রাজধানীতে বাড়ি ভাড়া নৈরাজ্যের শেষ কোথায়?

১:৩৬ অপরাহ্ণ | সোমবার, অক্টোবর ২৮, ২০১৯ ফিচার

রাজু আহমেদ, ষ্টাফ রিপোর্টার- বাড়িভাড়া নৈরাজ্যের কষাঘাতে নাকাল রাজধানীর ভাড়াটিয়া বাসিন্দাগণ। কথায় কথায় বাড়ির মালিকদের কর্তৃক ভাড়াটিয়াদের বাড়ি ছেড়ে দেয়ার হুমকির মতো অনৈতিক আচরণ থেকে পরিত্রাণ চায় নগরবাসী।

রাজধানীতে বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইনের খসড়া নিয়ে ফের টানা হেছড়ার অভিযোগ উঠেছে। ভোক্তা অধিদপ্তর অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে ভোক্তা অধিকার আইন-২০০৯ সংশোধন করে ভোক্তা অধিকার আইন-২০১৮ নামে একটি খসড়া তৈরি করলেও এ খসড়াটি এখনও মন্ত্রিপরিষদের হিমঘরেই পড়ে আছে।

প্রত্যেক বছর জানুয়ারি মাস আসলেই কোনো কারণ ছাড়াই বাড়িভাড়া বাড়িয়ে দেয় বাড়ির মালিকরা। অসহায় ভাড়াটিয়ারা সবকিছু সহ্য করে তা মেনে নিতে বাধ্য হন। বিশেষ করে জেলা শহরের তুলনায় রাজধানীতে বাড়িভাড়া বৃদ্ধির নৈরাজ্য বিরাজমান।

নতুন বছর আসতে আর দুই মাস বাকী। আসন্ন ২০২০ সালকে নানান আয়োজনে উদযাপন করলেও যারা শহর এলাকায় ভাড়াবাসায় থাকেন তাদের কাছে এ আনন্দটা যেনো ফিকে হওয়ার মতো।

সুত্রমতে, বেশির ভাগ নগরবাসীই চাকরির সুবাদে এবং সন্তানের লেখাপড়ার সুবিধার্থে বাধ্য হয়ে বছরের পর বছর থাকছেন ভাড়া বাসায়। আর এ সুযোগে বাড়ির মালিকরা হাতিয়ে নিচ্ছেন বাড়তি সুবিধা। বছর ঘুরলেই বাড়িভাড়া বৃদ্ধির পাঁয়তারা করেন বাড়ির মালিকরা। কখনো কখনো বছরের মাঝামাঝিতেও বাড়িভাড়া বাড়ে বলে অনেকের অভিযোগ। বিশেষ করে ঢাকা সিটির নামকরা স্কুল-কলেজের আশপাশের এলাকায় বাড়িভাড়া অনেক বেশি।

একদিকে সরকারের বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রণে আইন থাকলেও আদৌ এর বাস্তবায়ন নেই বলে আক্ষেপ ও অভিযোগ করছেন সাধারণ আপামর জনতা ?

অপরদিকে বাড়িভাড়া বৃদ্ধির কথা জানিয়ে বাড়ির মালিকরা বলছেন, বর্তমানে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, রক্ষণাবেক্ষণ খরচ বৃদ্ধি, গৃহ ঋণের ঝামেলার কারণে ভাড়া বৃদ্ধি না করলে আমাদের জীবন-যাপন খুব কঠিন হয়ে পড়ে। রাজধানীর মিরপুর, শ্যামলী, গ্রিনরোড, কলাবাগান, ধানমন্ডি, বাংলামোটর, সেগুনবাগিচা, ফার্মগেট, মগবাজার, মালিবাগ, গুলশান, বনানী, উত্তরা, আগারগাঁও,বনানীসহ বিভিন্ন এলাকার বাড়িভাড়া হুরহুর বেড়েই চলছে।

মিরপুর ক্যান্টনমেন্ট এলাকার শোভন নামে একজন ভাড়াটিয়া আক্ষেপের সুরে সময়ের কণ্ঠস্বরকে বলেন, আগে প্রায় প্রতি বছরই এক হাজার টাকা করে ভাড়া বাড়তো। আবার কোনো বছর দুই হাজার টাকাও বেড়েছে। ছেলে-মেয়ের পড়াশোনা ও সংসারের ঝামেলার কারণে একই জায়গায় বাস করতে হয়। ফের আসছে জানুয়ারী মাসে বাড়িভাড়া বাড়ানোর বিষয়ে ইতোমধ্যে বাড়িওয়ালার পক্ষ থেকে আভাস পেয়েছেন বলে জানান তিবি।

তিনি বলেন, বছর বছর দ্রব্যমূল্যের দাম না বাড়লেও বাড়িভাড়া ঠিকই বাড়ছে। সংসার খরচ, ছেলে-মেয়েদের লেখাপড়ার খরচ, এর সঙ্গে বাড়িভাড়ার বাড়তি খরচ মিলিয়ে ঢাকা শহরে বসবাস করা অনেক কঠিন হয়ে পড়েছে। শোভন বলেন, বাড়িভাড়ার আইনটা যদি সঠিকভাবে প্রয়োগ হতো তাহলে আমাদের সমস্যা হতো না।

বাড়িভাড়ায় নৈরাজ্যের কারণ হিসেবে নগর পরিকল্পনাবিদরা বলছেন, সবাই রাজধানীমুখী হওয়ার কারণে ঢাকায় বাড়ির চাহিদা বেশি। বিশেষ করে চাকরি, পড়াশোনাসহ বিভিন্ন কারণে মানুষ সবচেয়ে বেশি আসে রাজধানীতে। ফলে বাড়িভাড়ার নোটিশ ঝুলানোর সঙ্গে সঙ্গেই বাড়িভাড়া হয়ে যাচ্ছে। এতে করে বাড়ির মালিকদের সঙ্গে ভাড়া নিয়ে তেমন কোনো দর কষাকষি করা যায় না। তারা এও বলছেন, যার যার স্থান নিজ জেলা বা বিভাগে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা থাকলে শুধু ঢাকার ওপর এ বিশাল চাপ হতো না।

ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণবিষয়ক সংগঠন কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সর্বশেষ সমীক্ষায় দেখা যায়, ২৫ বছরে রাজধানীতে বাড়িভাড়া বেড়েছে প্রায় ৪০০ শতাংশ। অথচ একই সময়ে নিত্যপণ্যের দাম বেড়েছে মাত্র ২০০ শতাংশ। অর্থাৎ নিত্যপণ্যের দামের তুলনায় বাড়িভাড়া বৃদ্ধির হার প্রায় দ্বিগুণ। রাজধানীতে ১৯৯০ সালে পাকা ভবনে দুই কক্ষের একটি বাসার ভাড়া ছিল দুই হাজার ৯৪২ টাকা।

২০১৫ সালে সেই ভাড়া দাঁড়িয়েছে ১৮ হাজার ১৫০ টাকা। আর গত বছর এই ভাড়া এসে ঠেকেছে ২১ হাজার ৩৪০ টাকায়। সমীক্ষায় আরও বলা হয়, ২০০৬ সাল থেকে ১০ বছরে ভাড়া বেড়েছে সবচেয়ে বেশি। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুসারে ২০০০-২০১০ সাল পর্যন্ত দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে বাংলাদেশে নগরায়ণের গতি ছিলো বেশি। এছাড়া ২০১০ সালে ৪৫ দশমিক ৭ শতাংশ লোক শহরে বসবাস করে। বাড়িভাড়া বাড়ার আরও একটি কারণ হচ্ছে- লোকজন নানা কারণে ঢাকামুখী। আবার নতুন ফ্ল্যাটে গ্যাস বা বিদ্যুৎ নেই। ফলে পুরনো বাড়িগুলোতেই ওঠে মানুষ। অথচ ঢাকায় হাজার হাজার ফ্ল্যাট ফাঁকা পড়ে আছে।

বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রণ-সম্পর্কিত অধ্যাদেশটি প্রথম জারি করা হয় ১৯৬৩ সালে। বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইন, ১৯৯১ কার্যকর করতে ২০১০ সালে মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশ (এইচআরপিবি) জনস্বার্থে হাইকোর্টে রিট আবেদন করেছিল। আইনটি বাস্তবায়নে সুনির্দিষ্টভাবে কোনো মন্ত্রণালয়কে দায়িত্ব দেওয়া হয়নি। আদালতের মাধ্যমে ভাড়াসংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তির কথা আইনে বলা আছে। এইচআরপিবির রিট আবেদনটির পরিপ্রেক্ষিতে রুল ও চূড়ান্ত শুনানি শেষে ২০১৫ সালের ১ জুলাই আদালত রায় দেন।

রায়ে বলা হয়, বিদ্যমান আইনটি কার্যকর না হওয়ায় ভাড়াটেকে সুরক্ষা দেওয়া যাচ্ছে না। আইনটি কার্যকরে রাষ্ট্রকে যথাযথ উদ্যোগ নিতে হবে; অন্যথায় সাধারণ মানুষ এ থেকে পরিত্রাণ পাবে না। রায়ে সারাদেশে এলাকাভেদে সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন বাড়িভাড়া নির্ধারণের জন্য সরকারকে একটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন কমিশন গঠনের নির্দেশ দেন হাইকোর্ট। রায় ঘোষণার ছয় মাসের মধ্যে কমিশন গঠন করতে মন্ত্রিপরিষদ সচিবকে নির্দেশ দিয়েছিলেন আদালত।

কিন্তু রায় ঘোষণার পাঁচ বছর পেরোলেও বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রণ কমিশন গঠিত হয়নি। গতবছর ভোক্তা অধিকার আইন-২০০৯ সংশোধন করে ভোক্তা অধিকার আইন-২০১৮ নামে একটি খসড়া তৈরি করেছে অধিদপ্তর। এটা চূড়ান্ত করতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে পাঠায় অধিদপ্তর। কিন্তু সেটিও কার্যকর না হওয়ায় তেমন কোনো উপকারে আসছে না।

বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইনের খসড়ার সর্বশেষ অবস্থান সম্পর্কে বাণিজ্য বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের প্রশাসন-৫ এর একজন উর্ধতন প্রশাসনিক কর্মকর্তা গণমাধ্যমকে বলেন, বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইনের খসড়াটি গত বছর আমরা হাতে পেলেও বর্তমানে খসড়াটি মন্ত্রী পরিষদে সংশোধনের জন্য আছে। এ আইন ২০১৯ হিসেবে গন্য হবে। তবে এ আইন চূড়ান্ত হতে এখনো অনেক সময় লাগতে পারে।

এ বিষয়ে কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে, বাড়িভাড়া নিয়ে হাইকোর্টের একটা নির্দেশনা থাকলেও যে আইনটা আছে এটা ভাড়াটে বান্ধব না। বাড়িভাড়া যেনো বাস্তবসম্মত হয় সে রকম একটা পদক্ষেপ নেয়া এখন যুক্তিযুক্ত। ভাড়াটিয়া যাতে উদ্বুদ্ধ সমস্যার প্ররতিকার পান সেই লক্ষে একটি যথোপযুক্ত আইন পাশ করতে হবে যাতে করে বাড়িভাড়া বেশি নিলে তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া যায়। স্বাভাবিক জীবন-যাপন করতে অনেক কষ্ট হয়ে যায়। আবার অনেক ভাড়াটিয়া আছে যারা অতিরিক্ত ভাড়ার কারণে বেশিরভাগ সময়ই সাবলেট দিয়ে বাসা ভাড়া নিয়ে থাকেন।

তবে বাস্তব চিত্রটা ভিন্ন, কেউই আইন মানছে না, আইনের সঠিক দিকনির্দেশনাও নাই। আইনটা মৃত্যুবরণ করেছে। এটার কেউ সমাধানও করছে না। সিটি কর্পোরেশন তো আইন করে বসে আছে। তাদের অবস্থানেও একইভাবে গলার ভেতর কাঁটা বিঁধে আছে। এ বিষয়টা নিয়ে দুই সিটি কর্পোরেশনের মেয়র মহোদয়কে এক সঙ্গে আলোচনায় বসা উচিত বলেও দাবি করছেন অনেকে।

এদিকে রাজধানীর সাধারণ জনগণের দাবি-বাড়িভাড়া নিয়ে যে নৈরাজ্য চলছে তা নিরসনে সরকারকে আরো আন্তরিক হতে হবে। কথায় কথায় বাড়ির মালিকরা বাড়ি ছেড়ে দেয়ার যে অনৈতিক হুমকি দেন সেটি থেকেও পরিত্রাণ চায় নগরবাসী।

Loading...