানমার থেকে বিতাড়িত ১০ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থীকে অস্থায়ী আশ্রয় প্রদানে বাংলাদেশ তার সক্ষমতার চেয়ে বেশি অবদান রেখেছে। এদের নিরাপদ, নিশ্চিত ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের জন্য বৈশ্বিক সম্প্রদায়কে অবশ্যই মিয়ানমার সরকারের ওপর চাপ প্রয়োগ করতে হবে।