মিরপুরে ফুটপাত দখল করে চলছে রমরমা বাণিজ্য

৪:৪৭ অপরাহ্ণ | শনিবার, আগস্ট ২৪, ২০১৯ ঢাকা, দেশের খবর

রাজু আহমেদ, ষ্টাফ রিপোর্টার- রাজধানীর ফুটপাতগুলোর ব্যবহার সুনিশ্চিতে উচ্চতর আদালতের সুনির্দিষ্ট নির্দেশ থাকলেও তা মানছে না কেউই, প্রতিপালনও হচ্ছেনা। ফলে জনসাধারণের কাজেই আসছে না ফুটপাত। সমগ্র রাজধানীর ফুটপাতগুলো বেদখলের ধারাবাহিকতায় রাজধানীর মিরপুরের ফুটপাতগুলোও কিছু প্রভাবশালীদের জন্যে এখন কোটি কোটি টাকা আয়ের উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছে।

রাজধানীর ব্যস্ততম এলাকা মিরপুর জুড়ে ফুটপাতগুলো দখল করে বানিজ্য, নৈরাজ্য, রাজনীতি বা হানাহানি নতুন ব্যাপার নয়। জনসাধারণের চলাচলের সুবিধায় রাজপথ থেকে গলিপথ ঘেঁষে ফুটপাতের জন্ম হলেও বেদখল কাণ্ডে জনগণের চলাচলের সুবিধা শিকেয় উঠেছে।

মহানগরবাসীর করের টাকায় ফুটপাতের জন্ম ঘটলেও এর মালিকানা কাগজে কলমে দুই সিটি কর্পোরেশনের। কিন্ত বাস্তবের চিত্রটি ভিন্ন। ফুটপাতের মালিক ক্ষমতাশালীরা, প্রভাবশালীরা।

কার্যকর আইন ও উচ্চ আদালতের আদেশ থাকা সত্ত্বেও পুলিশসহ সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের গাফিলতির কারণে মিরপুরের ফুটপাত দখলমুক্ত রাখা সম্ভব হচ্ছে না বলে অভিযোগ রয়েছে। সমস্যাটি জিইয়ে রাখার জন্য পুলিশের গাফিলতিকে দুষছেন কিছু সুবিধাভোগী প্রভাবশালী স্থানীয় রাজনৈতিক নেতারাও। পক্ষান্তরে এই দায় নিতে নারাজ পুলিশ। তাদের মতে সমস্যাটি রাজনীতিবিদদেরই সমাধান করতে হবে।

অন্যদিকে মিরপুরবাসীর অভিযোগ, ফুটপাত দখলমুক্ত না থাকায় যানজটে ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানবাহনে বসে থেকে অসহনীয় ভোগান্তি পোহালেও কিছুই করার থাকে না তাদের। যদি ফুটপাতে হাঁটার পরিবেশ থাকত তাহলে যানজটও কম হতো। মানুষ গণপরিবহন ছেড়ে হেঁটে গন্তব্যে যেত।

ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের পরিসংখ্যাণ মতে, নগরীর ১৬৩ কিলোমিটার ফুটপাত রয়েছে। এরমধ্যে ১০৮ দশমিক ৬০ কিলোমিটার ফুটপাতই এখন অবৈধ দখলে। আর ২২৮৯ দশমিক ৬৯ কিলোমিটার সড়কের মধ্যে ৫৭২ দশমিক ৪২ কিলোমিটার রয়েছে বেদখল। এগুলোতে সরকার দলের অঙ্গসংগঠনে নেতা-কর্মীদের ছত্রচ্ছায়ার বসেছে পণ্যের পসরা। কোথাও কোথাও ফুটপাত ছাড়িয়ে মূল সড়ক পর্যন্ত বসছে পণ্যের পসরা। ফলে নগরীতে পথচারীদের ভোগান্তি আর সড়কের যানজট তীব্র আকার ধারণ করেছে।

বাংলাদেশ ছিন্ন মূল হকার্স সমিতির জরিপের তথ্যমতে, নগরীর ফুটপাতের ১৩ ভাগ হকারদের দখলে, ১৫ ভাগ মার্কেট মালিকদের দখলে, পাবলিক টয়লেট ও অন্যান্য যাত্রী ছাউনি ৫ শতাংশ, রাজনৈতিক দলের অফিস ১ শতাংশ, সব মিলিয়ে ৪৮ শতাংশ বিভিন্ন দখলে রয়েছে, এবং ৫২ শতাংশ উন্মুক্ত রয়েছে।

ছিন্নমূল হকার্স সমিতির তথ্য মতে, নগরীতে ১ লাখ ৩০ হাজার মানুষ হকারী পেশার সাথে জড়িত।

ঢাকা সিটি ম্যানুয়াল- ১৯৮২ ও ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ অধ্যাদেশ ১৯৭৬-তে রাজধানীর ফুটপাতগুলো দখলমুক্ত রাখতে বলা হয়েছে। একই সঙ্গে ফুটপাত পথচারীদের হাঁটার জন্য উপযোগী করার কথাও উল্লেখ রয়েছে।

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ অধ্যাদেশের ১৫ নম্বর ধারায় পুলিশের সাধারণ দায়িত্ব সম্পর্কে বলা হয়েছে, জনগণের জন্য অস্বস্তিকর ও ক্ষতিকর অবস্থার অবসান ঘটানোর দায়িত্ব পুলিশের। ফুটপাত থাকবে পথচারীদের নির্বিঘ্নে হাঁটার উপযোগী পরিবেশ। ফলে ফুটপাত দখল করে দোকান দিয়ে পথচারীদের হাঁটা-চলায় বাধা সৃষ্টি করলে তা সমাধানের দায়িত্ব পুলিশের।

মিরপুরের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ চিড়িয়াখানার ও বোটানিক্যাল গার্ডেনের পার্কিং, রোডের সনি সিনেমা হলের অদূরেই ঈদগাঁ মাঠের সামনে মূল সড়ক দখল করে বাজার বসিয়ে জনদূর্ভোগ সৃষ্টির বিষয়ে ঢাকা মহানগর উত্তর আওয়ামী লীগের মিরপুরস্থ ৯৩ নম্বর ওয়ার্ডের সভাপতি শেখ আব্দুল মান্নান বলেন, ‘স্থানীয় সংশ্লিষ্ট থানা পুলিশ যদি ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি দেখায়, তাহলে ফুটপাত দখল মুক্ত রাখা সম্ভব। আমার তেমন কোনো ক্ষমতা নেই ফুটপাত দখলমুক্ত করার। আপনারা থানার ওসিকে বলেন ব্যবস্থা নিতে। প্রশাসন এই বাজার সরিয়ে দিলে আমার কোন আপত্তি নাই।’

তিনি বলেন, ‘আমরা উদ্যোগ নিয়ে ফুটপাত উচ্ছেদ করলেও কয়েক মূহুর্ত পরেই আবার যে অবস্থা ছিল, সেই অবস্থাই হয়ে যায়। এ ব্যাপারে পুলিশ যদি সচেতন থাকে তাহলে ফুটপাত দখল করতে পারবে না। কারণ পুলিশ সব সময় মাঠে দায়িত্ব পালন করে থাকে। আমরা রাজনীতিবীদরা কেউ সার্বক্ষণিক মাঠে দায়িত্বে থাকতে পারি না।’

অপরদিকে ফুটপাত দখলমুক্ত করার বিষয়ে পুলিশ বলছে, ‘পুলিশ নিয়মিতভাবেই ফুটপাথ দখলমুক্ত করতে কাজ করে যাচ্ছে। হকাররা দেশের একটি বড় ইস্যু, সেটা সরকার ও রাজনীতিবিদরা জানেন। শুধু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীরা যদি তাদের ফুটপাত থেকে উঠিয়ে দেয়, তাহলে সেটা সফল হবে না।’

ফুটপাত দখল আর বেদখল বিষয়ে ভিন্নমত পুলিশ প্রশাসন আর স্থানীয় প্রভাবশালী রাজনীতিবিদদের মাঝে। এই মতভিন্নতার কারণে মাঝখানে সুযোগ পাচ্ছে দখলবাজরা। যাদের আয় রুজির উৎসই হলো ফুটপাত। এই উৎসকে জিইয়ে রাখতে ওইসব দখলবাজরা ধর্ণা দেয় রাজনীতিবিদ আর পুলিশের দুয়ারে। ধর্ণার পর তা কার্য্যকর হওয়ার পর ভাগবাটোয়ারায় উনিশ বিশ হলেই লোক দেখানো অভিযানে নামে স্বার্থ সংশ্লিষ্টরা। আবার কিছুদিন অথবা কিছুক্ষণ পরই ঘুরে ফিরে সেই চেহারায় উপনীত হয় রাজধানীর ফুটপাত।

মিরপুরবাসীর  দাবি, মিরপুরের ফুটপাত ও চলাচলের পথকে জনসাধারণের ব্যবহার ও পথচারীদের জন্য অবশ্যই পরিচ্ছন্ন এবং উন্মুক্ত রাখতে হবে। অবৈধ স্থাপনা অপসারণে বিবাদীদের পরিকল্পিত পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। সড়কের ফুটপাত ও চলাচলের পথে নির্মাণসামগ্রী রাখা বন্ধ করতে হবে। এ ছাড়া ‘দরিদ্র’ হকারদের সরকার ক্রমান্বয়ে পুনর্বাসন করতে পারে।

নির্ভরযোগ্য সূত্রমতে, মিরপুর এক নম্বরস্থ হযরত শাহ্ আলী (রঃ) মাজার শরীফ, সনি সিনেমা হল থেকে চিড়িয়াখানার ফুটপাত দখল করে অবৈধভাবে পসরা সাজিয়ে বসা হকারদের কাছ থেকে প্রতি মাসে কোটি টাকার চাঁদা আদায় করছে ক্ষমতাসীন দলের লোকজন এবং স্থানীয় প্রভাবশালীরা।

অভিযোগ রয়েছে শুধু ক্ষমতাসীন দলের লোকজনই নয় এ বিশাল চাঁদার বাজার থেকে সংগৃহীত চাঁদার ভাগ যাচ্ছে পুলিশের পকেটেও। বেসরকারি একটি প্রতিষ্ঠানের পরিসংখ্যান মতে প্রতিমাসে শুধু রাজধানী মিরপুরের ফুটপাত থেকেই কয়েক কোটি টাকা চাঁদা আদায় হয়।

এদিকে, লোকচলাচল নির্বিঘ্ন করতে এবং যানজট কমাতে সিটি করপোরেশনের ভ্রাম্যমাণ আদালতকে ফুটপাত দখলমুক্ত করার অভিযানে নেমে প্রতিমুহূর্তে বেকায়দায় পড়তে হচ্ছে। যারা ফুটপাত দখলে রেখেছে তাদের অধিকাংশই বিভিন্ন প্রার্থীর কর্মী, সমর্থক উঠতি পাতি নেতারা। ফুটপাতের তাদের দখলকৃত দোকানগুলোতে শোভা পাচ্ছে মেয়র-কাউন্সিলরদের নাম ও ছবি সম্বলিত পোস্টার-ফেস্টুন ও ব্যানার। এসব পোস্টার ফেস্টুন প্রদর্শন করে জানান দিচ্ছে তারা কার লোক।

মিরপুর ১ নম্বরের সনি সিনেমা হলের পাশের ঈদগাহ মাঠের সামনে মূল সড়ক দখল করে বসানো বাজারের লাইনম্যান নূর হোসেনের সাথে কথা বললে তিনি জানান, বাজারটির ব্যবসায়ী বা দোকানিদের নিকট থেকে দৈনিক নির্ধারিত ভাড়াটা আদায় করে স্থানীয় প্রভাবশালী দুই নেতা শেখ আব্দুল মান্নান ও সুরুজ্জামানের মিয়ার কাছে পৌছে দেওয়াই আমার কাজ। আমি প্রতিদিনের হাজিরায় তাদেরই কামলা মাত্র। মূলত এই বাজারটা তারা নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি প্রতিমাসে আদায়কৃত ভাড়া ভাগ বাটোয়ারার দায়িত্ব তাদেরই।

তাছাড়া সনি সিনেমা হল থেকে শুরু করে শাহ্ আলী মাজার পর্যন্ত ফুটপাতের দোকানগুলোর নির্ধারিত ভাড়া তুলতে লাইনম্যান হিসেবে কাজ করেন কবির। প্রতিটি ফুটপাত স্থানভেদে পজিশন বিক্রি ১০ হাজার থেকে ৫০ হাজার টাকায়। তবে বেশিরভাগ পজিশন বিক্রি হয়েছে ৮ থেকে ১০ হাজার টাকায়। ভ্যান গাড়িতে করে যারা ভ্রাম্যমাণ খাবার বিক্রি করেন তাদেরকেও টাকা দিয়ে ব্যবসা করতে হয়। ভ্রাম্যমাণ বাদাম বিক্রেতাদেরকে প্রতিদিন দিতে হয় ২০ থেকে ৫০ টাকা।

এ বিষয়ে ৯৩ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মোঃ সুরুজ্জামানের বক্তব্য জানতে তার সাথে মুঠোফোনে যোগাযোগ করলে তিনি বলেন, আমি ঢাকার বাইরে কুমিল্লায় আছি। ঢাকায় ফিরে এসে এ বিষয়ে কথা বলবো।