সংবাদ শিরোনাম
  • আজ ৩০শে আশ্বিন, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

মানবকল্যাণে চিকিৎসা সেবায় ‘কুমুদিনী হাসপাতাল’  

১১:৪৩ পূর্বাহ্ণ | শুক্রবার, সেপ্টেম্বর ১৩, ২০১৯ ফিচার

মো. সানোয়ার হোসেন, মির্জাপুর (টাঙ্গাইল) প্রতিনিধিঃ উপমহাদেশের প্রখ্যাত দানবীর রণদা প্রসাদ সাহার অনন্য কীর্তি আর্ত মানবতারসেবায় প্রতিষ্ঠিত টাঙ্গাইলের মির্জাপুরের দাতব্য চিকিৎসালয় ‘কুমুদিনী হাসপাতাল। যুগের সাথে তাল মিলিয়ে সময়োপযোগী চিকিৎসা পদ্ধতি আর আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জাম নিয়ে সমাজের অসহায় ও গরীবদের স্বাস্থ্যসেবায় বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে ৮১ বছরের পুরোনো এই হাসপাতালটি। চিকিৎসা সেবার খরচ  দেশের যেকোন হাসপাতাল হতে অনেক কম হলেও সেবার মানে সন্তুষ্ট হন হাসপাতালটিতে চিকিৎসা সেবা নিতে আসা সাধারণ মানুষ।  ঢাকা থেকে ৭০ কিলোমিটার দূরে টাঙ্গাইল জেলার মির্জাপুর উপজেলা সদরের দক্ষিণে লৌহজং নদীর তীরে এটি অবস্থিত।

জানা গেছে, রণদা প্রসাদ সাহার মায়ের নাম ছিল কুমুদিনী দেবী। তার বয়স যখন সাত বছর, তখন তার মাতা সন্তান প্রসবকালে ধনুষ্টংকারে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। অল্প বয়সে চিকিৎসার অভাবে তিনি তার মাতাকে হারান। আর কেউ যেন বিনা চিকিৎসায় মারা না যায়, সেজন্য তিনি নিজগ্রামে মায়ের নামে কুমুদনী হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করেন। মানবহিতৈষী আরপি সাহা প্রথমে ১৯৩৮ সালে মির্জাপুরের লৌহজং নদীর তীরে ২০ শয্যাবিশিষ্ট ‘কুমুদিনী ডিসপেনসারি’ স্থাপন করেন। এরপর ১৯৪৪ সালে সেটিই তার মায়ের নামে ‘কুমুদিনী হাসপাতাল’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৪৪ সালের ২৭ জুলাই বাংলার তদানীন্তন গভর্নর লর্ড আর. জি কেসী ২০ শয্যার এ হাসপাতালের উদ্বোধন করেন। পরবর্তীকালে হাসপাতালটি ৭৫০ শয্যায় উন্নীত করা হয়।

সমাজসেবক রণদা প্রসাদ সাহা ১৯৪৭ সালে কুমুদিনী ওয়েলফেয়ার ট্রাস্ট অব বেঙ্গল (বিডি) প্রতিষ্ঠা করেন। এটি বাংলাদেশের অন্যতম প্রাচীন জনকল্যাণমূলক একটি প্রতিষ্ঠান। কুমুদিনী হাসপাতাল আরপি সাহার নিজস্ব সম্পত্তি হলেও ১৯৪৭ সালে তিনি তার সমস্ত অর্থ-সম্পদ মানবকল্যাণে ট্রাস্টে দান করে দেন। সেই থেকে কুমুদিনী হাসপাতাল এই ট্রাস্টের অধীনেই পরিচালিত হয়ে আসছে। বর্তমানে আরপি সাহার নাতি শ্রী রাজীব প্রসাদ সাহা ট্রাস্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের দায়িত্ব পালন করছেন। কুমুদিনী ওয়েলফেয়ার ট্রাস্টের এই অঙ্গ প্রতিষ্ঠানটি দেশের অন্যতম বৃহৎ হাসপাতাল। এই হাসপাতালটির নির্মাণশৈলী আর সুবিস্তৃত জায়গা জুড়ে শোভাবর্ধনকারী বাহারি রঙের ফুল আর ভেষজ উদ্ভিদ। এ ছাড়াও রয়েছে হাসপাতালের উত্তর পাশে অবস্থিত সুবিশাল এক দীঘি আর দক্ষিণে বয়ে গেছে লৌহজং নদী।

দেশের অন্যান্য বেসরকারি হাসপাতালে প্রায় সব চিকিৎসকই খন্ডকালীন হলেও এখানকার চিকিৎসকগণ হাসপাতালে সার্বক্ষণিক দায়িত্ব পালন করে থাকেন। কারণ হাসপাতালের সীমানা প্রাচীরের ভেতরেই রয়েছে স্টাফ কোয়ার্টার। সেখানে তারা সপরিবারে বসবাস করেন। শুধু তাই নয়, ২০০১ সালে রণদা প্রসাদ সাহার নাতি রাজীব প্রসাদ সাহার হাত ধরে প্রতিষ্ঠিত হয় কুমুদিনী উইমেন্স মেডিকেল কলেজ। যার ফলে প্রতিনিয়ত এই মেডিকেলের ইন্টার্ন চিকিৎসক থেকে শুরু করে অধ্যাপক চিকিৎসকগণ হাসপাতালের রোগীদের চিকিৎসা দিয়ে থাকেন। এছাড়াও কুমুদিনী ট্রাস্টের আরেক অঙ্গ প্রতিষ্ঠান কুমুদিনী নার্সিং স্কুল এন্ড কলেজের শিক্ষার্থীরা সেবিকা হিসেবে সার্বক্ষণিক সেবাব্রত পালন করেন। এই হাসপাতাল থেকে রোগীদের তিনবেলা বিনামূল্যে খাবার বিতরণ করা হয়ে থাকে।

কুমুদিনী হাসপাতালের পরিচালক ডাঃ প্রদীপ কুমার রায় জানান, বর্তমানে হাসপাতালটিতে ডায়রিয়া, যক্ষা, নাক, কান, গলা, দন্ত, চোখ, মেডিসিন, অর্থোপেডিক, গাইনী, সার্জারিসহ বিভিন্ন ধরনের আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থা রয়েছে। এছাড়াও অত্যাধুনিক ল্যাবে পরীক্ষার মাধ্যমে জটিল ও কঠিন রোগের চিকিৎসাসেবা প্রদান করা হয়। এর মধ্যে বিশেষ করে নারীদের ফিস্টুলা এবং শিশুদের বাঁকা পা আর ঠোঁট ও তালুকাটা রোগীদের বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা দেয়া হচ্ছে। সম্প্রতি হাসপাতালে লিফট সুবিধার ব্যবস্থা করা হয়েছে। পাশাপাশি নতুন ভবনে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কেবিন ব্যবস্থা, সিটি স্ক্যান ও আইসিইউ সংযোজন করা হয়েছে। একই সাথে আউটডোর সেবার পরিধি বাড়ানোর লক্ষ্যে দ্বিতীয়তলায় বহির্বিভাগের সেবা কার্যক্রম বিস্তৃত করা হয়েছে। শুধু টাঙ্গাইল জেলা নয়, প¦ার্শবর্তী জেলাসমূহ ছাড়াও ভারত ও নেপাল থেকেও অনেক রোগী চিকিৎসার জন্য এখানে আসেন বলে তিনি উল্লেখ করেন।

রণদা প্রসাদ সাহার পুত্রবধু কুমুদিনী ট্রাস্টের পরিচালক শ্রীমতি সাহা বলেন, কুমুুদিনীর সেবামূলক কার্যক্রম শুরু হয় স্বাস্থ্যসেবা দানের মাধ্যমে। কুমুদিনী হাসপাতালের ভিত্তিপ্রস্তর ১৯৩৮ সালে স্থাপিত হলেও এর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হয়েছিল ১৯৪৪ সালে। বর্তমানে এর শয্যাসংখ্যা ৮৫০ বেডে উন্নীত করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠার পর থেকে হাসপাতালে রোগীদের বিনা পয়সায় চিকিৎসা দেওয়া হতো। ১৯৯৩ সাল থেকে ট্রাস্ট চিকিৎসার জন্য রোগীদের কাছ থেকে সামান্য খরচ নেওয়া শুরু করে। এখনো ভর্তি হওয়া রোগীদের থাকা-খাওয়া সম্পূর্ণ বিনামূল্যে। মাসে গড়ে এখানে বহির্বিভাগে চিকিৎসাসেবা গ্রহণ করেন ২৪ হাজার রোগী এবং ভর্তি হওয়া রোগীর সংখ্যা মাসে গড়ে ৩ হাজার ৬০০।

কুমুদিনী ট্রাস্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শ্রী রাজীব প্রসাদ সাহা বলেন, কুমুদিনী হাসপাতালের সেবার মান বৃদ্ধির লক্ষ্যে বেশ কিছু নতুন পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। আধুনিক চিকিৎসা পদ্ধতির সাথে অত্যাধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জাম সরবরাহ করাসহ কয়েকটি নতুন বিভাগ খোলা হয়েছে। এছাড়াও রোগীদের চাহিদার কথা মাথায় রেখে বেশ কিছু সংস্কার কাজ সম্পন্ন করার মাধ্যমে নতুন করে জনবল নিয়োগ দেয়া হয়েছে।