• আজ ২৩শে অগ্রহায়ণ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

যশোরের উত্তর-পূর্ব অঞ্চলের চরমপন্থি প্রতিহিংসায় আবারো হত্যাকান্ড

৬:১২ পূর্বাহ্ণ | মঙ্গলবার, ডিসেম্বর ৩, ২০১৯ খুলনা
Jessor

মহসিন মিলন,বেনাপোল প্রতিনিধিঃ থামছে না যশোরের চরমপন্থি অধ্যুষিত উত্তর-পূর্ব অঞ্চলের প্রতিহিংসা। একে অপরের প্রতি অথবা পরিবারের কোন সদস্যের হত্যার প্রতিশোধ নিয়ে চরিতার্থ করছেন প্রতিহিংসা। এর শিকার বেশি হচ্ছেন সাবেক চরমপন্থিরা। এদের অনেকেই ১৯৯৯ সালে সরকারের আহ্বানে আত্মসমর্পণ করেও প্রতিপক্ষের হাত থেকে রেহাই পাচ্ছেন না।

এভাবে এখনও উচ্চারিত হচ্ছে নিষিদ্ধ ঘোষিত চরমপন্থি সংগঠন পূর্ব-বাংলার কমিউনিস্ট পার্টি ও বিপ্লবী কমিউনিস্ট পার্টির নাম। এসব ঘটনায় প্রতীয়ান হচ্ছে এ অঞ্চলে অবৈধ অস্ত্রধারীদের তৎপরতা নিশ্চিহ্ন হয়নি। ঘাপটি মেরে থেকে আকস্মিকভাবে তারা হত্যাকান্ড ঘটাচ্ছেন। তাদের হাতে রয়েছে বিপুল পরিমান আগ্নেয়াস্ত্র। সর্বশেষ গত ৩০ নভেম্বর শনিবার হাশিমপুরের জনাকীর্ণ বাজারে সন্ত্রাসীরা দিন-দুপুরে গুলি করে হত্যা করেছে চরমপন্থি পূনর্বাসনে চাকরি পাওয়া আনসার সদস্য হোসেন আলী তরফদারকে।

পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থার সূত্রগুলো জানায়, এক সময়ে গোটা যশোর জেলায় নিষিদ্ধঘোষিত চরমপন্থী সন্ত্রাসীদের তৎপরতা ছিলো। সর্বহারা পার্টি বিপ্লবী কমিউনিস্ট পার্টি, পূর্ববাংলার কমিউনিস্ট পার্টি নামে এসব সন্ত্রাসী সংগঠনের সদস্যরা খুন রাহাজানির মাধ্যমে অতিষ্ট করে তোলে যশোরের মানুষকে। এমন এক পরিস্থিতিতে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার ১৯৯৯ সালে যশোরে প্রথম চরমপন্থিদের আত্মসমর্পণ করে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার সুযোগ দেয়। তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিমের উপস্থিতিতে যশোর, ঝিনাইদহ, খুলনা প্রভৃতি স্থানে আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। সরকারের পক্ষ থেকে আত্মসমর্পণ করা চরমপন্থি ক্যাডারদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থার ঘোষণা দেয়। তাদের নামে থাকা মামলাগুলোও পর্যায়ক্রমে প্রত্যাহার করা হয়। সরকারের দেয়া এ সুযোগ গ্রহণ করে দুই হাজার ৬১৩ জন। তারা মোট দুই হাজার ৭৭টি অস্ত্রও জমা দিয়েছিল। তবে জমা দেয়া অস্ত্রগুলোর বেশিরভাগই ভাঙাচোরা ও অকেজো বলে সে সময়ই অভিযোগ ওঠে।

চরমপন্থি ক্যাডাররা তাদের আধুনিক অস্ত্রশস্ত্র লুকিয়ে রেখে অকেজো অস্ত্র জমা দিয়ে প্রতারণার মাধ্যমে পুনর্বাসিত হওয়ার সুযোগ নেয় বলে সে সময়ে  বিশ্বাস করা হয়। আত্মসমর্পণ করা ৭৮০ জনকে তৎকালীন সরকার আনসার বাহিনীতে পুনর্বাসিত করেছিল। কিন্তু এদের মধ্যে ১৩৭ জন চাকরি ছেড়ে চলে আসে। এদের অনেকেই ফের আন্ডারগ্রাউন্ডে চলে যায়। চরমপন্থিদের আত্মসমর্পন করানো হলেও এ অঞ্চলে থামেনি তাদের তৎপরতা। বরং চরমপন্থি আত্মসমর্পন প্রক্রিয়ার পর থেকে সন্ত্রাসীদের হাতে যশোরের উত্তরাঞ্চলে একের পর এক খুন অব্যাহত রয়েছে। ইতিপূর্বে প্রতিপক্ষের হাতে খুন হন যশোর সদর উপজেলার রাজাপুর গ্রামের জনপ্রিয় বিএনপি নেতা খলিলুর রহমান, ইছালীর কোহিনূর রহমান, ইউপি চেয়ারম্যান মোশাররফ হোসেন, স্কুলছাত্র মিঠু, ব্যবসায়ী আব্দুস সাত্তার, ইদ্রিস আলী, নজরুল, সেন্টু, আব্দুর রশিদসহ আরও অনেকে। গুলি করে মেরে ফেলার চেষ্টা করা হয়েছে ইছালী ইউনিয়নের সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান মরহুম আব্দুল মতলেবকে। সর্বশেষ গত শনিবার দিন দুপুরে গুলি করে হত্যা করা হয় হাশিমপুর গ্রামের হোসেন আলী তরফদারকে। হোসেন আলী তরফদার এক সময়ে চরমপন্থী দলের সদস্য ছিলেন। ১৯৯৯ সালে যশোর টাউন হল ময়দানে আত্মসমর্পন করেন। পরে তাকে আনসার সদস্যের চাকরি দেয় সরকার। স্থানীয়রা জানান, পূর্ব শত্রুতার জের ধরে চরমপন্থিরা হোসেন আলী তরফদার খুন হয়েছেন।

গোয়েন্দা সূত্রগুলো জানায়, এ অঞ্চলের চরমপন্থি তৎপরতা রোধে ইতিপূর্বে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কঠোর ভূমিকা রেখেছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর এনকাউন্টারে বেশ কয়েকজন শীর্ষ সন্ত্রাসী নিহত হয়েছে। এদের মধ্যে শীর্ষ সন্ত্রাসী তালবাড়িয়ার হারুন-আসলাম, চাঁদপাড়ার মঞ্জু, রাজাপুরের হাদী ও সোহাগ অন্যতম। রাজাপুরের শীর্ষ সন্ত্রাসী বাছেতকে পিটিয়ে হত্যা করে এলাকাবাসী। এছাড়া কারাগারে থাকাবস্থায় মারা যায় যশোরের পূর্বাঞ্চলের এক সময়ে সন্ত্রাসী  বাঘারপাড়ার জাফর শেখ। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর লাগাতার ক্রসফায়ারে এসব সন্ত্রাসীরা মারা গেলেও এ অঞ্চলের চরমপন্থিদের উত্থান দমন করতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

Loading...