রক্তস্রোতের সেই বিভীষিকাময় দৃশ্য আজও তাড়া করে বেড়ায়: আজিজুর রহমান বাচ্চু

১০:৫১ পূর্বাহ্ণ | বৃহস্পতিবার, আগস্ট ২২, ২০১৯ ফিচার

রাজু আহমেদ, ষ্টাফ রিপোর্টার: স্বাধীন বাঙালি জাতির রাজনৈতিক ইতিহাসে ২১ আগস্ট একটি কলঙ্কময় দিন। মৃত্যু-ধ্বংস-রক্তস্রোতের নারকীয় গ্রেনেড হামলার ১৫তম বার্ষিকী ছিল বুধবার।

বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে ২০০৪ সালের এই দিনে বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ে আওয়ামী লীগের ‘সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ ও দুর্নীতিবিরোধী’ সমাবেশে এই কলঙ্কজনক হামলায় ২৪ জনের প্রাণহানিসহ আহত হয়েছিলেন আওয়ামী লীগের বহু নেতাকর্মী।

তৎকালীন বিরোধীদল আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসবিরোধী শান্তির জনসভায় বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যার উদ্দেশ্যে ছোড়া গ্রেনেডের স্প্রিন্টারের আঘাতে যারা আহত হয়েছিলেন তাদেরই একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা ও বর্তমানে ঢাকা মহানগর উত্তর আওয়ামিলীগের সহ-সভাপতি আলহাজ্ব মোহাম্মাদ আজিজুর রহমান বাচ্চু।

সেদিনের সেই মুহূর্তটা আজও যেন তাকে তাড়া করে বেড়ায়। তৎকালীন সময়ে আহত এই মানুষটির চিকিৎসার ব্যবস্থা করেছিলেন দলীয় নেতা শেখ হাসিনা। তবে শরীরে গ্রেনেডের অসংখ্য স্প্রিন্টার থাকায় বর্তমানে তার শারীরিক অবস্থা ভালো নয়।

আজিজুর রহমান বাচ্চু সময়ের কণ্ঠস্বরের সাথে একান্ত আলাপকালে সেই বিভীষিকাময় ঘটনার বর্ণনার শুরুতেই বলেন, সেদিন ছিলো শনিবার। তৎকালীন বিরোধী দল আওয়ামী লীগের ‘সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ ও দুর্নীতিবিরোধী’ শান্তিপূর্ণ কর্মসূচির অংশ হিসেবে পূর্ব ঘোষিত সমাবেশে অংশ নিতে মিরপুরের আওয়ামীলীগ, যুবলীগ, মহিলা আওয়ামীলীগ, ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের নিয়ে দুপুর নাগাদ সমাবেশে যোগদান করি।

সমাবেশের প্রধান অতিথি তৎকালীন বিরোধী দলীয় নেত্রী ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সমাবেশে যোগদানের অপেক্ষায় দেশের দূর-দূরান্ত থেকে আসা অসংখ্য নেতাকর্মীরা স্টেজের আশপাশে মাটিতেই বসে অবস্থান নেন। আমিও আমার মিরপুরের নেতাকর্মীদের নিয়ে অস্থায়ী স্টেজের একপাশে মাটিতে বসে নেত্রীর সমাবেশে যোগদানের প্রহর গুনতে থাকি। অজস্র নেতাকর্মীদের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে নেত্রী উপস্থিত হলেন সমাবেশে। চারিদিক জয় বাংলা ধ্বনিতে মুখরিত হয়ে উঠলো।

অপর পাশে বসেছিলেন সাবেক রাষ্ট্রপতি জিল্লুল হাকিমের সহধর্মিণী আইভি রহমান, মেয়র হানিফ, রফিকুল ইসলাম ওরফে আদা চাচাসহ নেতাকর্মীরা। নেত্রী উপস্থিত নেতাকর্মীদের উদ্দেশ্যে তৎকালীন স্বৈরশাসকদের স্বৈরাচারীতা ও স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে সমসাময়িক ঐতিহাসিক বক্তব্য রাখেন।

বক্তব্য শেষে তখন আনুমানিক বেলা সাড়ে চারটা থেকে পাঁচটার দিকে হঠাৎ বিকট শব্দে চারিদিক ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন করে ফেললো। এসময় কিছু বুঝে উঠার আগেই কোন কিছুর আঘাতে নিজেকে রক্তাক্ত অবস্থায় সনাক্ত করি। চরম হতাশা বুকে নিয়ে আশপাশে কয়েক মূহুর্তের জন্যে চোখ বুলাতেই দেখি আমার মতো রক্তান্ত অবস্থায় পড়ে আছি শতাধিক মানুষ। গগনবিদারী চিৎকার চেঁচামেচিতে লোকজন দিক্বিদিক ছোটাছুটি করছে দেখে তাৎক্ষণিক জ্ঞান হারানোর পর আমার আর কিছু মনে ছিলো না।

তিনি বলেন, যখন জ্ঞান ফিরলো ততক্ষণে নিজেকে একটা ভ্যানগাড়িতে নির্ণয় করে বুঝতে পারি, উপস্থিত নেতাকর্মীরা আমাকে আহত অবস্থায় উদ্ধার করে চিকিৎসার উদ্দেশ্যে হাসপাতালে নিয়ে এসেছেন। বার বার বারংবার তাদের জিজ্ঞেস করি আপা (শেখ হাসিনা) সুস্থ আছেন তো? আপার কোনো সমস্যা হয়নি তো?

তাৎক্ষণিকভাবে আমি লক্ষ্য করেছিলাম -তারা বুকফাটা আর্তনাদকে বুকে চাপা দিয়ে আমাকে আশ্বস্ত করে বলেছিলেন, বঙ্গবন্ধু কন্যা, আমাদের প্রাণপ্রিয় নেত্রী সুস্থ আছেন। তখন শত কষ্ট-যন্ত্রনার মাঝেও নিজেকে একটু হালকা অনুভব করেছিলাম।

এরপর জননেত্রী শেখ হাসিনার একান্ত সহযোগীতা ও তার তত্বাবধানেই দীর্ঘদিন বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা গ্রহণ করে মোটামুটি সুস্থ হই। তবে আমার চিকিৎসা চলাকালীন সময়ে আমার মিরপুরের আওয়ামী লীগের তৃণমূল নেতাকর্মী থেকে শুরু করে দলের উর্ধ্বতন অনেক নেতাকর্মীই আমার পাশে দাঁড়িয়েছেন। নিয়মিত আমার চিকিৎসার খোঁজ খবর নিয়েছেন। হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পেয়ে বাসায় আসার পরেও বঙ্গবন্ধু কন্যা দেশনেত্রী শেখ হাসিনা ও দলের অনেক নেতাকর্মীরা নিয়মিতভাবে আমার শারীরিক অবস্থার খোঁজ খবর নিয়েছেন। এজন্য আমি দেশনেত্রী, জননেত্রী, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সেই সকল নেতাকর্মীদের প্রতি বিশেষভাবে কৃতজ্ঞ।

আজিজুর রহমান বাচ্চু আরো বলেন, আজও আমার শরীরে গ্রেনেডের অসংখ্য স্প্রিন্টার থাকায় মাঝে মাঝেই হঠাৎ নানা শারীরিক সমস্যা হয়। অসুস্থ হয়ে পড়ি। তখন শারীরিকভাবে যতটুকু না অসুস্থ মনে হয়, তার চেয়ে বেশি মানসিক যন্ত্রণা আমাকে তাড়া করে বেড়ায়। কল্পনায় ভেসে আসে সেদিনের সেই ভয়াবহ কলঙ্কিত দৃশ্যপট। সেদিন যদি দেশনেত্রী শেখ হাসিনার কিছু একটা হয়ে যেতো? আমরা হারাতাম আজকের এই চৌকস, বলিষ্ঠ নেতৃত্ব। হয়তো বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা বিনির্মানে আজকের সকল দৃশ্যমান উন্নয়ন দেখতে পেতো না দেশবাসী। তার হাত ধরেই পৃথিবীর বুকে বাংলাদেশ আজ মধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে, উন্নয়নের রোল মডেল হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে; হয়তো তা আর হয়ে উঠতো না। স্বৈরাচারী স্বৈরশাসকদের রাক্ষুসে থাবায় আজকের এই বাংলাদেশ হয়তো চলে যেতো অনিশ্চিত অন্ধকার কোনো ভবিষ্যতের দিকে।

একাত্তরের দালাল দোসরদের মতো ২১ শে আগষ্টের নৃশংস হামলাকারীদের বয়কটের পাশাপাশি বাকী জীবনে এমন দৃশ্য দেখতে চাই না উল্লেখ করে তিনি বলেন, বাঙালি জাতির ভবিষ্যতের ইতিহাসে এমন কলঙ্কিত ও বিভীষিকাময় মূহুর্ত আর দেখতে চাই না। ২০০৪ সালের ২১ আগষ্ট বাঙালি জাতির রাজনৈতিক ইতিহাসে যে কলঙ্কের কালিমা লেপটে দিয়ে গেছে, তা কোনদিনই মুছবে না। জাতির হৃদয়ে এই কলঙ্কিত কালো অধ্যায় রচিত দিনটি হয়ে থাকবে চিরস্মরণীয়। আমার মতো অনেককেই হয়তো সেদিনের সেই বিভীষিকাময় মৃত্যু-ধ্বংস-রক্তস্রোতের ভয়ংকর স্মৃতি গুলো আজও অনেককেই তাড়া করে বেড়ায়। সেদিনের শহীদদের প্রতি আমার বিনম্র শ্রদ্ধার পাশাপাশি আহতদের প্রতি সহমর্মিতা জানাই।

“বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলায় থাকবে না কোন অশান্তি, হিংসা, বিদ্বেষ, রাহজানি। থাকবে শুধুই অনাবিল সুখ, শান্তি, ভালোবাসা, উন্নয়ন, হাসি-আনন্দের বন্যা। এ কামনার পাশাপাশি আজকের এই উন্নয়নশীল বাংলা গড়ার কারিগর, বিশ্ব মানবতার মা, বঙ্গবন্ধু কন্যা, দেশনেত্রী শেখ হাসিনার সার্বিক সুস্থতা ও দীর্ঘায়ু কামনা করছি। কেননা, তার হাত ধরেই বাঙালি জাতি আজ মুক্তির দ্বারপ্রান্তে”যোগ করেন আওয়ামী লীগের এই নেতা।