৫৯ বছর পদার্পণে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ঃ যেভাবে দেখতে চাই ক্যাম্পাসকে

১:১৩ অপরাহ্ণ | বুধবার, আগস্ট ২১, ২০১৯ ফিচার
bau

সময়ের কণ্ঠস্বর ডেস্কঃ ১৮ আগস্ট, ১৯৬১। বাংলাদেশের তৃতীয়তম পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয় বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (বাকৃবি)। রাজধানী ঢাকা থেকে ১২০ কি.মি. উত্তরে ও ময়মনসিংহ শহর থেকে মাত্র ৪ কি.মি. দক্ষিণে পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদের পশ্চিম প্রান্তে ১২৫০ একর জায়গা নিয়ে গড়ে উঠে এই সুবিশাল ক্যাম্পাস। প্রতিষ্ঠাকালীন সময়ে ভেটেরিনারি ও কৃষি অনুষদ নামে দু’টি অনুষদ নিয়ে যাত্রা শুরু করে এ উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি। বর্তমানে ৬টি অনুষদে কৃষি বিষয়ক পূর্ণাঙ্গ জ্ঞান আহরণ করার সুযোগ পাচ্ছে প্রায় ৪,২৯৬ জন শিক্ষার্থী। এবছর বিশ্ববিদ্যালয়টি তার প্রতিষ্ঠার ৫৮ বছর পার করে ৫৯ বছরে পা দিয়েছে। বিগত বছরগুলোতে বিশ্ববিদ্যালয়টিতে নানা পরিবর্তন ঘটেছে। দেশের প্রথম কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে যাত্রা করা এ উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি বর্তমানে বাংলাদেশ তথা দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম পথিকৃত বিদ্যাপিঠ বলে পরিগণিত। বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫৯ বছরে পদার্পণ এবং বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কে কি ভাবছেন বর্তমান ও সাবেক শিক্ষার্থীরা? তাদের ভাবনা ও প্রত্যাশার কথা তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন হাবিবুর রনি-

স্বাধীনতা পরবর্তী বাংলাদেশ পূর্ণগঠনে কৃষি ও কৃষকরাই যে অগ্রণী ভূমিকা পালন করবে তা উপলব্ধি করে ১৯৭৩ সালে বঙ্গবন্ধু কৃষিবিদগনকে প্রথম শ্রেণির মর্যাদা দিয়েছিলেন। পরবর্তীতে ফল ও ফসলের উচ্চ ফলনশীল জাত উদ্ভাবন, ফসলের রোগ-বালাই ব্যবস্থাপনা ও আধুনিকীকরণ, গবাদিপশুর উৎপাদন বৃদ্ধি, মাছের কৃত্তিম প্রজনন পদ্ধতি আবিষ্কারসহ কৃষি ও কৃষকের সার্বিক উন্নয়নের মাধ্যমে দেশের ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার জন্য খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনে বাকৃবি পথ প্রদর্শকের ভ‚মিকা পালন করে আসছে। দক্ষিন এশিয়ার কৃষি শিক্ষার সর্ববৃহৎ বিদ্যাপিঠ বাকৃবিতে ভর্তির সুযোগ পেয়ে আমি সবসময় নিজেকে গর্বিত মনে করি। যৌবনের উত্তপ্ত দিনগুলোতে মাতৃসম এই বিশ্ববিদ্যালয় যে আদরমাখা শাসন, স্নেহ ও ভালবাসায় জড়িয়ে রাখে তাতে প্রত্যেক কৃষিবিদই নিজেকে পরিনত মানুষ ও দেশপ্রেমিক নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার প্রয়াস পায়। এত কিছু পাওয়ার মাঝেও কিছু না পাওয়া থেকেই যায়। বিশেষ করে বলতে গেলে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের কোর্স কারিকুলাম নিয়মিত আপডেট করা, হলগুলোর ডাইনিং মনিটরিং ও মানসম্মত করা, পরিবহন সেবার মানবৃদ্ধিকরণ, বিশ্ববিদ্যালয়ে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদারসহ নিয়মিত জব ফেয়ার ও সমাবর্তন আয়োজন মাননীয় উপাচার্য প্রফেসর ড. লুৎফুল হাসান স্যারের কাছে আমারসহ সকল শিক্ষার্থীর এখন প্রাণের দাবী। দাবিগুলোর বাস্তবসম্মত সমাধানের মাধ্যমে এগিয়ে যাবে আমার প্রাণের বিশ্ববিদ্যালয়, বাকৃবির ৫৮ তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে এটাই প্রত্যাশা।

মো. রেজাউল হক রাশেদ
সাবেক শিক্ষার্থী, কৃষি অনুষদ

৫৮ বছর পেরিয়ে গেছে। বিশ্ববিদ্যালয় পা রেখেছে ৫৯ তম বছরে। বাংলাদেশের প্রাচীনতম উচ্চশিক্ষার বিদ্যাপীঠ এই বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়। কৃষি শিক্ষার আঁতুড় ঘরই বলা চলে। স্বাধীনতা পরবর্তী সাত কোটি মানুষের খাদ্যের অভাব ছিল। অথচ বাংলাদেশে আজ প্রায় ১৭ কোটি মানুষ, জমি এতটুকুও বাড়েনি বরং কমছে প্রতিনিয়ত, কিন্তু এখন খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ বাংলাদেশ। এটা সম্ভব হয়েছে কেবলমাত্র আমাদের কৃষিবিদ ও কৃষিবিজ্ঞানীদের কল্যাণে। বলতে পারি, জীবনের শ্রেষ্ঠ সময়গুলো কাটালাম এই বিশ্ববিদ্যালয়ে। ফটোগ্রাফি ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনের সাথে জড়িত থাকার কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থী, কর্মকতা-কর্মচারী সবার সাথে একটা পরিবারের মতই ছিলাম। সময়ের সাথে বিশ্ব যতটা এগিয়েছে, আমার বিশ্ববিদ্যালয় ততটা এগুতে পারে নি বলে মনে করি। এখনও সেই মান্ধাতা আমলের শিটপত্র দেখে দেখে ব্যবহারিক খাতা লেখা পদ্ধতি চালু রয়েছে। এছাড়াও বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার এত বছরেও কেবলমাত্র ৭টি সমাবর্তন অনুষ্ঠিত হয়েছে যা খুবই হতাশার। বিশ্বের সাতে তাল মেলাতে হলে আমার মনে হয় এগুলো পরিবর্তন করা দরকার। প্রতি বছর না হোক, অন্তত দু’বছর পর পর সমাবর্তনের আনন্দে মেতে উঠুক প্রাণের ক্যাম্পাস, এই প্রত্যাশা আজকের দিনে। শুভ জন্মদিন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়।

ডা. রাফসান জনি নয়ন
সাবেক শিক্ষার্থী, ভেটেরিনারি অনুষদ

প্রকৃতিকন্যা খ্যাত দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম বিদ্যাপিঠ বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে যতটুকু ভরপুর, উন্নত সুযোগ-সুবিধা সরবরাহের বেলায় তার চেয়ে যেন অনেক বেশি পিছিয়ে। শিক্ষার্থীদের আবাসন সংকট নিরসন, উন্নত চিকিৎসা সেবা প্রদান, বিশ্ববিদ্যালয়ের ল্যাবগুলোতে উন্নত প্রযুক্তি সরবরাহ, ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীদের নিরাপদ যাতায়াত, মুক্তবুদ্ধির অবাধ চর্চা, প্রাঞ্জল আধুনিক শিক্ষণ পদ্ধতি, সুস্থ রাজনীতির বিকাশ এবং পরিচ্ছন্ন ক্যাম্পাস আজ প্রতিটি শিক্ষার্থীর প্রাণের দাবিতে পরিণত হয়েছে। আশা করা যায়, বর্তমান উপাচার্য অধ্যাপক ড. লুৎফুল হাসান স্যারের হাত ধরে শিক্ষার্থীদের প্রাণের দাবিগুলো অতি শীঘ্রই বাস্তবে রূপ পাবে। এতসব সংস্কারের পাশাপাশি সাবেক শিক্ষার্থীদের প্রতিবছর সমাবর্তনের ব্যবস্থা করাটাও ভীষণ জরুরি। সেদিন বেশি দূরে নয়, যেদিন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় পরিণত হবে লক্ষ লক্ষ শিক্ষার্থীর উচ্চশিক্ষা অর্জনের স্বপ্নপুরিতে।

আনিকা তাসনীম পূর্বা
শিক্ষার্থী, ৪র্থ বর্ষ, ভেটেরিনারি অনুষদ

বাকৃবির ৫৮ বছর পূর্তিতে আমার প্রতিক্রিয়া হলো- অবকাঠামোগত উন্নয়ন, শিক্ষার মান বাড়ানো এসবের কথা সবাই বলবে। আমিও বলছি। তবে একটা বিশেষ চাওয়া আছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে। বাকৃবি থেকে যখন একজন শিক্ষার্থী বেরিয়ে আসবে তার বিদায়টা যেন সমাবর্তনের মধ্য দিয়ে হয়। সমাবর্তন প্রতিটি শিক্ষার্থীর অধিকার। সমাবর্তনের মধ্য দিয়েই একজন শিক্ষার্থীর বিশ্ববিদ্যালয় জীবন পরিপূর্ণতা পায়। আমি চাই এ বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়মিত সমাবর্তন হোক। এছাড়াও পড়ালেখার পাশাপাশি মানবিক গ্রাজুয়েট তৈরীর জন্যে সাহিত্য-সংস্কৃতির কোনো বিকল্প নেই। আমি একজন সাহিত্যের লোক। দীর্ঘদিন সাহিত্য চর্চা করেছি। বিশ্ববিদ্যালয়ের সাহিত্য সংঘের দায়িত্বে থাকাকালীন সময়ে দেখেছি, শিক্ষার্থীরা আগের চেয়ে সাহিত্য-সংস্কৃতির প্রতি ক্রমশ বিমুখতা দেখাচ্ছে। এর জন্য সকলের সম্মিলিত প্রয়াস প্রয়োজন। যেহেতু বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রসংসদ কার্যকর নেই তাই হল প্রভোস্টদের কাছে আমার আহ্বান, তাঁরা যেন হলে নিয়মিত সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে শিক্ষার্থীদের মাঝে সংস্কৃতির বিকাশে সহায়তা করেন। সংস্কৃতির বিকাশের অভাবে অনেক শিক্ষার্থী মাদকাসক্ত হয়ে পড়ছেন দিন দিন। আশা করবো মাননীয় উপাচার্য মহোদয় এই বিষয়গুলোর সঠিক পদক্ষেপ নিবেন। সর্বপরি শুভকামনা রইল বাকৃবির জন্য।

কামরুল হাসান কামু
শিক্ষার্থী, মাস্টার্স থিসিস সেমিস্টার, কৃষিতত্ত¡ বিভাগ

প্রকৃতির আদুরে কন্যা আমাদের এই চিরসবুজের বাকৃবি। প্রতিটি ঋতুতে ভিন্ন ভিন্ন রুপের ডালি সাজিয়ে আমাদের সামনে হাজির হয় এই ক্যাম্পাস। যতই ক্যাম্পাসের প্রকৃতি দেখি ততই ক্যাম্পাসের প্রেমে পড়ে যাই প্রতিনিয়ত। বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে আমি শখের বসে ফটোগ্রাফি নিয়ে কাজ শুরু করি। আমার ফটোগ্রাফির প্রধান বিষয় হলো প্রকৃতি। আর হাতের কাছে এমন সুন্দর ক্যাম্পাসের ছবি যেন আমার ফটোগ্রাফিকে প্রাণ দেয়। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় একটি ভালোবাসার নাম। আর এ বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষার্থী হতে পেরে আমি গর্বিত। শিক্ষা ও গবেষণার পাশাপাশি দক্ষ গ্রাজুয়েট তৈরীতে এ বিশ্ববিদ্যালয়কে শুধু দেশসেরা নয়, বিশ্বসেরা হিসেবে দেখতে চাই। বর্তমানে নবনিযুক্ত ভিসি স্যারের দক্ষ পরিচালনায় আমরা একদিন ওই স্থানে পৌঁছাব, এটাই প্রত্যাশা করি। সকল ধরনের প্রতিবন্ধকতা কাটিয়ে এগিয়ে যাক বাকৃবি, বিশ্বের বুকে এক অনন্য কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে স্থান পাক, বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫৮ বছর পূর্তিতে এটাই আমার কাম্য।

সাদিক খান
শিক্ষার্থী, কৃষি অর্থনীতি ও গ্রামীণ সমাজবিজ্ঞান অনুষদ

বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫৯ বছর পদার্পণে আমারসহ প্রত্যেক শিক্ষার্থীর দাবিগুলো হলো- ক্যাম্পাস ডিজিটালাইজেশন করা, হলগুলোতে প্রত্যেক শিক্ষার্থীর জন্য বিনামূল্যে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট সংযোগ প্রদান, শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা আনয়ন ও চুরিরোধে বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল প্রবেশপথে উন্নত সিসিটিভি ক্যামেরা লাগানো, বহিরাগতদের সকল মোটরসাইকেল ও গাড়ির লাইসেন্স পরীক্ষার পর ক্যাম্পাসে প্রবেশ করতে অনুমতি দেওয়া। এছাড়াও বিশ্ববিদ্যালয়ে নদীর পাড়, আমবাগান, ঈসা খাঁ লেকের পাড়সহ বিভিন্ন বিনোদনের জায়গায় বসার জন্য স্থায়ী সিটের ব্যবস্থা করা, টিএসসি অধিভুক্ত সংগঠন বাড়ানো এবং নিয়মিত অর্থ বরাদ্দ দেওয়া, আর্থিক লেনদেনের জায়গাগুলো যেমন হোটেল, রিকশাভাড়া, নৌকাভাড়া ইত্যাদিতে মূল্যতালিকা নির্ধারণ করে দেওয়া, শিক্ষার্থীদের বাসের সংখ্যা বাড়ানোসহ বাস আইডি কার্ড চালু করা, ক্যাম্পাস পরিষ্কার রাখতে সব জায়গায় ডাস্টবিন স্থাপন করা এবং সৌন্দর্য বর্ধনে প্রত্যেক রাস্তার পাশে ফুলের বাগান, দেয়ালে দেশীয় ঐতিহ্য, বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কিত চিত্রাঙ্কন করা। বিশ্ববিদ্যালয়ের নবনিযুক্ত উপাচার্য অত্যন্ত বিচক্ষণ, মিষ্টভাষী ও শিক্ষার্থীবান্ধব। তাই বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষার্থী হিসেবে মাননীয় উপাচার্য মহোদয়ের কাছে আমার আবেদন এসব সমস্যা তিনি যেন দক্ষতার সাথে অতি দ্রæত সমাধান করেন। এসব সমস্যার সমাধান করতে পারলে উপাচার্য হিসেবে তিনি সকল শিক্ষার্থীর কাছে গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠবেন এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের শ্রেষ্ঠ উপাচার্যের মর্যাদায় অধিষ্ঠিত হবেন। পাশাপাশি এ বিশ্ববিদ্যালয় বিশ্ব আসনে স্থান পাবে, প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে এটাই প্রত্যাশা।

অরণ্য সাদেকুর রহমান
শিক্ষার্থী, মাস্টার্স থিসিস সেমিস্টার, সাস্টেইনেবল এগ্রিকালচার এন্ড ফুড সিকিউরিটি বিভাগ