‘রাস্তায় নামা ছাড়া পথ নেই, দরজায় কড়া নেড়ে যাচ্ছি একটি চাকরির জন্য’

১২:৫৭ অপরাহ্ণ | মঙ্গলবার, আগস্ট ৬, ২০১৯ দেশের খবর, বরিশাল

এস আই মুকুল, নিজস্ব প্রতিবেদক- ভোলার চরফ্যাসন উপজেলার আব্দুলাহপুর ইউনিনের আবু জাফর (২৪)। অচল দু’পায়ে ভরসা করে এগিয়ে চলেছে স্বপ্নের পৃথিবীতে। সাড়ে চার বছর বয়সে টাইফয়েড জ্বরে তার দু’টো পা অচল হয়ে যায়।

রিক্সাচালক বাবা খোরশেদ আলমের পক্ষে চার সন্তান নিয়ে জীবন সংসারের ঘানি টানতেই হিমশিম খেতে হচ্ছে। সেখানে কিভাবে সম্ভব ছেলের উন্নত চিকিৎসা করানো? এমন প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পায়নি ১৯৯৫ সালে স্বাভাবিকভাবে জন্ম নেওয়া সাড়ে চার বছরের শিশু আবু জাফর।

চিকিৎসার অভাবে পা দু’টো হারাতে হয়েছে আবু জাফরকে। ছোটবেলা থেকেই দু’চোখে স্বপ্ন ছিল সমাজের আর পাঁচজনের মতোই স্বাভাবিক জীবন যাপন করবে সে। কিন্তু সে স্বপ্নে গুড়েবালি, বাধাগ্রস্ত হয়েছে বার বার। সাত বছর বয়সে প্রতিবন্ধী জাফরকে দিয়ে ভিক্ষাবৃত্তি করাতে চেয়েছিল এলাকার কতিপয় লোভী মানুষেরা। তার মা বিবি আয়েশা বেগমের বাধায় ভিক্ষাবৃত্তি করাতে পারেনি তারা।

বড় খালার সহায়তায় চরফ্যাসন কুলসুমবাগ ব্রাক স্কুলে প্রথম শ্রেণিতে ভর্তি হওয়ার পরে ঐ স্কুলের তৎকালিন প্রধান শিক্ষক তার শারীরিক অক্ষমতার কারণ দেখিয়ে স্কুল থেকে তার নাম কেটে স্কুল থেকে বের করে দেয়। পরবর্তীতে তার খালা ঐ প্রধান শিক্ষকের স্ত্রীর মাধ্যমে পুনরায় ভর্তি করিয়ে দেন সেই ব্রাক স্কুলে। সেখান থেকেই পঞ্চম শ্রেণীতে পাশ করে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করেন জাফর। পা নেই তাতে কি দু’চোখ আর দু’টো হাত আছে, স্বপ্ন দেখতে বাধাতো নেই! আর তাই আবু জাফর এবার দু’হাতের শক্তি ও মেধাকে কাজে লাগিয়ে শত বাধা, বঞ্চনা এবং কষ্টকে জয় করে স্বপ্ন বুনেছে নিল আকাশের ঐ রঙ্গিন ঠিকানায়।

হঠাৎ কালো মেঘের ছায়া নেমে আসে জীবনের গল্প বলা আবু জাফরের চোখেমুখে। প্রশ্ন করতেই আবু জাফর সময়ের কণ্ঠস্বরকে বলেন, বড় খালা ও নিজ এলাকার শিক্ষক ইলিয়াস মাস্টার, অধ্যাপক শামিম স্যার এবং চরফ্যাসন সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ কায়সার আহমেদ দুলাল স্যারের উৎসাহ ও অনুপ্রেরণায় আমি পড়ালেখা করেছি। ২০১০ সালে আমিনাবাদ হাকিমিয়া দাখিল মাদ্রাশা থেকে এসএসসিতে ৩.৬ জিপিএ, ২০১২ সালে দুলারহাট আদর্শ ডিগ্রী কলেজ থেকে এইচএসসিতে ২.৪০ জিপিএ ও একই কলেজ থেকে ডিগ্রীতে ২য় বিভাগ অর্জন করি এবং বর্তমানে বরিশাল সরকারি কলেজে মাস্টার্সে অধ্যায়নরত আছি।

রিক্সাচালক বাবা সারাজীবন রিক্সা চালিয়ে আমাদের সংসার খরচের জোগান দিয়েছেন এখন তিনি কোমরে ব্যাথা নিয়ে অসুস্থ অবস্থায় ঘরে পড়ে আছেন। আমরা চার ভাই আমিই সবার বড় আমার ছোট দু’ভাই মানুষের বাসা-বাড়ির কাজ করে সংসার চালাচ্ছে আরেকটা ছোট ভাই বাড়িতেই থাকে। আমি মানুষের বাড়িতে লজিন (গৃহশিক্ষক) থেকে টিউশনি করে শতবাধা বিপত্তি পেরিয়ে নিজের পড়ালেখা খরচ চালাচ্ছি। ছোট ভাইগুলোও আমাকে যতটুকু সম্ভব সহযোগিতা করে।

আবু জাফর আরোও বলেন, বর্তমানে আমাদের সংসারে খুব টানাপড়েন চলছে, এমতাবস্থায় আমি যদি কোনো চাকরি না করি তাহলে আমাদের পরিবার নিয়ে অসহায়ের মতো রাস্তায় নামা ছাড়া আর কোনোও পথ থাকবেনা। রোদবৃষ্টিতে ভিজে মানুষের দরজায় দরজায় কড়া নেড়ে যাচ্ছি একটি সরকারি চাকরির স্বপ্ন নিয়ে। প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা যদি আমাকে একটি চাকরি দিতেন তাহলে হয়তো আমার অসুস্থ বাবা ও মায়ের চিকিৎসা ও ছোট ভাইদেরকে নিয়ে স্বচ্ছল জীবন যাপন করতে পারতাম।

কোনোদিন যদি ভাগ্যের চাকা ঘুরে যায় তখন মানুষের জন্য কি করবেন? এমন প্রশ্নে জবাবে আবু জাফর বলেন, আমি স্বপ্ন দেখি সমাজের সকল প্রতিবন্ধীদের মানষিক বিকাশের জন্য একটি প্রতিবন্ধী ট্রেনিং স্কুল প্রতিষ্ঠা করার। স্থানীয় সংসদ সদস্য যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের স্থায়ী কমিটির সভাপতি আব্দুল্লাহ আল ইসলাম জ্যাকবের সাহায্যও কামনা করেন শারীরিক প্রতিবন্ধী আবু জাফর।