তীব্র ভাঙ্গন ও স্রোতে অচলাবস্থা, দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া নৌরুটের ৫টি ঘাট বন্ধ

৫:৫৮ অপরাহ্ণ | শনিবার, অক্টোবর ৫, ২০১৯ ঢাকা, দেশের খবর

খন্দকার রবিউল ইসলাম, রাজবাড়ী প্রতিনিধি: পদ্মা নদীতে তীব্র স্রোতে আর নদী ভাঙ্গন অচলাবস্থা হয়ে পড়েছে দক্ষিনাঞ্চলের ২১টি জেলার প্রবেশদ্বার হিসেবে পরিচিত, গুরুত্বপূর্ন দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া নৌ রুট।

এরই মধ্যে ভাঙ্গনের কবলে পরে ০৪ অক্টোবর বন্ধ হয়ে যায় ছয়টি ফেরিঘাটের মধ্যে ৩টি ঘাট। বাকীগুলোও ছিল হুমকির মুখে। বাকি ৩টি ফেরি ঘাট দিয়ে পারাপার করা হচ্ছিল যানবাহন। গত ২ অক্টোবর বুধবার রাতে দৌলতদিয়া ১ নম্বর ফেরিঘাট ও ২ নম্বর ফেরিঘাটে মাঝে থাকা সিদ্দিক ব্যপারীর পাড়া গ্রামে অন্তত ২০০ পরিবার বসতভিটা হারিয়ে হয়েছে নিঃস্ব আশ্রয়হীন হয়ে পড়েছে।

আজ ৫ অক্টোবর সকাল থেকেই বন্ধ হয়েগেছে বাকী ৩টির মধ্যে ২টি ঘাট। মাত্র একটি ৬ নম্বর ফেরি ঘাট দিয়ে ছোট-৩টি ইউটিলিটি ফেরির মাধ্যমে কোন রকমের যানবাহন পারাপার করা হচ্ছে। যার কারনে বন্ধ প্রায় দৌলতদিয়া নৌরুটে যানবাহন পারাপার। এতে দুর্ভোগে পড়েছে যানবান চালক ও যাত্রীরা। তবে জরুরি ভিত্তিতে বালির বস্তা ফেলে ভাঙন ঠেকানোর চেষ্টা করছে পানি উন্নয়ন বোর্ডে।

রাজবাড়ীর গোয়ালন্দে পয়েন্ট পানি বৃদ্ধি হওয়ার সাথে সাথে ব্যপক ভাবে শুরু রয়েছে নদী ভাঙ্গন। নদীতে রয়েছে ঘূর্ণীয়মান তীব্র স্রোত।এমন স্রোতের কারণে জেলার দীর্ঘ ৮৫ কিলো মিটারের ৪টি উপজেলায় নদী তীরবর্তী এলাকায় ভাঙ্গন অব্যাহত রয়েছে। ভাঙ্গছে নদী পুরছে কপাল নিঃস্ব হচ্ছে হাজার হাজার পরিবার।

এতে আতঙ্কিত হয়ে পড়েছে মানুষ দৌলতদিয়া ইউনিয়নের নদী পাড়ের মানুষ। প্রায় গত এক মাসের ভাঙনে নদী গর্ভে বিলীন হয়েছে কয়েক হাজার বিঘা ফসলি জমি। সদর সহ ৪টি উপজেলার বেশ কয়েকটি ইউনিয়নে ব্যাপক ভাঙ্গন শুরু হয়েছে। এতে দিশেহারা হয়ে পড়েছে নদীর তীরে বসবাসরত মানুষ। দ্রত নদী শাসনের মাধ্যমে স্থায়ী সমাধান করার দাবি স্থানীয়দের।

জানাগেছে, গত ২২ সেপ্টেম্বর থেকে ৪টি উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় শুরু হয় নদী ভাঙ্গন। গোয়ালন্দ ভাঙ্গনকবলিত এলাকায় (বালু ভর্তি জিও ব্যাগ ফেলে ভাঙ্গন ঠেকানোর চেষ্টা করছে পানি উন্নয়ন বোর্ড।

গত ২২ সেপ্টেম্বর মঙ্গলবার থেকে ৫তারিখ পর্যন্ত কয়েক দফা ভাঙ্গনের ফলে হুমকিতে রয়েছে দৌলতদিয়া ঘাট এলাকার হাজার হাজার বসবাড়ী। যদিও পানি উন্নয়ন বোর্ডের পক্ষ থেকে বালু ভর্তি জিও ব্যাগ ফেলা অব্যাহত রয়েছে। কিন্তু স্থানীয়রা বলছে ভাঙ্গনের আগে কোন ব্যবস্থা নিচ্ছে না পানি উন্নয়ন বোর্ড। তাই আতঙ্কে নির্ঘুম রাত কাটছে ওই এলাকার মানুষের। ভাঙনের ফলে নিঃস্ব হয়ে অসংখ্য পরিবার আশ্রয় নিয়েছেন বাঁধের ওপরে।

বিআইডব্লিটিসি দৌলতদিয়া কার্যালয় সুত্রে জানা যায়,নদীর দৌলতদিয়া প্রান্তে থাকা ছয়টি ঘাটের মধ্যে ভাঙ্গনের কবলে পরে ১ নম্বর, ২ নম্বর ও ৪ নম্বর ঘাটটি বন্ধ হয়ে যায় গত ৪সেপ্টেম্বর। বাকি ৩ নম্বর, ৫ নম্বর ও ৬ নম্বর ঘাট সচল রয়েছে। কার্যালয়টির সুত্র আরো জানায়, এই নৌরুটে চলাচলের জন্য ১৭ টি ফেরি থাকলেও ৩ বিকল ও ১৪ টি ফেরি সচল রয়েছে। সচল থাকা ফেরিগুলোর মধ্যে রোরো ( বড় ) ৫ টি ফেরি সার্বক্ষনিক চলাচল করছিল। এর মধ্যে ৯ টি ফেরি স্রোতের বিপরিতে চলতে না পারায় বন্ধ রাখা হয়েছে। হঠাৎ স্রোতের গতি ও ভাঙ্গন আরো বেড়ে যায়। যার ফলে বর্তমানে মাত্র ৪টি ছোট ফেরি দিয়ে যানবাহন পারার করা হচ্ছে।

সরেজমিনে দৌলতদিয়া ফেরি ঘাটের ২ নম্বর ঘাট এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, সেখানে একের পর এক বড় বড় মাটির চাপ ভেঙ্গে পড়ছে নদীতে। উৎসুক শত শত মানুষ ভাঙ্গন দেখার জন্য ভির করছে। এ সময় দৌলতদিয়া ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য আশরাফুল ইসলাম আশরাফ বলেন, পদ্মার পানি বৃদ্ধির সাথে এই এলাকার ভাঙ্গন এতই তীব্র হয়েছে যা বলার মতো নয়। মুর্হুত্বের মধ্যে বসতবাড়ি নদীগর্ভে চলে যাচ্ছে শুধু চেয়ে দেখা ছাড়া আর কিছুই করার নেই। এমনকি বুধবার রাতে সিদ্দিক ব্যপারীর পাড়া গ্রামের কমপক্ষে ২০০ পরিবার ঘরবাড়ি সরিয়ে নিয়েছে। তিনি আরো বলেন, ভাঙ্গনরোধে পানি উন্নয়ন বোর্ড যে বালুর বস্তা ফেলছে তা একেবারেই কম।

এদিকে সরেজমিনে দেখা যায় দৌলতদিয়া ঘাটের জিরো পয়েন্টে গিয়ে দেখাযায়, জিরো পয়েন্ট থেকে ঢাকা খুলনা আঞ্চলিক মহা সড়কের গোয়ালন্দ ফিড মিল পর্যন্ত ৪ কিলোমিটার এলাকায় দুই সাড়ি যাত্রিবাহি বাস পারের অপেক্ষায় বসে আছে। এছারাও গোয়ালন্দ ঘাট থেকে ১০ কিলোমিটার পিছনে রাজবাড়ী সদর উপজেলার গোয়ালন্দ মোড় থেকে জামাই পালের মাজার আলাদিপুর পর্যন্ত পাচ কিলোমিটার এলাকায় এক সাড়িতে আটকে আছে পন্যবাহি ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যান।

এ সময় বাস ও ট্রাক চালকেরা জানান, দৌলতদিয়া ঘাটে এখন যাত্রি নিয়ে কমপক্ষে ১৫ ঘন্টা বসে থাকতে হচ্ছে। তারপর পাওয়া যাচ্ছে ফেরি। অনেক আবার আগের দিন রাতে এসে পর দিন বিকেলেও ফেরির নাগাল পায়নি।

ট্রাক চালকেরা জানান, গোয়ালন্দ মোড় এলাকায় যেখানে আটকে রাখা হয়েছে, সেখানে নেই কোন দোকান, হোটেল ও প্রসাব পায়খানার ব্যবস্থা যে কারনে প্রচন্ড কষ্ট করতে হচ্ছে তাদের। এছারাও ছিনতাই ও ছিচকে চোরের উৎপাত রয়েছে।

রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ মোড় এলাকায় কর্মরত পুলিশ সদস্য জানান, ঘাটের এই অবস্থা দেখে জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে মাইকিং করা হয়েছে। পন্যবাহি ট্রাকগুলোকে বিবল্প সড়ক হিসেবে সিরাজগঞ্জ সেতু ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। তারপরও ট্রাক চালকেরা ওই রুট ব্যবহার করতে রাজি না। তারা তেল খরচ বাচাণোর জন্য এখানেই বসে থাকবে।

বিআইডব্লিটিসি দৌলতদিয়া কার্যালয়ের ব্যবস্থাপক আবু আব্দুল্লাহ রনি জানান, প্রবল স্রোতে নদী ভাঙ্গন প্রাকৃতিক দুর্যোগ এখানে আসলে কিছুই করা নেই। আমাদের যে ফেরি সচল আছে সেগুলো দিয়ে পার করা সম্ভব নয়। কারন নদীতে স্রোতের তীব্রতা এতটাই ভয়ানক রুপ নিয়েছে সাথে আবার রয়েছে ভাঙ্গন। তারপরও আমরা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। ৪ ছোট ফেরি দিয়ে কিছু জরুরী যানবাহন ও যাত্রী পারাপার করছি। যার কারনে দুপারেই যানবানের দীর্ঘ সাড়ির সৃষ্টি হয়েছে।

পানি উন্নয়ন বোর্ড রাজবাড়ীর প্রকৌশলী মোঃ সফিকুল ইসলাম জানান, হঠাৎ পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় রাজবাড়ীর কয়েকটি পয়েন্টে নদী ভাঙ্গন শুরু হয়েছে। এরমধ্যে সবচেয়ে খারাপ অবস্থা দৌলতদিয়া ফেরি ঘাটের। আমরা জরুরী ভিত্তিতে বালুর বস্তা ফেলার কাজ করে যাচ্ছি। ঘাট সচল রাখতে আমরা সব ব্যবস্থা গ্রহন করবো।