‘খয়রাতি’ মনের নিউজ ‘বুলেট’

৭:৪৩ পূর্বাহ্ণ | রবিবার, সেপ্টেম্বর ১, ২০১৯ ফিচার
Asadulla Badal

আসাদুল্লাহ বাদল : সংবাদের রাজনৈতিক অর্থনীতি ও অর্থনৈতিক ভিত্তির সংবাদ কারখানা করপোরেট দুনিয়ার বাইরে কখনও যেতে পারেনি। খয়রাতি টাইপের বিদেশি সংবাদ অনুকরণের বাইরে যাওয়ার চেষ্টা কখনও করাই হয়নি। ডিপ্লোমা কোর্স বা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রির সব সিলেবাসই মার্কিন ধাঁচের। বিশেষত খয়রাতি কিসিমের যোগান দেওয়া। যারা এই যোগান দেয়, তাদের উদ্দেশ্য কি? কেবল খয়রাতি পাওয়া বিদ্যায় খুশি থাকব, না আসল মতলব দেখে সিদ্ধান্ত নিব?

সংবাদের সংজ্ঞা থেকে শুরু করে সব কিছুরই প্রেসক্রিপশন বিদেশি স্টাইলে। ১৮৪০ খ্রিস্টাব্দে সংবাদ কারখানা প্রতিযোগিতায় প্রবেশ করেছে। কিন্তু আমরা আরও পরে সংবাদ জগতে প্রবেশ করেছি। ১৮৬৩ খ্রিস্টাব্দে কাঙাল হরিনাথ সম্পাদিত ‘গ্রামবার্ত্তা প্রকাশিকা’ কুষ্টিয়ার কুমারখালী থেকে প্রকাশ হয়। বাংলাদেশে এটিই প্রথম সংবাদপত্র। এটি টিকে ছিল ২২ বছর।

সংবাদপত্র এরপরে বহু ধাপ অতিক্রম করেছে। ৩০ বছর আগেও এদেশের কোনো কোনো প্রান্তে খবরের কাগজ পরের দিন পড়তে হতো। ঢাকা জেলারও কোনো কোনো অঞ্চলে বিকালের আগে সংবাদপত্র পড়া সহজ ছিল না। এখন এই হিসাব এমন ভাবে পাল্টে গেছে, যা ইতিহাসের পরিক্রমায় মিলিয়ে দেখা সম্ভব নয়।

এত কিছুর পরও আমাদের নিজস্ব কোনো সংবাদ স্টাইল কেন দাঁড়ায়নি? আমাদের দেশে যারা সংবাদপত্রের ওপর বাংলা বা ইংরেজি ভাষায় বইপত্র লেখা হয়েছে সবই খয়রাতি পাওয়া অনুকরণ করে। নতুন কোনো স্টাইল আমরা ধরতেই পারিনি। প্লেটো যখন গ্রিসে বসে বই লিখেছে, তখন ভারত বসে বই লিখেছে কৌটিল্য। কিন্তু প্লেটো যে মর্যাদা ভারতে পেয়েছে, কৌটিল্য এর ধারে কাছেও যেতে পারেনি। কার লেখার বিষয়বস্তু কি বা মান কি মাপের এই প্রশ্ন না রেখে, কেবল লেখার সময়কে গুরুত্ব দিতে চাই।

আমেরিকার মানুষের জীবন যাপন বা ব্রিটিশের জীবন যাপনের সঙ্গে আদৌ আমাদের কোন মিল আছে কি? আমেরিকার মানুষ সংবাদের শিরোনাম পড়েই ক্ষান্ত দেয়। ব্রিটিশরা সংবাদপত্র বাসা পর্যন্ত নিয়ে যেতে চায় না। রাস্তার পাশে আবর্জনার স্তূপে ফেলে রেখে যায়। সংবাদপত্র পড়ার পড় এটি সংরক্ষণের তেমন কোন প্রয়োজন বোধ করে না। বরং বাসায় নিয়ে স্তূপ করাকে বিরক্ত ও অপ্রয়োজনীয় ভাবে। এসবের ব্যতিক্রমও আছে। কেবল সূত্রের যোগে আমাদের নিজস্ব স্টাইল থাকা দরকার। ব্যাকরণে ভর করে খবর লেখা জরুরি নয়। সংবাদপত্র যেহেতু শিল্প সে কারণে সব ব্যাকরণ মানাও অসম্ভব। এমনকি না মানলে তেমন অসুবিধা নেই।

সাংবাদিকতার একজন শিক্ষক গত শতাব্দীর আটের দশকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছিলেন। তিনি আফসোস করে লিখেছেন মফিদুল হকের লেখা ‘মনোজগতে উপনিবেশ: তথ্য সাম্রাজ্যবাদের ইতিবৃত্ত’ ১৯৮৪ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশ হয়। বইটি উৎসর্গ করা হয়েছিল ১৯৮৩ খ্রিস্টাব্দে আদমজীতে নিহত শ্রমিকনেতা তাজুল ইসলামকে। তাজুল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে সম্মানসহ মাস্টার ডিগ্রি অর্জন করে রাজনৈতিক কারণে শ্রমিকের পেশা বেছে নিয়েছিলেন। বইটি ১৯৯৩ পর্যন্ত চারবার ছাপা হয়। এরপরও ওই শিক্ষক বইটির নাম তখন শুনেননি। কোনো শিক্ষকও বলেন নি। অথচ ওই রকম আর কোনো বই বাংলাদেশে নেই। এই কারণে প্রথাবিরোধী ও করপোরেট বিরোধী লড়াইয়ে যুক্ত হওয়া জরুরি। কেবল সংস্কৃতির কারণে বাঙালি বলে দাবি করব, কিন্তু খয়রাত নিব মার্কিনি এটা কি হতে পারে? বিভিন্ন রেফারেন্স ঘেঁটে দেখা যায় বাংলাদেশে কমপক্ষে ৬০০ সাংবাদিকতার বইয়ের প্রকাশ ঘটেছে। এখনও ৪০০ বই পাওয়া যায়। এসব বইয়ের শ্রেণিকরণে ভিন্নমত থাকলেও মূল ধাঁচ একই। এরমধ্যে তাত্তি¡ক বই মূল ৫-৬০টি। এগুলোতে তেমন কোনো ফারাক নেই।

‘অসির চেয়ে মসি বড়’ এটি প্রতিষ্ঠিত প্রবাদ। এটি তখনই ধাঁচ করা যায়, যখন সংবাদ বা লেখাও বুলেটের মতোই কাজ করে। বিশেষত দুর্নীতির সংবাদ প্রকাশ পেলেই দৌড়ঝাঁপ শুরু হয় এক শ্রেণির। সংবাদ প্রকাশের পরে দৌড়ঝাঁপ শুরু হয় আর এক শ্রেণির। যখন যে শ্রেণি দৌড়ঝাঁপ শুরু করুক মতলব একই। রেহাই পাওয়ার বা রেহাই নেওয়ার ধরণে ফারাক থাকে না।

সংবাদ প্রকাশের জেরেই সাবেক ডিআইজি মিজানুর রহমানসহ কয়েক রুই কাতলা কারাগারে অন্তরীণ আছে। তিন বিচারপতি যথাক্রমে সালমা মাসুদ চৌধুরী, কাজী রেজা উল হক ও এ কে এম জহিরুল হককে প্রথমে বিচার কাজ থেকে বিরত রাখার আদেশ দেওয়া হয়। শেষ পর্যন্ত তাদেরকে ছুটিতে পাঠানো হয়েছে। তদন্ত কাজ ঠিক ভাবে সম্পন্ন করার জন্য আরও কিছু বিষয় তদারকি দরকার।

গাজীপুর জেলায় আইনজীবীদের মুখে মুখে দুই বিচারকের অসদাচরণের আমলানামা ঘুরছে। এই নিয়ে দেন দরবারের অভাব নেই। যারা অভিযুক্ত তারা নিজেরাই বিভিন্ন মহলে ধরণা দিচ্ছে! যারা অসদাচরণের দালালিতে জড়িত তারাও তৎপর। কেবল কেউ আন্দাজ করতে পারছে না, কোন ঘাটের জল কোন ঘাটে ভিড়ে। আমলানামা এমন এক ব্যাপার, এটি কখনও এক ঘাটে ভিড়ে থাকে না। ঘাটে ঘাটে ঘুরে। এমনই আমলনামা যোগফলের ঘাটে ভিড়েছে। হয়তো হতে পারে নিউজ বুলেট।