বিলুপ্ত প্রায় সাদাপদ্ম দেখতে দর্শনার্থীদের ঢল

১১:৪৩ পূর্বাহ্ণ | সোমবার, আগস্ট ২৬, ২০১৯ ফিচার

অসীম কুমার সরকার, তানোর (রাজশাহী) সংবাদদাতা: ফুলের রাণী পদ্ম। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় তার ‘কেউ কথা রাখে নি’ কবিতায় বলেছিলেন ১০৮টি নীল পদ্মের কথা! এমনি সাহিত্যের পরতে পরতে মিলবে পদ্মের উপাখ্যান।

নীল নয়, গোলাপী নয়, সাদাপদ্মের দেখা মিলবে তানোর উপজেলা সীমানাবর্তী চৌবাড়িয়া ব্রীজ সংলগ্ন আন্দাসুরা বিলে। শরতের ফুল হলেও বর্ষাতেই তার সৌন্দর্য ও শুভ্রতার প্রতীক নিয়ে হাজির হয় ‘পদ্ম’। প্রকৃতিতে নিজের রূপ বৈচিত্র্য অকাতরে বিলিয়ে দিচ্ছে জলাভূমি ও বিলেঝিলে ফুটে থাকা এ জলজ ফুলের রাণী।

প্রাকৃতিকভাবে জন্ম নেওয়া জলজ ফুলের রাণী এই পদ্মফুল সৌন্দর্য বাড়িয়ে দেয় বিলের চিত্র। তাই প্রতিদিনই এ সৌন্দর্য উপভোগ করতে আসছে দর্শনার্থীরা! বাড়ছে বিলপাড়ে সাদাপদ্ম ফুল দেখতে আসা মানুষের সংখ্যা। তবে নীল ও গোলাপী পদ্মের দেখা পাওয়া গেলেও সাদাপদ্ম এখন অনেকটায় বিলুপ্তের পথে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় বিলপাড়ের প্রবীণরা।

অপূর্ব সুন্দর এই বিল দেখতে আসতে হবে রাজশাহীর তানোর উপজেলার সীমানাবর্তী চৌবাড়িয়া ব্রীজ থেকে ১০০গজ দূরে মান্দার ভাঁরশো ইউনিয়নের আন্দাসুরা বিল। দূর থেকে মনে হবে যেন ফুলের বিছানা পাতা। এত দিন অনেকটাই লোকচক্ষুর অন্তরালে ছিল বিলটি। বিলের চারদিকে শুধু পদ্ম আর পদ্ম। বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে এ পদ্ম দেখলে মন-প্রাণ জুড়িয়ে যায়। এমন অপরূপ দৃশ্য ভ্রমণপিপাসুদের হাতছানি দেয়। বিলে নৌকায় ঘুরতে ঘুরতে হঠাৎ আবারও মনে পড়তে পারে কবি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘কেউ কথা রাখেনি’ কবিতাটি : মামা বাড়ির মাঝি নাদের আলি বলেছিল, বড় হও দাদাঠাকুর/ তোমাকে আমি তিন প্রহরের বিল দেখাতে নিয়ে যাব/ সেখানে পদ্মফুলের মাথায় সাপ আর ভ্রমর খেলা করে!/ নাদের আলি, আমি আর কত বড় হব? আমার মাথা এই ঘরের ছাদ ফুঁড়ে আকাশ স্পর্শ করলে তারপর তুমি আমায়/তিন প্রহরের বিল দেখাবে ?

কবিতাটি পড়ে যাঁদের তিন প্রহরের বিল আর পদ্ম ফুল দেখার সাধ জন্মেছিল, তাঁরা কিছুটা হলেও সান্তনা পেতে পারেন বিল আর পদ্ম ফুল দেখার হাহাকার থেকে।

এই পদ্মবিলে সকালের দিকে ফোটাপদ্ম বেশি দেখা যায়। পড়ন্ত বিকেলে ফুলের সঙ্গে অস্তগামী সূর্য আপনার মনের কাব্যিকতা বাড়িয়ে দেবে কয়েক গুণ। বিলের পাশে প্রশস্ত পাকা রাস্তা চাইলে দেলুয়াবাড়ী দিয়ে রাজশাহী কিংবা নওগাঁ শহর কিংবা চৌবাড়িয়া হয়ে তানোর দিয়ে রাজশাহীতেও যাওয়া যায়।

বিলের অপরূপ পদ্মের গোল গোল পাতা বাতাসে ছন্দ তোলে। আর তাতে টমমল অপূর্ব জলরাশি। ফোটাপদ্ম আর হরেক রকমের পাখিদের বিচরণ আপনাকে বিমোহিত করবে। এই পদ্মবিল তৃষ্ণা মেটাচ্ছে প্রকৃতিপ্রেমীদের।

সরজমিন গিয়ে দেখা গেছে, বিস্তৃর্ণ জলাভূমি। চারদিকে লতাগুল্ম, কোথাও সিঙ্গারাফল, লিখাড় ফলেরও দেখা মিলে। এরই মাঝে ভেসে রয়েছে অগণিত পদ্ম। স্নিগ্ধ তার রং আর আকাশে মেঘের ভেলায় দুইয়ে মিলে যেন একাকার প্রকৃতি। সারা বছর পানি থাকে এমন জায়গায় পদ্ম ভাল জন্মে। তবে খাল-বিল, হাওর ইত্যাদিতেও এ উদ্ভিদ জন্মে। পাতা বড় এবং গোলাকৃতি, কোন কোন পাতা পানিতে লেপটে থাকে, কোনটা উঁচানো। বর্ষাকালে ফুল ফোটে। ফুল বৃহৎ এবং বহু পাপড়িযুক্ত। সাধারণত বোঁটার উপর খাড়া, ৮-১৫ সেমি চওড়া। ফুলের রং লাল, গোলাপি ও সাদা, সুগন্ধিযুক্ত। হিন্দুদের দুর্গাপূজার প্রিয় ফুল। ফুল ও ফলের ভেষজগুণ আছে। পদ্মের মূল, কান্ড, ফুলের বৃন্ত ও বীজ খাওয়া যায়। পুরাতন গাছের কন্দ এবং বীজের সাহায্যে এদের বংশবিস্তার হয়।

মান্দার ভাঁরশো ইউনিয়নের শত বছরের (২৪৭.৭০ একর) আন্দাসুরা বিলটি এখন স্থানীয় প্রশাসনের কাছ থেকে ইজারা নিয়েছেন বাগমারা উপজেলার এক ব্যবসায়ি। তাই মৎস্যজীবী ও স্থানীয়দের এখন এই বিলে মাছ ধরা নিষেধ। অবশ্য দর্শনাথীদের জন্য ইজারাদার ৩/৪টি নৌকা রেখেছেন। চাইলে যে কেউ ১০০ থেকে ২০০টাকা ভাড়ায় বিলটি ঘুরে দেখতে পারেন। নৌকার মাঝিরা জানান, মাছ চাষের জন্য বেশকিছু পদ্মপাতা ও ফুল ইতিমধ্যে পরিস্কার করা হয়েছে। পদ্মের নিচে মাছ ধরা যায় না। তাই সারাবিলেই পদ্ম ও জলজ উদ্ভিদ কাটা হবে বলে জানান তারা।

বেসরকারি উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান (বাংলাদেশ রিসোর্স সেন্টার ফর ইন্ডিজেনাস নলেজ) বারসিক এর সহযোগী কর্মসূচী কর্মকর্তা অমৃত কুমার সরকার বলেন, উন্মুক্ত বিলে ইজারা দিয়ে মৎস্য চাষ ঠিক নয়। এতে স্থানীয় মৎস্যজীবী ও মৌসুমী পদ্মফুল, ফল বিক্রিতারা কষ্টের মুখে পড়বে। সাদাপদ্ম ফুল এখন অনেকটায় হারিয়ে যেতে বসেছে। এর সংরক্ষণ প্রয়োজন। সাদাপদ্ম ঔষধিগুণ সম্পন্ন ফুল। শ্বেত রোগ ভালো করে। হ্নদরোগ ঝুঁকি ও যন্ত্রণা কমায়। কেবল পবিত্রতার প্রতীক হিসেবে নয়, ভেষজ গুণ সমৃদ্ধ এই পদ্ম সংরক্ষণের প্রতি গুরুত্বারোপ করতে আমরা এর যে কান্ডটি আছে সেটাকে যদি এনে পুকুরে লাগাই তাহলে এখান থেকে প্রচুর উৎপাদন করা সম্ভব।

এ নিয়ে নাটোর শহর থেকে দেখাতে আসা দর্শনার্থী কবি কামাল খাঁ জানান, এক কথায় অনবদ্য। এমন সুন্দর সাদাপদ্ম দেখে চোখ জুড়িয়ে যায়। তাই বিভিন্ন ভাবে সেলফী তুলেছি মনের মতো করে। আরেক দর্শনার্থী রাজশাহী থেকে আসা বিশিষ্ট কবি ও সাংবাদিক শামীম হোসেন জানান, আন্দাসুরা, জলের মাচান বেয়ে দূর বিশ্বের পদ্মবাগান…। তাই দূর থেকে দেখে আর থামতে পারলাম না। নৌকা নিয়ে গোল গোল পদ্মপাতা ও পদ্মফুল তুলে আনলাম। সত্যি এ এক অন রকম অনুভূতি।

ভারত ও ভিয়েতনামের জাতীয় ফুল পদ্ম। প্রবল জ্বরে পদ্মপাতার ওপর শুয়ে থাকলে জ্বরের প্রকোপ কমে। পদ্ম হিন্দুদের কাছে অতি পবিত্র ফুল। প্রাচীন সাহিত্য, শিল্প ও স্থাপত্যকলায় পদ্মের নানামুখী ব্যবহার লক্ষ্য করা যায়। বৌদ্ধদের কাছে এই সাদাপদ্ম সৌন্দর্য ও শুভ্রতার প্রতীক।