জজ-ব্যারিস্টার হওয়ার স্বপ্ন পূরণ হলো না ফাতেমার

৫:১১ অপরাহ্ণ | সোমবার, নভেম্বর ১৮, ২০১৯ দেশের খবর, রংপুর

ফরহাদ আকন্দ, স্টাফ রিপোর্টার- ফাতেমা আক্তার (১২) ওর ছোট বেলা থেকেই ওর প্রবল ইইচ্ছে ছিল জজ-ব্যারিস্টার হয়ে মানুষের উপকার করবে। কিন্তু বখাটে মমিন আর তাঁর পরিবার ওর স্বপ্ন ধ্বংস করে দিল শ্বশুর বাড়ির লোকজন। কাঁদতে কাঁদতে কথাগুলো বলছিলেন মুক্তিযোদ্ধা বাবা আবদুর রশিদ। পাশেই মুখে কাপড় চাপা দিয়ে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছিলেন ফাতেমার মা লাইলী বেগম।

ফাতেমার বাবা আব্দুর রশিদ বলেন, মৃত্যুর দিন শ্বশুর বাড়ির লোকজনকে আড়াল করে বড় ভাই-ভাবিকে মোবাইল ফোনে ফাতেমা বলেছিল, মা-বাবাকে বলে আমাকে নিয়ে যাও, আমি পরীক্ষা দেব, ওরা পরীক্ষা দিতে দেবে না। আমাকে তিন বেলা খেতেও দিচ্ছে না, ওরা আমাকে মেরে ফেলবে। সেই রাতেই ওরা নির্যাতন করে আমার মেয়েটাকে মেরে ফেলে।

গতকাল রবিবার (১৭ নভেম্বর) বিকেলে গাইবান্ধা দীঘলকান্দি গ্রামে এ ঘটনা ঘটে। দশম শ্রেণির ছাত্রী ফাতেমার স্মৃতিচারণা করতে গিয়ে পরিবারের সঙ্গে অঝরে চোখের পানি ঝরাচ্ছেন প্রতিবেশীরাও। কেউ প্রকাশ্যে মুখ না খুললেও অনেকেই এটি সাজানো আত্মহত্যার ঘটনা বলে মন্তব্য করেছেন।

তবে এটা খুন না আত্মহত্যা এই নিয়ে রহস্য এলাকার লোকজনদের। সবারই একই কথা হাসি-খুশি চঞ্চল মেয়েটির এ রকম পরিণতি কেন হলো? ‘ওর মতো একটা মেয়ে আত্মহত্যার পথ বেছে নেবে এটা অসম্ভব।

স্থানীয় সূত্রে জান যায়, গাইবান্ধার সাঘাটা উপজেলার হলদিয়া ইউনিয়নের উত্তর দীঘলকান্দি গ্রামের মুক্তিযোদ্ধা আব্দুর রশিদের মেয়ে কিশোরী ফাতেমা আক্তারকে মোবাইল ফোনের মাধ্যমে প্রেমের ফাঁদে ফেলেন সাঘাটার দুর্গম দক্ষিণ দীঘলকান্দিচর গ্রামের সুরা হকের ছেলে বখাটে আব্দুল মমিন (২২)। চলতি বছরের ২৬ আগস্ট বখাটে মমিনের ধোঁকায় পড়ে তাঁর হাত ধরে বাড়ি ছাড়ে ফাতেমা। পরে গত ২৪ সেপ্টেম্বর কোর্টে এফিডেভিটের মাধ্যমে ফাতেমাকে বিয়ে করেন মমিন।

ফাতেমার ভাই হামিদুর রহমানের অভিযোগ, আমার বোনের শরীরে ও গলায় যে ধরনের আঘাতের চিহ্ন দেখেছি তা থেকে সহজেই বোঝা যায় এটি হত্যাকা-। অথচ পুলিশের তদন্ত কর্মকর্তা উদ্দেশ্য প্রণোদিত ভাবে এটিকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা করছেন। আসামি ধরার কথা বললেও আমাদেরকেই তাদের সন্ধান দিতে বলছেন।

তবে তদন্ত কর্মকর্তা এসআই অনিমেশ চন্দ্র অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, প্রাথমিকভাবে আত্মহত্যার আলামত পাওয়া গেছে। এ ঘটনায় সাঘাটা থানায় গত ১৩ নভেম্বর একটি আত্মহত্যায় প্ররোচনা ও সহায়তাদানের অভিযোগে মমিনসহ চারজনকে অভিযুক্ত করে একটি মামলা দায়ের করা হয়।

ফাতেমার বড় বোন সালমা বেগম অভিযোগ করে বলেন, দাম্পত্যের শুরু থেকেই ফাতেমার সংসার করার স্বপ্ন ধসে পড়তে শুরু করে। মাত্র দেড় মাসের সংসার জীবনে নানা অজুহাতে মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন শুরু করে স্বামী মমিন ও শাশুড়িসহ পরিবারের লোকজন। ফাতেমা এসএসসি পরীক্ষা দেবে কিংবা বাবা-মা, ভাই-বোনদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখবে এটা তারা মেনে নেয়নি।

আব্দুর রশিদ অভিযোগ করে বলেন, ঘটনার দিন গত মঙ্গলবার (১২ নভেম্বর) দুপুরে শ্বশুর বাড়ির নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে ফাতেমা তাঁর ভাবি ও বোনকে মোবাইল করলে ভাবি শাহিনুর বেগম, বড় বোন সালমা বেগম এবং আসমা বেগম ওই বাড়িতে যান। এ সময় তাঁদের সামনেই ফাতেমাকে বেধড়ক মারপিট করেন মমিন। এরপর আমরা গণ্যমান্যদের সঙ্গে আলোচনা করে সালিসের সময় ঠিক করি। কিন্তু ওই দিন রাতেই স্বামীর বাড়িতে শোবার ঘরের আড়ার সঙ্গে গলায় ওড়না পেঁচানো ফাতেমার লাশ পাওয়া যায়। এরপর মমিনসহ পরিবারের সবাই বাড়ি থেকে পালিয়ে যান। তিনি দাবি করেন, এটি পরিকল্পিত হত্যাকান্ড। কিন্তু পুলিশ হত্যা মামলা না নিয়ে আত্মহত্যায় প্ররোচনার মামলা করতে তাঁদের বাধ্য করেছে।

এ বিষয়ে সাঘাটা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) বেলাল হোসেন বলেন, ময়নাতদন্তের রিপোর্ট না পাওয়া পর্যন্ত কিছু বলা যাচ্ছে না। তবে আসামিদের গ্রেফতারে পুলিশ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

Loading...