উপ-সচিবের সই জাল করে নিয়োগপত্র প্রদানের মাধ্যমে অভিনব প্রতারনা!

১০:১৫ অপরাহ্ণ | সোমবার, আগস্ট ৫, ২০১৯ ঢাকা
jaliati

রাজু আহমেদ, ষ্টাফ রিপোর্টার- অর্থ মন্ত্রণালয়ের উপ-সচিবের স্বাক্ষর জাল করে শুধুমাত্র রাষ্ট্রীয় কাজে ব্যবহৃত খামে ভুঁয়া চাকরির নিয়োগ পত্র প্রদানের মাধ্যমে কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়া ভয়ানক প্রতারক চক্রের অভিনব প্রতারনার গোপন রহস্য উৎঘাটিত হয়েছে।

এবিষয়ে ভুক্তভোগী মুসলেহ উদ্দিন নামে এক ব্যাক্তির একটি মামলার প্রেক্ষিতে গত ২ আগস্ট (শুক্রবার) এই ভয়ংকর প্রতারক
চক্রের মূল হোতা শাহিনুল কাদির সুমন র‍্যাবের জালে আটক হওয়ার পরপরই চাঞ্চল্যকর এসব তথ্য বেড়িয়ে এসেছে।

মিরপুর মডেল থানার মামলার এজাহার ও ভুক্তভোগী সূত্রে জানা গেছে,গত ২০১৬ সালে শাহিনুল কাদির সুমন ও কেএম গোলাম মোর্তুজা আলী রনি নামে এক ব্যাক্তি অর্থ মন্ত্রণালয়ের সচিবের একান্ত সহকারী পরিচয় দিয়ে মামলার বাদী ও ভুক্তভোগীর বোন নুরুন্নাহারকে পিএ ও ভুক্তভোগীর পরিচিত শরীফুল ইসলাম নামে অপর এক ব্যাক্তিকে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অফিস সহকারী পদে চাকরী প্রদানের প্রলোভন দেখিয়ে নগদ ও বিভিন্ন ব্যাংকের মাধ্যমে মোট চব্বিশ লক্ষ সত্তর হাজার (২৪,৭০,০০০০) টাকা আত্মসাৎ করে।

প্রতারণার শিকার মাগুরা শহরের নুরুন্নাহারের ভাই মুসলেহ উদ্দিন জানান,পুর্ব পরিচয়ের সূত্রে গত ২০১৬ সালে একই এলাকার শাহিনুল কাদির সুমনের সাথে কথায় কথায় আলাপ হয়,আমার বোন নুরুন্নাহার ইডেন মহিলা কলেজ থেকে মাস্টার্স পাশ করে একটি চাকরী প্রত্যাশী। আমিও চেষ্টায় আছি বোনের জন্য কিছু করতে পারি কিনা। এসময় অতি আগ্রহ দেখিয়ে শাহিনুল কাদির সুমন আমাকে বলে আমার সাথে অর্থ মন্ত্রণালয়ের উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সাথে দহরমমহরম। তোমার বোন তো আমারও বোন। ওর জন্যে অর্থ মন্ত্রণালয়ে একটি ভালো চাকরীর ব্যাবস্থা করা তো আমার একটা তুরীর ব্যপার। তাছাড়া তোমার বোনের জন্যে আমি ভালো কিছু করতে পারলে তো এলাকায় আমার সুনামসহ নিজেও তৃপ্তি পাবো। একই এলাকার পরিচিত হিসেবে তার কথায় আমি শতভাগ বিশ্বাস না পেলেও মোটামুটি আগ্রহ দেখালে এক পর্যায়ে আমার বোন নুরুন্নাহার ও আমার পরিচিত শরীফুল ইসলাম নামে অপর একজন চাকরী প্রত্যাশীকে অর্থ মন্ত্রণালয়ে নিয়ে গিয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ের উপ-সচিবের রুমে মোখিক পরীক্ষা নেয়। তখন আমার মনে শতভাগ বিশ্বাস জন্মালে তার দাবি অনুযায়ী মৌখিক পরীক্ষার পর নিয়োগপত্র পাওয়ার জন্যে বিভিন্ন সময়ে নগদ ও বিভিন্ন ব্যাংকের মাধ্যমে নুরুন্নাহার ও শরীফুলের বাবদ মোট চব্বিশ লাখ সত্তর হাজার টাকা প্রদান করি।

অর্থ প্রদানের পর তারা ২০১৭ সালের ২২ শে জানুয়ারী শরীফুল ইসলামকে রাষ্ট্রীয় খাম ও প্যাডে অর্থ মন্ত্রণালয়ের উপ-সচিব (প্রশাসন) হেলাল উদ্দিনের স্বাক্ষর সম্বলিত নিয়োগপত্র প্রদান করে। পরবর্তীতে ২০১৭ সালে ২০ মার্চ একই ধরনের আরো দুটি নিয়োগপত্র নুরুন্নাহারকেও প্রদান করে।

পরবর্তীতে একই সালের ৫ই জুলাই এক মাসের বেতন বাবদ নুরুন্নাহারকে ৩১,৫০০ টাকা ও শরীফুল ইসলামকে ১৩,৮০০ টাকা প্রদানও করে। এমনকি তাদের ফিঙ্গারপ্রিন্ট নেয়াসহ অর্থ মন্ত্রণালয়ের রেজিষ্টার খাতায় তাদের স্বাক্ষর রাখলে আমি ও আমার পরিবার পুরোপুরিভাবে নিশ্চিত হই।

কিন্ত ইতোমধ্যে কয়কমাস অতিবাহিত হলে ২০১৮ সালের শেষ দিকে কর্মক্ষেত্রে যোগদানের তারিখ জানতে চেয়ে তাদের সাথে বারংবার যোগাযোগ করলে তারা পুলিশ ভেরিফিকেশন ও নানা অজুহাতে কালক্ষেপণ করতে থাকলে আমাদের মনে সন্দেহ দানা বাধে। সন্দেহের এক পর্যায়ে আমরা গোপনে বিষয়টির বাস্তবতা জানতে খোঁজখবর নিয়ে জানতে পারি যে,কেএম মোর্তুজা আলী রনি অর্থ মন্ত্রণালয়ের কোন উর্ধতন কর্মকর্তা নন। বরং তিনি চতুর্থ শ্রেণির সাধারণ একজন কর্মচারী মাত্র। পাশাপাশি শফিকুল ইসলাম নামে যে ব্যাক্তি উপ-সচিব এর চেয়ারে বসে তাদের সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেছিলেন,তিনিও অর্থ মন্ত্রণালয়ের একজন সাধারন পিয়ন। তার সাক্ষাৎকার গ্রহণ করার সময়ের একটি গোপন ভিডিও ক্লিপই সেটি প্রমান করেছে। তখনই আমি বুঝতে পারি যে,আমরা অনেক বড় একটি প্রতারক চক্রের প্রতারণার শিকার হয়েছি।

এব্যপারে শাহিনুল কাদির সুমনের বক্তব্য জানতে চাইলে তিনিও কোন সদুত্তর না দিয়ে নানা অজুহাতে বিষয়টি এড়িয়ে যান। অধৈর্য হয়ে এক পর্যায়ে আমি প্রদানকৃত অর্থ ফেরত চাইলে সেও আমাকে নানাভাবে হুমকিধামকী দিতে থাকে। ইতোমধ্যে আরো প্রায় ৬/৭ মাস কেটে গেলে আমরাও হতাশ হয়ে পড়ি।

এমতাবস্থায় আর কোন উপায়ন্ত না দেখে আমি র‍্যাপিড এ্যাকশন ব্যাটালিয়নের মিরপুর ক্যাম্পে অভিযোগ করি। পরে র‍্যাপিড এ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র‍্যাব-৪) ইন্সপেক্টর মোঃ আমির আলী ও সাব ইন্সপেক্টর মোঃ বাদল গোমস্তার নেতৃত্বে একটি আভিযনিক দল গত ২ আগষ্ট মিরপুর থানাধীন সনি সিনেমা হল ভবন থেকে শাহিনুল কাদির সুমনকে গ্রেপ্তার করে জিজ্ঞাসাবাদের এক পর্যায়ে শিকারোক্তিমুলক জবানবন্দি দেয় যে,তারা একটি সংঘ বদ্ধ প্রতারক চক্রের সক্রিয় সদস্য। তারা রাজধানীসহ সারাদেশের প্রত্যন্ত এলাকার শিক্ষিত বেকার চাকীর প্রত্যাশী যুবক-যুবতীদের বিভিন্ন সরকারী প্রতিষ্ঠান যেমন,বাংলাদেশ সেনাবাহিনী,রেলও, বিভিন্ন ও বিভিন্ন মন্ত্রনালয়সহ নানা প্রতিষ্ঠানে চাকরীর প্রলোভন দেখিয়ে মোটা অংকের অর্থ আত্মসাৎ করে নিজেদের মধ্যে ভাগ বাটোয়ারা করে নেয়। তারা দীর্ঘদিন যাবত সারাদেশে এভাবেই প্রতারণা করে আসছে। পরদিন র‍্যাব কর্তৃপক্ষ গ্রেপ্তারকৃত সুমনকে মিরপুর মডেল থানায় সোপর্দ করলে শাহিনুল কাদির সুমন,অর্থ মন্ত্রণালয়ের পিয়ন কেএম মোর্তজা আলী রনি ও একই

মন্ত্রনালয়ের শফিকুল ইসলাম নামে একজন অফিস সহকারীসহ তিনজনকে আসামী করে একটি নিয়মিত মামলা রুজু করা হয়। মিরপুর মডেল থানার মামলা নম্বর -১৩।

ঘটনাটির সত্যতা নিশ্চিত করে মামলাটির তদন্তকারী কর্মকর্তা মিরপুর মডেল থানার এস.আই রাসেল জানান,এটা একটি প্রতারণার মামলা। র‍্যাব কর্তৃক শাহিনুল কাদির সুমন নামে গ্রেপ্তারকৃত একজন আসামীকে বুঝে পেয়ে মামলার ভিত্তিতে তাকে জেলহাজতে প্রেরন করা হয়েছে।