দিনাজপুরে রাষ্ট্রীয় মর্যাদা না নিয়ে সমাধিত হওয়া সেই মুক্তিযোদ্ধার চিঠি নিয়ে বিতর্ক

৪:৪১ অপরাহ্ণ | বৃহস্পতিবার, নভেম্বর ৭, ২০১৯ আলোচিত বাংলাদেশ

স্টাফ রিপোর্টার, দিনাজপুর থেকে- রাষ্ট্রীয় মর্যাদা না নিয়ে সমাধিত হওয়া সেই আলোচিত মুক্তিযোদ্ধার চিঠিটি তার নিজের লেখা নয়, বলে দাবি করে সংবাদ সম্মেলন করেছে মুক্তিযোদ্ধা ইসমাইল হোসেনের ৩য় স্ত্রী মর্জিনা বেগমসহ পরিবারের সদস্যরা।

অন্যদিকে দু’দিন পর পাল্টা সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে মুক্তিযোদ্ধা ইসমাইল হোসেনের প্রথম ও দ্বিতীয় স্ত্রী’র সন্তানেরা বলেছেন, ৩য় মা মর্জিনা বেগমের বক্তব্য মিথ্যা ও বানোয়াট। ষড়যন্ত্রের বহিঃপ্রকাশ।

এদিকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদা না নিয়ে সমাধিত হওয়া সেই আলোচিত মুক্তিযোদ্ধার ৩য় স্ত্রী মর্জিনা বেগমের আর্তি’র বিষয়টি রংপুর বিভাগীয় কমিশনার কে.এম.তারিকুল ইসলাম পর্যবেক্ষনে রেখেছেন বলে জানিয়েছেন। সেই আলোচিত মুক্তিযোদ্ধার ঘটনার তদন্তে এসিল্যান্ড আরিফুল ইসলাম এবং সহকারী কমিশনার মহসেন উদ্দিনকে প্রত্যাহার করা হয়েছে বলেও তিনি জানান। বিষয়টি খুবই স্পর্শকাতর বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

দিনাজপুরের বোচাগঞ্জ উপজেলা পরিষদের ডাক বাংলোতে সোমবার দুপুরে সংবাদ সম্মেলন করে ২৫ বছর সংসার জীবনের কথা তুলে ধরে নিজের সংসার ও জীবনের করুণ পরিনতির কথা সাংবাদিকদের কাছে তুলে ধরেন মর্জিনা বেগম।

দিনাজপুরের আলোচিত প্রয়াত মুক্তিযোদ্ধা ইসমাইল হোসেন মৃত্যুর আগে রাষ্ট্রীয় সম্মাননা না নেওয়া বিষয়ে যে চিঠি লিখেছিলেন বলে খবর প্রকাশিত হয়েছিল তা তার লেখা নয়। ইসমাইল হোসেনের তৃতীয় স্ত্রী মোছা. মর্জিনা বেগম সংবাদ সম্মেলনে এমন দাবিই করেন।

প্রয়াত মুক্তিযোদ্ধা ইসমাইল হোসেনের তৃতীয় স্ত্রী মর্জিনা বেগমের পক্ষে তার ছেলে দশম শ্রেণির ছাত্র মো. মুছাদ্দেক হোসেন লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন।

লিখিত বক্তব্যে মর্জিনা বেগম জানান, আমি মরহুম বীর মুক্তিযোদ্ধা ইসমাইল হোসেনের দ্বিতীয় স্ত্রী মর্জিনা বেগম। আমার দুই সন্তানসহ আজ আপনাদের কাছে আমার দুঃখ ও লাঞ্ছনা এবং আমার স্বামী বীর মুক্তিযোদ্ধার রাষ্ট্রীয় সম্মান থেকে বঞ্চিত করার বিষয়ে প্রকৃত সত্য ঘটনা প্রকাশ করলাম।

মর্জিনা বেগম লিখিত বক্তব্যে জানান, আমাদের বিয়ে হওয়ার পর ২৫ বছর ধরে আমরা দিনাজপুরের বোচাগঞ্জ উপজেলার সেতাবগঞ্জ বাজারে বসবাস করে আসছি। আমার স্বামীও বোচাগঞ্জের বৈধ ভোটার। তিনি সুস্থ থাকা অবস্থায় একটি বিমা কোম্পানিতে চাকরি করতেন। সেই চাকরির টাকা ও মুক্তিযোদ্ধা ভাতা দিয়েই আমাদের সংসার চলত। কিন্তু আমার স্বামী অসুস্থ হওয়ার পর সেই চাকরিও চলে যায় এবং সামান্য মুক্তিযোদ্ধার ভাতা দিয়েই আমাদের সংসার কোনো রকম করে চলত। মুক্তিযোদ্ধার ভাতা বৃদ্ধির আগে আমি অন্যের বাড়িতে ঝিয়ের কাজ করে সংসার চালিয়েছি। এ জন্য আমার স্বামী-সন্তান নিয়ে অনেক কষ্টে দিনাতিপাত করতাম।

তিনি বলেন, আমার স্বামীর মৃত্যুর পর জেনে অবাক হয়েছি যে, আমার স্বামী নাকি একটি চিঠি লিখে গেছেন। যেখানে বলে গেছেন, আমার মৃত্যুর পর আমাকে যেন রাষ্ট্রীয় সম্মাননা দেওয়া না হয়! মৃত্যুর পর আমার স্বামীর প্রথম স্ত্রীর ছেলেরা হাসপাতালে এসে আমার স্বামীর মৃতদেহ তাদের গ্রামের বাড়িতে নিয়ে যায়। সঙ্গে থাকা মুক্তিযোদ্ধার সব কাগজপত্র, ব্যাংকের চেক বইসহ যাবতীয় কাগজ তারা নিয়ে যায়। আমি এবং আমার দুই সন্তানকে নিয়ে যখন আমার স্বামীর গ্রামের বাড়ি যাই তখন সবাই বলাবলি করলে আমি জানতে পারি যে, আমার স্বামী নাকি এই বিষয়ে চিঠি লিখে গেছেন। অথচ আমার স্বামী আমার সন্তানদের গর্ব করে বলতেন, আমার মৃত্যুর পর আমার জানাজার আগে আমাকে পুলিশ বাহিনীর সদস্যরা সম্মান জানাবে এবং আমার কফিনের ওপর বাংলাদেশের পতাকা দেওয়া হবে।

লিখিত বক্তব্যে মর্জিনা বেগম বলেন, যে ব্যক্তি প্রতিনিয়তই এমন কথা বলত সেই ব্যক্তি মৃত্যুর পর সম্মাননা গ্রহণ করবেন না এটা আমার বিশ্বাস হয় না। এটা একটা ষড়যন্ত্র হতে পারে উল্লেখ করে বলেন, জীবনের শেষ মুহূর্তে এসে তিনি এমন সিদ্ধান্তের কথা আমাকে জানাবেন না এটা মানতে পারছি না। আমার স্বামীর প্রথম স্ত্রীর সন্তানের চাকরি কেড়ে নেওয়ার বিষয়ে তিনি এমন কঠিন সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে অবশ্যই আমাকে জানাতেন। কিন্তু আমার অসুস্থ স্বামী এরূপ কোনো কথা আমাকে বলেননি।

মুক্তিযোদ্ধার স্ত্রী মর্জিনা বেগম অভিযোগ করে বলেন, আমার স্বামীর প্রথম স্ত্রীর সঙ্গে এবং তার ছেলেদের সঙ্গে দীর্ঘদিন কোনো যোগাযোগ ছিল না। প্রথম স্ত্রীর সন্তান চাকরি হারিয়েছে মর্মে আমাদের নিকট কোনোদিনই কোনো কথাও বলেনি, দুঃখও প্রকাশ করেনি। প্রথম স্ত্রীর সন্তানরা তার বাবার খোঁজ-খবর নিতেও কোনো দিন সেতাবগঞ্জ আসেননি। আমার স্বামী হাঁপানির রোগী ছিল। প্রায় অসুস্থ হয়ে পড়তেন, কিন্তু এই অসুস্থ পিতার কোনো সংবাদ কোন ছেলেই নেননি।

তিনি বলেন, আমার স্বামী গত ২১ অক্টোবর অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে প্রথমে আমি বোচাগঞ্চ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যাই। সেখানকার চিকিৎসক আমার স্বামীকে দিনাজপুর এম আব্দুর রহিম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যেতে বলেন। আমি অ্যাম্বুলেন্সে করে আমার স্বামীকে দিনাজপুর এম আব্দুর রহিম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাই। হাসপাতালে আমি এবং আমার দুই সন্তান সর্বদাই আমার স্বামীর নিকট ছিলাম। এই সময় প্রথম পক্ষের কেউ তার সেবা-যতœ করেনি। অথচ মৃত্যুর পর আমার সঙ্গে কোনো কথা না বলেই তারা গ্রামের বাড়ি নিয়ে আমার স্বামীকে মুক্তিযোদ্ধার প্রাপ্য সম্মান থেকে বঞ্চিত করে লাশ দাফন করেন।

মর্জিনা বেগম বলেন, যেদিন আমার স্বামীর কুলখানি হয় সেদিন আমাদের যেতে বলে এবং সেদিনই স্থানীয় এমপি, বিভাগীয় কমিশনার, দিনাজপুর জেলা প্রশাসকসহ অনেক গণ্যমান্য ব্যক্তি সেখানে উপস্থিত হন। কিন্তু প্রথম পক্ষের ছেলেরা আমাকে এবং আমার দুই সন্তানকে ঘরে বন্দী করে রাখে যাতে আমরা কারও সামনে গিয়ে কথা বলতে না পারি।

মর্জিনা বেগম চোখের পানি ঝরাতে ঝরাতে বলেন, আমার স্বামীর মৃত্যুর আগে যাদের কোনো খবরই ছিল না তারাই আমার স্বামীর মৃত্যুর পর আমার স্বামীর মালিক হলো! আমার স্বামীকে দীর্ঘদিন ধরে সেবা-যতœ করে আসছিলাম অথচ তার মৃত্যুর পর কোথায় জানাজা হবে, কোথায় কবর হবে, কখন কুলখানি হবে এসবের কোনো কিছুই আমাকে জানানো হলো না।

মর্জিনা বেগম দাবি করেন, প্রকাশিত চিঠি আমার স্বামীর লেখা নয়! হাসপাতালে যে শারীরিক অসুস্থতা নিয়ে তিনি জীবন-মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করছিলেন, সেখানে এত কথা বলার মতো বা লেখার মতো অবস্থা আমার স্বামীর কোনোভাবেই ছিল না। যে চিঠি নিয়ে বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় এত হইচই হচ্ছে সেই চিঠিটি আমার স্বামীর লেখা নয়। এটা কেউ অসৎ উদ্দেশ্যে নিজ স্বার্থ হাসিল করার জন্য এমনটা করেছেন।

মর্জিনা বেগম স্বামীর রাষ্ট্রীয় মর্যাদা থেকে বঞ্চিত করার বিষয়ে বলেন, আমার স্বামীকে যারা রাষ্ট্রীয় সম্মাননা থেকে বঞ্চিত করাল তাদের বিরুদ্ধে তদন্ত করে বিচার দাবি করছি। আমার স্বামীকে নিয়ে মিছিল-মিটিং হচ্ছে অথচ আমি স্বামীহারা হয়ে অনাহারে-অর্ধাহারে আছি আমার খোঁজও কেউ করেনি। আমার স্বামীর রাষ্ট্রীয় সম্মাননা যারা দিতে দিল না এবং আমার স্বামীকে চিকিৎসাসেবা হতে বঞ্চিত করল তাদের তদন্ত সাপেক্ষে বিচার দাবি করছি। সেই সঙ্গে আমার সস্তানের মুখের দিকে চেয়ে আমার স্বামীর মুক্তিযোদ্ধা ভাতা ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা প্রাপ্তির জন্য সরকার এবং জেলা প্রশাসকের কাছে আকুল আবেদন জানাচ্ছি।

অন্যদিকে দু’দিন পর পাল্টা সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে মুক্তিযোদ্ধা ইসমাইল হোসেনের প্রথম ও দ্বিতীয় স্ত্রী’র সন্তানেরা বলেছেন, ৩য় মা মর্জিনা বেগমের বক্তব্য মিথ্যা ও বানোয়াট। ষড়যন্ত্রের বহিঃপ্রকাশ।

বুধবার দুপুরে দিনাজপুর প্রেসক্লাবে প্রয়াত মুক্তিযোদ্ধা ইসমাইল হোসেনর ছেলে নুর ইসলাম সংবাদ সম্মেলন করে বলেছেন, আমার ছোট মা আমার বাবা‘র চিঠিকে মিথ্যা বলবেন এবং ষড়যন্ত্র বলে আখ্যায়িত করবেন এটা আমরা কখনোই ভাবতে পারিনি, এতে আমিসহ আমরা সবাই হতাশ এবং মর্মাহত।

মুক্তিযোদ্ধা ইসমাইল হোসেনের লেখা চিঠির সত্যতা প্রসঙ্গ তুলে ধরে লিখিত বক্তব্য পাঠ করে তিনি বলেন, বাবার নির্দেশ মত আমি চিঠিটি লিখি এবং কম্পিউটার কম্পোজ করে এনে তা বাবাকে পড়ে শোনাই এরপর বাবা তাতে স্বাক্ষর করেছেন। চিঠিতে বাবা যখন স্বাক্ষর করেন তখন ছোট মা পাশেই ছিলেন! অথচ এখন বলছেন চিঠিটি আমার স্বামীর না।

তিনি আরো বলেন, আমার ছোট মা সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, আমরা আমাদের ছোট মা’কে হুইপ এবং সরকারী কর্মকর্তাদের সাথে দেখা করতে দেয়নি। আমরা বলছি এটা ঠিক নয়, আমার ছোট মায়ের সংবাদ সম্মেলনে করা সকল অভিযোগ ও বক্তব্য সম্পূর্ন্ন মিথ্যা ও বানোয়াট।

তিনি জানান,আমি ও আমাদের পরিবারের কাছে এখন মনে হচ্ছে ছোট মা মর্জিনা বেগম একটি বিশেষ মহলের দ্বারা প্ররোচিত কিংবা প্রভাবিত হয়েই এমনটা বলেছেন। ওই মহলটি আমার ছোট মায়ের দারিদ্রতা ও অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়েই অসৎ উদ্দেশ্যে মিথ্যাচারে লিপ্ত হয়েছে।

আমরা সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে ওই মিথ্যাচারের তীব্র প্রতিবাদ এবং ছোট মায়ের লিখিত সংবাদ সম্মেলনের বক্তব্য প্রত্যাখান করছি।

এসময় উপস্থিত ছিলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা ইসমাইল হোসেনের জ্যৈষ্ঠ ছেলে মো. নুরুজ্জামান, সেজো ছেলে নুর হোসেন, দ্বিতীয় মরহুম স্ত্রী হারেছা খাতুনের একমাত্র মেয়ে ইশরাত সুলতানা মনি, পুত্র নুর ইসলামের স্ত্রী রুবিনা ইসলাম ও ছেলে শাহাদাত হোসেন সায়েম।

এদিকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদা না নিয়ে সমাধিত হওয়া সেই আলোচিত মুক্তিযোদ্ধার ৩য় স্ত্রী মর্জিনা বেগমের আর্তি’র বিষয়টি রংপুর বিভাগীয় কমিশনার কে.এম.তারিকুল ইসলাম পর্যবেক্ষনে রেখেছেন বলে জানিয়েছেন। সেই আলোচিত মুক্তিযোদ্ধার ঘটনার তদন্তে এসিল্যান্ড আরিফুল ইসলাম এবং সহকারী কমিশনার মহসেন উদ্দিনকে প্রত্যাহার করা হয়েছে বলেও তিনি জানান। বিষয়টি খুবই স্পর্শকাতর। এনিয়ে দু’পক্ষের বক্তব্য দু’রকম হলেও আর কিছুই করার নেই। মুক্তিযোদ্ধা ইসমাইল হোসেনকে তো আর এখন রাষ্ট্রীয় মর্যাদা দিয়ে দাফন করা সম্ভব না। যা হবার তাতো হয়েই গেছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

Loading...