মাদারীপুরে রাতে দরজা-জানালা বন্ধ করে সরকারি স্কুলে কোচিং বাণিজ্য

৫:৫০ অপরাহ্ণ | রবিবার, অক্টোবর ৬, ২০১৯ ঢাকা, দেশের খবর

মেহেদী হাসান সোহাগ, স্টাফ রিপোর্টার, মাদারীপুর: মাদারীপুরের সদর উপজেলার উত্তর ঝিকরহাটি পশ্বিম ঘটমাঝি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় সরকারি আদেশ অমান্য করে স্কুল কর্তৃপক্ষ ও প্রধান শিক্ষকের আদেশে রাতে বিশেষ ক্লাসের নামে চলছে রমরমা কোচিং বাণিজ্য।

শুধু বন্ধের দিন ছাড়া প্রতিদিন সকালে ১ ঘণ্টার একটি বিশেষ ক্লাস ও রাতে বাধ্যতামূলক করা হয়েছে ৪ ঘণ্টার বিশেষ ক্লাসের নামে কোচিং বাণিজ্য। সরকারি স্কুলের দরজা- জানালা বন্ধ করে সন্ধ্যা ৬টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত চলে এ কোচিং ক্লাস। উপজেলা সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তা বিষয়টি জেনেও এখনও পর্যন্ত কোনো ব্যবস্থা নেননি।

রাতে সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, ৩য় থেকে ৫ম শ্রেণীর পর্যন্ত ১৩৫ জন ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে প্রায় অর্ধশতাধিক ছাত্র-ছাত্রীদের নিয়ে সন্ধ্যা ৬টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত চলে এ কোচিং ক্লাস। রাতের কোচিং বাবদ প্রত্যেক ছাত্র-ছাত্রীর কাছ থেকে নেয়া হচ্ছে ৫০০ থেকে ৮০০ টাকা পর্যন্ত। আর সকালের বিশেষ ক্লাস নেয়া হয়। সেখানে ছাত্র-ছাত্রীদের ২টি বিষয়ের কোচিং করানো হয়। যার বাবদ নেয়া হয় ২০০-৪০০ টাকা। জানুয়ারি থেকে শুরু করে ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত চলে কোচিং বাণিজ্য। ৫ম শ্রেণীসহ ৩য় ও ৪র্থ শ্রেণীর মেধা তালিকায় প্রথম ও দ্বিতীয় ছাত্রকেও দেখা গেছে বিশেষ ক্লাসে।

তারা কেন বিশেষ ক্লাসে এসেছে জানতে চাইলে তারা তাদের শিক্ষকের দিকে তাকিয়ে বলে আমরা কয়েকটি বিষয়ে দুর্বল। তবে তারা আরও জানায়, পিএসসি পরীক্ষায় গোল্ডেন প্লাস পেতে চায়। টাকার বিষয় তাদের কাছে জানতে চাইলে বেশীরভাগ ছাত্ররা জানায় আমরা স্যারদের টাকা দেই না। তবে পরে অবশ্য অনেকেই স্বীকার করেন তারা টাকা দিয়ে রাতে পড়েন।

বিদ্যালয়ের বাইরে কয়েকজন অভিভাবককে সন্ধ্যা থেকে ঘোরাফেরা করতে দেখা যায়। তারা বলেন, আমরা কি করব স্কুল থেকে বাধ্যতামূলক করেছে তাই করাতে হয়। সেই সকালে আসে বিকালে একটু বাড়িতে গিয়ে খাওয়া-দাওয়া করেই আবার সন্ধ্যায় চলে আসে, আর ক্লাস হয় প্রায় রাত ১০টা পর্যন্ত। বাড়িতে পড়াশোনা করার কোনো সুযোগই পায় না ছেলেমেয়েরা। আর আমরাও সব সময় টেনশনে থাকি রাতে যদি কোনো বিপদ হয়ে যায়।

উত্তর ঝিকরহাটি পশ্বিম ঘটমাঝি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় সহকারী শিক্ষক মজিবর রহমান জানান, আমি রাতে ক্লাশ নিলে কি হবে আমি তাদের কাছ থেকে কোন টাকা নেই না। ওদের পড়াশুনা ভাল করার জন্য আমি রাতে কয়েকজনের ক্লাশ নিয়ে থাকি। এ বিষয়ে প্রধান শিক্ষিকার অনুমতি রয়েছে। রাতে মেয়েদের কোচিং করানো হচ্ছে তাদের কোনা বিপদ হলে এর দায়ভার কে নিবে? এ ব্যাপারে সহকারী শিক্ষক জানান, এর দায়ভার আমি নেব।

এ ব্যাপারে উত্তর ঝিকরহাটি পশ্বিম ঘটমাঝি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রধান শিক্ষিকা সাফিয়া আক্তার বলেন, আমরা উপজেলা শিক্ষা অফিসারের আন-অফিসিয়াল অনুমতিতেই এ ব্যবস্থা নিয়েছি। রাতে বাড়ি ফেরার পথে ছাত্রীদের কোনো সমস্যা হলে তার দায় কে নিবে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এটার দায় আমরা নেব না। এটার দায় তার পরিবার নিবে, তাদের অনুরোধে আমার এক শিক্ষককে দিয়ে রাতে পড়াই। আর এখানে শুধু ৫ম শ্রেণীর ছাত্র-ছাত্রীরা পড়ে, তারা যাতে পিএসি পরিক্ষায় ভাল করতে পারে।

সদর উপজেলা সহকারী প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা রুপা জানান, আমি বিষয়টি জানি না, ছাত্র-ছাত্রীদের ভাল করানোর জন্য মনে হচ্ছে বিষয়টি ভালো। স্কুল কর্তৃপক্ষকে বলেছি, যদি অভিভাবকরা চায় তাহলে করাতে পারে, তবে অবশ্যই স্কুলে না। তবে আমার কাছে এই বিষয় কোনো অভিভাবক অভিযোগ করেননি। তার কাছে ছাত্রীদের রাতে ক্লাসের জন্য যদি কোনো ক্ষতি হয় এর দায়ভার কে নিবে জানতে চাইলে তিনিও জানান, এটা কে নিবে?

মাদারীপুর জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. নাসির উদ্দিন জানান, আমি বিষয়টি জানতাম না এখন জানলাম, যদি এরকম হয় আমি উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে ব্যবস্থা নেব। আর রাতে ক্লাস নেয়ার কোনো নিয়ম নেই। বিশেষ ক্লাস নিতে হলে স্কুলের ক্লাস শুরু হওয়ার আগে অথবা তার পরে নেয়া যেতে পারে। যদি এরকম কেউ করে তাকে সাবধান করে দেয়া হবে।