সংবাদ শিরোনাম
  • আজ ৩০শে আশ্বিন, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

‘খবর সংগ্রহ করতে গিয়ে নিজেই খবর হয়ে যাব, ভাবিনি’!

১০:২৪ পূর্বাহ্ণ | বৃহস্পতিবার, সেপ্টেম্বর ১৯, ২০১৯ আন্তর্জাতিক

আন্তর্জাতিক ডেস্ক- বিশেষ মর্যাদা বাতিলের পর সাধারণ মানুষের মতো ভয়ে আছেন জম্মু-কাশ্মীরের সাংবাদিকেরাও। অনেকে আটক হয়েছেন, কেউ কেউ শিকার হয়েছেন পুলিশের আক্রমণের। আনন্দবাজার পত্রিকা জানায়, শুধু সাংবাদিকদেরই নয়, হুমকি মুখে আছেন তাদের পরিবারের সদস্যরা।

শ্রীনগরে ৭ সেপ্টেম্বর টানা পাঁচ মিনিট পুলিশের লাঠির আঘাতের এখন ‘বেড-রেস্টে’ জম্মুর একটি পত্রিকার চিত্রসাংবাদিক শাহিদ খান। তার ডান কাঁধে চিড় ধরেছে। প্লাস্টার নিয়েই বললেন, ‘‘খবর করতে গিয়ে নিজে খবর হয়ে যাব, ভাবিনি।’’

শ্রীনগরের রায়নাওয়াড়ি এলাকায় মহরমের মিছিল ‘কভার’ করতে গিয়েছিলেন আর পাঁচজন চিত্রসাংবাদিকের সঙ্গে। পুলিশ তাদের বেধড়ক মারতে শুরু করে। শাহিদ বললেন, ‘‘পুলিশ। মারতে মারতে বলছিল, ভিডিও করে কেন আমাদের ঝামেলা বাড়াচ্ছ?’’

অভিযোগ রয়েছে, গোটা উপত্যকা জুড়ে এভাবেই হাত-পা বেঁধে রাখা হয়েছে সাংবাদিকদের। সরকারি মিডিয়া সেন্টারে একটা ইন্টারনেট কানেকশনে চলছে মাত্র ১০টা কম্পিউটার। খবরের জন্য সরকারি কোনো কর্মকর্তার সঙ্গে সাক্ষাৎ দূরের কথা, ফোনে কথা বলারও উপায় নেই। এর ওপর রাস্তায় বেরিয়ে খবর করতে গেলেই জুটছে পুলিশের মার।

কাশ্মীরের প্রবীণ সাংবাদিক নাসির এ গনাই বলেন, ‘‘সাংবাদিকদের চাপ দিয়ে ‘সোর্স’ জানতে চাইছে প্রশাসন।’’

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক শ্রীনগরের আর এক সাংবাদিক জানান, এই দেড় মাসের মধ্যে পুলিশি বাধার মুখে পড়ে তাকে অন্তত পাঁচবার ঘুরপথে খবর করতে যেতে হয়েছে। প্রবীণ সাংবাদিক শাহনেওয়াজ খান বললেন, ‘‘এ সব এখানে নতুন আর কী! পুলিশ আর সেনার দয়া ভিক্ষা করেই তো কাশ্মীরে কাজ করতে হয় সাংবাদিকদের। কারফিউ, নিষেধাজ্ঞার সময় তো সাংবাদিকদেরই বেছে বেছে নিশানা করা হয়।’’

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের স্থানীয় প্রতিনিধিরাও রয়েছে হুমকির মুখে। আন্তর্জাতিক চ্যানেলের হয়ে কর্মরত শাহানা বাট জানান, ৫ সেপ্টেম্বর ‘কারফিউ পাস’ থাকা সত্ত্বেও পুলিশ তাদের আটকে ক্যামেরা ভাঙার হুমকি দেয়।

ভালো নেই সাংবাদিকদের পরিবারের সদস্যরাও। তাদের হুমকি-ধমকি দিচ্ছে আইন-শৃঙ্খলাবাহিনী। শ্রীনগরের ৮ অক্টোবর তার সঙ্গে এমন ঘটনা ঘটেছে বলে জানান সাংবাদিক রিফাত মহিদিন।

গত সোমবার ভারতের সুপ্রিম কোর্ট সরকারকে ‘জাতীয় স্বার্থ এবং অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার বিষয়টি মাথায় রেখে’ কাশ্মীরে স্বাভাবিক অবস্থা ফিরিয়ে আনার নির্দেশ দিয়েছে।

সরকার জোর দিয়ে বলছে, পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে আসছে। হাসপাতাল-ক্লিনিকগুলো কাজ করছে, ওষুধের দোকানগুলো খোলা। খাদ্যপণ্যের পর্যাপ্ত মজুত আছে, ক্যাশ মেশিনগুলো কাজ করছে। স্কুল খোলা, ল্যান্ডলাইন ফোন আবার কাজ করতে শুরু করেছে।

সরকার এমনকি আপেল চাষীদের কাছ থেকে ন্যায্যমূল্যে ফল কিনতে রাজি হয়েছে, স্থানীয় সংবাদপত্রগুলোতে দেখা যাচ্ছে বিজ্ঞাপন – যাতে সোনালী ভবিষ্যৎ, কাজ ও উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে কর্তৃপক্ষ। তার পরেও মনে হতে পারে যে এই ‘স্বাভাবিক অবস্থা’ যেন একটা বিভ্রম।

ল্যান্ডলাইন ফোন এখন আবার চালু হচ্ছে, কিন্তু বেশির ভাগ লোকই এখনো ফোন সংযোগ পাচ্ছে না। কিছু সরকারি অফিস খোলা, কিন্তু তাতে লোকজন প্রায় নেই বললেই চলে।

সহিংসতার ভয়ে অভিভাবকরা বাচ্চাদের স্কুলে পাঠাচ্ছেন না। বেসরকারি স্কুলগুলো অভিভাবকদের বলছে, তারা যেন ফ্ল্যাশড্রাইভে করে পাঠদানের ভিডিও এবং পড়ার বইপত্র সংগ্রহ করে নেন।

ফলে এ অঞ্চলের শিশুকিশোররা এখন বাড়িতে বসে টিভি দেখছে, বাড়ির বাগানে ‘পাথর ছোঁড়া’ খেলছে। ‘ভারত কাশ্মীরের প্রতি যে অন্যায় করেছে’ তা নিয়ে চমৎকার কথা বলতেও শিখেছে তারা।

একজন স্কুল শিক্ষক বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, “আমাদের জীবনের পরিসর ছোট হয়ে গেছে, আমাদের মনটাই যেন অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছে।”

রাস্তায় বেরুলে দেখা যায়, ওষুধের দোকান ছাড়া অন্য দোকানপাট ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ। কড়া নিষেধাজ্ঞার কারণে স্থানীয় পত্রিকাগুলোকে এখন যেন চেনাই যায় না।

রাজনৈতিক নেতা, ব্যবসায়ী এবং অর্ধিকারকর্মী সহ প্রায় ৩ হাজার লোক এখন কারারুদ্ধ। নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে যে তারা বন্দীদের ওপর প্রহার-নির্যাতন চালাচ্ছে, তবে ভারত এসব অভিযোগকে ‘ভিত্তিহীন’ বলে অভিহিত করেছে।