বাউফলে মাল্টা চাষের উজ্জল সম্ভাবনা

১২:৩৮ অপরাহ্ণ | শুক্রবার, নভেম্বর ১, ২০১৯ বরিশাল
BAUPHAL MALTA NEWS

কৃষ্ণ কর্মকার. বাউফল(পটুয়াখালী)প্রতিনিধি: বাতাসে টক-মিষ্টির গন্ধ। সবুজ পাতার ফাঁকে ফাঁকে উকি দিচ্ছে মাল্টা। নুয়ে পড়েছে ডালপালা। এ দৃশ্য পটুয়াখালীর বাউফলে ধুলিয়া গ্রামে মিজান গার্ডেনের। সেখানের গাছে গাছে মাল্টার ছড়াছড়ি দেখে বিমোহিত হবেন যে কেউ। কৃষি কর্মকর্তাসহ পাশের বিভিন্ন গ্রামের লোকজন প্রতিদিনই ভিড় জমাচ্ছেন সেখানে। বাগানের তিন বছর বয়সী গাছে থোকায় থোকায় মাল্টা ধরায় উপকুলীয় এ অঞ্চলে মাল্টা কিংবা কমলালেবুর মতো বিদেশি এই ফল চাষের উজ্জ্বল সম্ভাবনা দেখছেন বিশেষজ্ঞ ও চাষিরা। মাটির গুনাগুন বিবেচনায় বৃহত্তর সিলেট, চট্রগ্রাম, পার্বত্য চট্রগ্রাম ও পঞ্চগড় জেলায় চাষ উপযোগি হলেও উপকুলীয় এসব অঞ্চলে মাল্টা ও কমলালেবুর মতো বিদেশি ফলের ভাল ফলন পাওয়া যাবে না অমুলক প্রমান হতে চলেছে এ ধারণা।

জানা গেছে, বছর তিনেক আগে প্রায় ৮ একর জমির ওপর গড়া নিজের সখের বাগান বাড়ি ‘মিজান গার্ডেনে’ পার্সিমন, রাম্বুটান, ড্রাগন, প্যাশন, জাম্বুরা, পেঁপে, পেয়ারা, কমলার মতো নানা জাতের দেশি বিদেশি ফলের গাছ রোপন করেন ঢাকার নিউমার্কেট এলাকার ব্যাবসায়ি (মিজান জুয়েলার্সের মালিক) স্থানীয় মিজানুর রহমান টিটু। রোপন করেন বরিশালের স্বরুপকাঠীর একটি নার্সারী থেকে এনে শতাধিক মাল্টা চারা। মাঝে মধ্যে অবসরে গ্রামের ওই বাগান বাড়িতে তিনি অবস্থান করলেও তার নিকট আত্মীয় ধুলিয়া কলেজিয়েট স্কুল সংলগ্ন সরকারি প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষক আরিফুর রহমান ৪-৫ জন কর্মচারি নিয়ে নিয়মিত পরিচর্যা ও দেখভাল করেন ওই বাগানবাড়ি ও ফল বাগান। কেঁচো কম্পোস্ট, ভার্মিকম্পোস্ট, খৈর, গোবর, জৈবসার আর প্রাকৃতিকভাবে পরিচর্যায় বেড়ে ওঠা বাগানের ওই সব গাছে এখন থোকায় থোকায় ঝুঁলছে মাল্টা আর কমলালেবু। ফলের ভারে পুরো বাগানের গাছগুলো যেন নুয়ে পড়েছে।

বাগান সৃজন ও পরিচর্যার দায়িত্বে থাকা তুষার ইমরান জানান, মাটিতে গোয়ালঘরের গোবর মিশিয়ে রোপন করা হয় নাগপুরী, বারি-১, চায়না, এলাচি, বেড়াকাটা জাতের কমলা ও পাকিস্থানী, ইন্ডিয়ান বারি জাতের শতাধিক মাল্টা চারা। রাসয়নিক সার ওষুধ ছাড়াই জৈবসার আর প্রাকৃতিক উপায়ে পরিচর্যা ও নিয়মিত পানি দেওয়ায় ফল আসে গাছগুলোতে। গাছ গাছে এখন ছবির মতো ঝুঁলে আছে পাকা-আধাপাকা মাল্টা। প্রতিটি গাছে ঝুঁলে আছে অন্তত এক মন করে মাল্টা। বিক্রির প্রয়োজন না থাকায় পরিবারের চাহিদা মিটিয়ে আত্মীয়-স্বজনসহ প্রতিবেশি ও স্থানীয় দুস্থ লোকজনের মাঝে এসব মাল্টা বিলিয়ে দিতে পারবেন তারা। গাছে গাছে মাল্টা ঝুঁলে থাকার দৃশ্য দেখে স্থানীয়দের অনেকেই অভিভুত হচ্ছেন। চারা গাছ কিংবা মাল্টার কলম সংগ্রহ করতে চাচ্ছেন অনেকেই।

দেখভালের দায়িত্বে থাকা শিক্ষক আরিফুর রহামান জানান, জলপাই, জাম্বুরা, থাই জাম্বুরা, কামরাঙা, বেরাকাটা লেবু, বেরাকাটা পেয়ারা, পার্সিমন, রাম্বুটান, খাটো জাতের থাই নারিকেলসহ নানা জাতের দেশি-বিদেশি ফল গাছ রয়েছে তাদের ওই বাগান বাড়িতে। রয়েছে রেডলেডি জাতের পেঁপে, লাউসহ সবজির বাগানও। নানা জাতের গোলাপ, রজনীগন্ধা, কামিনী, জবা, জিনিয়া, আলমন্ডা, প্যারাডাইস, মাধবীলতা, গোল্ডেন শাওয়ার, মেফ্লোয়ার, লিলি, সজনেসহ দেশি-বিদেশি শোভাবর্ধক ও ভেষজ গাছও রয়েছে বাগানে। বাগানে আরো আছে মহাছনক, পালমার, সূর্য্যডিম, মিসস্পেশাল, পুনাই, পুনাই লাল, ম্যাট্রাস, ম্যাট্রাস তোঁতা, হাঁড়িভাঙা, চিনের কিউজাইসহ নানা জাতের আম গাছ। দেশি-বিদেশি ফুল-ফলের সমারোহে মিজান গার্ডেন নামে ওই বাগান বাড়ি সেজেছে যেন স্বপ্নের মতো। তিনি বলেন, ‘বিক্রির প্রয়োজন না থাকায় পুষ্টির বিষয়টি মাথায় রেখে বাগানের উৎপাদিত মাল্টা নিজেদের চাহিদা মিটিয়ে স্থানীয় শিক্ষার্থীসহ দু:স্থ কিংবা অসহায় দরিদ্র পরিবারের লোকজনের মাঝে বিলিয়ে দেওয়া হবে। ফরমালিন কিংবা বিষাক্ত কার্বাইডের ভয়ে মানুষ যখন বাজারের ফলমুল কেনায় মুখফিরিয়ে নিচ্ছে তখন, আমাদের গার্ডেনে উৎপন্ন সার-ওষুধ, হরমোন ও ফরমালিনমুক্ত ফল এবং বিভিন্ন গাছের চারা ও কলম শিশু কিংবা অভাবী পরিবারের লোকজনের মাঝে বিনামূল্যে বিতরণ করা হবে।’

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, অনেকে বাড়ির আঙিনায় আম, পেয়ারা, কাঠাল, কামরাঙাসহ বিভিন্ন জাতের ফল গাছ রোপণ করে শখমিটিয়ে থাকলেও ভাল ফলন পাওয়া যাবে না এই ভেবে কয়েক বছর আগেও ফল গাছের বানিজ্যিক আবাদে হাত বাড়ায় নি কেউ। কিন্তু উপকুলীয় বাউফলে সেই চিন্তাচেতনা এখন অমুলক প্রমান হচ্ছে। ধানদী গ্রামের বশির মাষ্টারের বাগান বাড়ি, হারুন মৃধা, শাহনুর বেগম, রহিম মৃধা, মন্নান মাস্টার, রামনগর গ্রামের আউয়াল মাস্টার, জাকির মৃধা, কালাইয়া বন্দরের এএসএম ফিরোজ (জাপানী ফিরোজ), হেনরি, মাইনুল ইসলাম, যৌতা গ্রামের বাবুল উকিল, নওমালা গ্রামের আবু তাহের মিয়া, শহিদুর রহমান তালুকদার, মদনপুরা গ্রামের নজরুল মাস্টার বাড়ির মসজিদ সংলগ্ন বাগান, বিলবিলাস গ্রামের আবুল কালাম (ইমাম), কাগুজিরপুলের উত্তম গাঙ্গুলী, পৌর সদরের সাংবাদিক এমরান হাসান সোহেল, ভরিপাশা গ্রামের জাহানারা ও তানিয়া বেগম, ফিরোজ হাওলাদার, রহমান হাওলাদার, হেলাল হাওলাদার, নাজিরপুরের আলমগীর মিয়া, দাশপাড়ার রিপন, মেহেন্দিপুর গ্রামের আবু পন্ডিত বাড়িসহ উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় মাল্টা ও কমলালেবুসহ নানা প্রজাতির দেশি-বিদেশি ফলের চাষ হচ্ছে। এরই মধ্যে শৌলা গ্রামের নুরজাহান গার্ডেন ও কর্পূরকাঠি গ্রামের স্বপ্নচূড়া থিম পার্কে সারি সারি গাছে ঝুলছে নাগপুরী, বারি কমলা-১, চায়না, এলাচি, বেড়াকাটাহ বিভিন্ন জাতের কমলালেবু ও মাল্টা। ক্রমাগত আবহাওয়ার পরিবর্তণ এবং রাসয়নিক সার ও বিষমুক্ত ফলের আশায় এখন অনেকেই ঘরের আঙিনায়, পরিত্যক্ত ভিটে-বাড়িসহ বানিজ্যিকভাবে বিভিন্ন ধরণের ফলদ গাছের চাষে ঝুঁকছেন। পৌর সদরের বাসাবাড়িতে কেউ কেউ আবার টবে ড্রাগন, মাল্টা, কমলাসহ বিভিন্ন ফল গাছ লাগিয়েছেন। গড়ে তুলছেন ছাদ বাগান।

স্থানীয় পরিবেশ বিষয়ক সংগঠন সেভ দ্যা বার্ড অ্যান্ড বি’র পরিচালনা পরিষদের একজন শামসুন নাহার বলেন, ‘জলবায়ু পরিবর্তণ আর গাছপালা-বনজঙ্গল কেটে বিনস্ট করায় দেশি প্রজাতির বিভিন্ন ফল গাছ বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। পড়ছে বিরুপ প্রভাব। ভুটান, ব্রাজিল, ভারত, পাকিস্তান, অমেরিকা, চীন, অস্টেলিয়ায় অধিক পরিমানে মাল্টা ও কমলা উৎপাদন হয়। সমতলে ৬০ সেন্টিমিটার বর্গাকার বা আয়তাকার গর্ত করে ৪-৫ মিটার দূরত্বে বৈশাখ মাসে চারা বা কলম লাগাতে হয়। মাদা তৈরীর করে প্রতি গর্তের মাটির সঙ্গে ১৫ কেজি পচা গোবর, ২৫০ গ্রাম টিএসপি, সমপরিমান এমওপি ও চুন, ৩-৫ কেজি ছাই মিশিয়ে ভরাট করে ১০-১৫ দিন পরে চারা বা কলম লাগাতে হয়। এরপর হালাকা সেচ দিতে হয়। আগাছা দমনসহ বর্ষকালে গাছের গোড়ায় যাতে পানি না জমে সে দিকে লক্ষ্য রাখতে হয়। চারা অবস্থায় মাল্টা ও কমলালেবু গাছের গোড়া থেকে গজানো অতিরিক্ত কুশি বা মাথা এবং মরা ও রোগাক্রান্ত ডাল মাঝে মাঝে ছেটে রাখতে হয়। তিনি আরো জানান, মাল্টা সর্দিজ্বর ও বমি নিবারক হিসেবে ভাল কাজ করে। মাল্টা কিংবা কমলার শুকনো ছাল অম্ল ও শারিরীক দূর্বলতা নিরসনে কাজ করে। মাল্টা ও কমলার জ্যাম, জেলি ও জুসের চাহিদা আছে।’

কালিশুরী ডিগ্রি কলেজের জীব বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক তাসলিমা বেগম বলেন, ‘সিলেট, চট্রগ্রাম, পার্বত্য চট্রগ্রাম ও পঞ্চগড় জেলাসহ বিদেশের মাটিতেই কেবল ভাল কমলা কিংবা মাল্টা ফলে এমন ধারণা পাল্টে যাচ্ছে। বীজ থেকে সরাসরি চারা তৈরী করা যায়। ভাল জাতের মাল্টা বা কমলালেবুর চোখ কলম, পার্শ্বকলম ও ১০-১২ মাস বয়সের চারা বাডিং ও গ্রাফটিংয়ের জন্য আদিজোড় হিসেবে ব্যাবহার করা ভালো। সোজা ও ভাল বৃদ্ধি সম্পন্ন তরতাজা চারা অথবা কলম বেছে নিয়ে রোপন করা উচিত। দেশি প্রজাতির বিলুপ্তপ্রায় ফল গাছের পাশাপাশি মিজান গার্ডেনে মাল্টার মতো পুষ্টিমান সম্পন্ন পরিবেশ বান্ধব ফল গাছের পরিকল্পিত বনায়ন করা জরুরি।’

সদ্য-সাবেক উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা (বর্তমান মির্জাগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা) আরাফাত হোসাইন বলেন, ‘মাল্টা ভিটামিন সি সমৃদ্ধ ও জনপ্রিয় ফল। উপকুলীর বাউফলের বিভিন্ন এলাকায়ও এখন কমবেশি মাল্টা ও কমলার চাষ হচ্ছে। মিজান গার্ডেনে মাল্টার নয়নাভিরাম দৃশ্য দেখে অভিভূত হবেন যে কেউ। পুষ্টির চাহিদা পূরণে অন্য পেশার পাশাপাশি শিক্ষিত লোকজনের এ ধরণের ফল চাষে এগিয়ে আসা উচিত।’

Loading...