স্ত্রী সঙ্গে ঘনিষ্ঠ বন্ধুর পরকীয়া! বাধা দেয়ায় যুবকের দুই হাত কর্তন, গ্রেফতার ১

৫:১১ অপরাহ্ণ | মঙ্গলবার, আগস্ট ৬, ২০১৯ ঢাকা, দেশের খবর

খন্দকার রবিউল ইসলাম, রাজবাড়ী প্রতিনিধি: রাজবাড়ী সদর উপজেলার আলীপুর ইউনিয়নের কল্যাণপুরে মোঃ শাহিন খান (২৫) নামে এক যুবককে পূর্ব শত্রুতার জের ধরে প্রকাশ্যে দু-টি হাত কেটে দিয়েছে স্থানীয় সন্ত্রাসীরা। এ ঘটনায় রাজবাড়ী থানায় একটি হত্যা চেষ্টা মামলা দায়ের করা হয়েছে। পরে মামলার অন্যতম আসামী আরেক শাহিনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ।

স্থানীয় সুত্রে জানা গেছে, যদিও শাহিন খান ও ইসমাইল গাজি ছিল ঘনিষ্ঠ বন্ধু। এক সাথে পরিচালনা করতো মাদক ব্যবসা। আর সেই মাদক ব্যবসার টাকা ভাগাভাগি ছাড়াও ছিল ব্যক্তিগত সমস্যা। যে কারনেই ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্ব রুপ নেই শত্রুতায়। দুজনের মধ্যে তৈরী হয় দূরত্ব। এনিয়ে দুজনের মধ্যে কথা কাটাকাটিও হয়েছে বেশ কয়েকবার।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় একাধিক ব্যাক্তি জানান, শাহিন খান ও ইসমাইল গাজি মাদক ব্যবসা থেকে শুরু করে এক সাথে এমন কোন কাজ নেই যা তারা করতো না। গত এক মাস আগে শাহিনের সাথে ইসমাইলের মাদকের টাকা ভাগাভাগি নিয়ে ঝামেলা সৃষ্টি হয়। পরে দুজনের মধ্যে এক পর্যায় মারামারিও হয়। পরে স্থানীয়ভাবে বসে সমাধান করা হয়। এক মাস পরে সেই রাগ মনের মধ্যে রেখে ইসমাইল ও তার সহযোগিরা শাহিনকে ডেকে নিয়ে প্রকাশ্যে ধারালো চাপাতি দিয়ে দুই হাত কেটে দেয়।

এদিকে অপর এক সূত্রে জানা যায়, শাহিন খানের স্ত্রীর সাথে পরকীয় প্রেমের সম্পর্ক গড়ে উঠে ইসমাইলের। সে কারনেই শাহিনের স্ত্রীকে মোবাইল ফোনে মাঝে মধ্যেই ফোন করতো ইসমাইল। এ বিষয় নিয়ে শাহিন ইসমাইলকে পিটিয়ে ছিল। সে কারনেই ইসমাইল সেই ঘটনার প্রতিশোধ নিতেই হাত কেটে দিয়েছে বলে ধারনা স্থানীয়দের।

উল্লেখ্য, ০৪ আগষ্ট দুপুরে কল্যাণপুর সিদ্দিকিয়া মাাদ্রাসার সামনে শাহিনকে ডেকে নিয়ে দুই হাতের গিরার নিচের পুরো অংশ কেটে দিয়েছে ইসমাইল ও তার সহযোগী স্থানীয় চিহ্নি কিছু সন্ত্রাসী বাহিনী। হাত হারিয়ে মৃত্যুপথযাত্রী শাহিন খান আলীপুর ইউনিয়নের কল্যাণপুর গ্রামের হাসেম খানের ছেলে।

অভিযুক্ত ইসমাইল গাজির মা জানান, শাহিন ও আমার ছেলে ইসমাইল দুজন খুব ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিল। গত একমাস আগে শাহিন আমার ছেলেকে শ্বশুর বাড়িতে বেড়ানোর কথা বলে নিয়ে যায়। পরে সেখানে শাহিন তার স্ত্রীর সাথে পরকীয়া প্রেমের সম্পর্কের অভিযোগ তুলে ইসমাইলকে মেরে মারাত্বকভাবে আহত করে।

এ ঘটনায় শাহিন খানের বড় ভাই হোসেন খান জানান, আমার ভাই শাহিন একজন খামারি, নিজ বাড়িতে হাস ও গরুর খামার ব্যবসায়ী। সম্প্রতি মাদকের কিরুদ্ধে প্রতিবাদ করায় এলাকার কিছু মাদক কারবারী আমার ভাইয়ের উপরে ক্ষিপ্ত ছিল। গত ৪ আগষ্ট দুপুরে বাড়ি থেকে প্রতিবেশী ইসমাইল মোবাইল ফোনে শাহিনকে ডেকে কল্যাণপুর দাখিল মাদ্রাসা এলাকায় নিয়ে যায়। পরে ইসমাইলের নেতৃত্বে ১০/১২ জন ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে আমার ভাইয়ের দু-টি হাত কেটে ফেলে। পরে তাকে উদ্ধার করে রাজবাড়ী সদর হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়। সেখানে অবস্থার অবনতি হলে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং সেখান থেকে ঢাকায় রেফার্ড করা হয়।

তবে স্থানীয় ও পুলিশ সুত্রে জানা যায়, আহত শাহিনের ২ জন স্ত্রী রয়েছে। প্রথম স্ত্রীর সাথে ইসমাইলের পরকীয়া প্রেমের সম্পর্ক ছিল। গত জুন মাসে বর্তমান জখম হওয়া শাহিন খান মোটর সাইকেল যোগে ইসমাইলকে তার নিজ বাড়ি থেকে উঠিয়ে নিয়ে শ্বশুর বাড়ি নিয়ে যায়। সেখানে তার স্ত্রীর সাথে পরকীয়া সম্পর্কের অভিযোগ এনে ইসমাইলকে মারপিট করে শাহিন। এছাড়াও শাহিন ও ইসমাইল ঘনিষ্ঠ বন্ধু এবং মাদক ব্যবসার সাথে জড়িত। তাদের দুজনের নামে মাদক ও অস্ত্র মামলা রয়েছে।

এঘটনায় জেলা পরিষদের সদস্য নাজমূল হাসান মিন্টু বলেন, ইসমাইল এলাকার চিহিৃত মাদক ব্যবসায়ী। তার মাদক ব্যবসার জন্য আলীপুর ইউনিয়নের যুবসমাজ ধ্বংষ হয়ে যাচ্ছে। শাহিন তার এই মাদক ব্যবসার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার কারনে এভাবেই কুপিয়ে শাহিনের দুটি হাত কেটে দিয়েছে এলাকার চিহ্নিত মাদক ব্যবসায়ী সন্ত্রাসীরা।

এ ঘটনায়, ৫ আগস্ট-সোমবার দুপুরে শাহিন খানের বাবা মোঃ হাসেম খান বাদী হয়ে পাঁচজনের নাম উল্লেখসহ তিন-চারজনকে অজ্ঞাত আসামি করে সদর থানায় একটি মামলা দায়ের করেছেন। এরমধ্যে মামলার ৩ নম্বর আসামি শাহিনকে (২৮) গ্রেফতার করে। পরে শাহিনের দেওয়া তথ্যমতে রক্তমাখা ৩ টি চাপাতি ও একটি ছুড়ি উদ্ধার করে পুলিশ।

মামলার এজাহার ভুক্ত আসামীরা হলো- কল্যাণপুর গ্রামের রহমান গাজীর ছেলে ইসমাইল গাজী (৩২), মৃত মান্নান পাটোয়ারীর ছেলে ইদ্রিস পাটোয়ারী (২৮), জাফর রাঢ়ীর ছেলে শাহিন রাঢ়ী (২৮), আমিন হক রাঢ়ীর ছেলে লালু (৩০) ও সুরুজ লাঠিয়ালের ছেলে শাহ আলম (২৮) এবং অজ্ঞাত ৩/৪ জন।

মামলার বিবরণ থেকে জানা যায়, ৪ আগস্ট-১৯ রোববার বিকেল সাড়ে ৩.টার দিকে শাহিন খানকে মোবাইল ফোনে বাড়ি থেকে ডেকে কল্যাণপুর কবরস্থান সংলগ্ন বালুর মাঠের পশ্চিম পাশে নিয়ে যায় মামলার আসামিরা। এ সময় ধারালো চাপাতি ও ছুড়ি দিয়ে শাহিনকে হত্যার চেষ্টা করে তারা। শাহিন দৌড়ে পালানোর চেষ্টা করলে চাপাতি দিয়ে কোপাতে শুরু করে মামলার এক নম্বর আসামি ইসমাইল। এতে শাহিন মাটিতে পড়ে যায়। তখন শাহিনের হাত-পা ও মুখ চেপে ধরে মাঠের পূর্ব পাশে নিয়ে জবাইয়ের চেষ্টা করা হয়। এ সময় শাহিন দুই হাত দিয়ে ঠেকানোর চেষ্টা করলে দুই হাত কেটে শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে তারা। শাহিনের চিৎকারে স্থানীয়রা এগিয়ে এলে পালিয়ে যায় আসামিরা।

এরপর গুরুতর অবস্থায় শাহিনকে প্রথমে রাজবাড়ী সদর হাসপাতাল, পরে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং সেখানে অবস্থার অবনতি হলে ঢাকার পঙ্গগু হাসপাতালে পাঠানো হয়। বর্তমানে তিনি পঙ্গগু হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।

রাজবাড়ী সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) স্বপন কুমার মজুমদার জানান, শাহিনের হাত বিচ্ছিন্ন করার ঘটনায় মামলা হয়েছে। রোববার দিনগত রাতে রাজবাড়ী সদর উপজেলা পাঁচুরিয়া এলাকা থেকে মামলার ৩ নম্বর আসামি শাহিন রাঢ়ীকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তার দেওয়া তথ্যমতে সোমবার বিকেলে আব্বাস গাজীর হলুদ ক্ষেত থেকে একটি ব্যাগের মধ্যে রাখা রক্তমাখা তিনটি চাপাতি উদ্ধার করা হয়েছে। এ মামলার অন্য আসামিদের গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে বলেও জানান ওসি।

অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মোঃ সালাউদ্দিন শেখসহ পুলিশের উর্ধতন কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরির্দশন করেন। এ বিষয়ে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সদর (সার্কেল) মোঃ রেজাউল করিম জানান, আমরা ঘটনাস্থল গিয়ে যা স্থানীয়দের দেওয়া তথ্য মতে শাহিন খানের হাত যারা কেটে দিয়েছে। তারা শাহিনের খুব ঘনিষ্টজন ছিল এবং তাদের নিজেদের মধ্যে অভ্যন্তরীণ কোন্দলের কারনেই এই ঘটনা ঘটেছে। এ ঘটনার সাথে জড়িত একজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। বাকি আসামীদের ধরার জন্য বিভিন্ন জায়গাতে অভিযান চালানো হচ্ছে।