‘ধর্ষণের পর রুম্পা হত্যা’, সন্দেহের তীর সহপাঠীর দিকে!

১১:৪৪ পূর্বাহ্ণ | শনিবার, ডিসেম্বর ৭, ২০১৯ আলোচিত বাংলাদেশ

সময়ের কণ্ঠস্বর ডেস্ক- রাজধানীর সিদ্ধেশ্বরীতে স্টামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের (স্নাতক) ছাত্রী রুবাইয়াত শারমিন রুম্পা (২১) হত্যার এখনো সুনির্দিষ্ট কোনো ক্লু খুঁজে পায়নি পুলিশ।

প্রাথমিকভাবে পুলিশ ও ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসকদের ধারণা, রুম্পাকে ধর্ষণের পর সিদ্ধেশ্বরীর কোনো একটি ভবন থেকে নিচে ফেলে হত্যা করা হয়। আর এর সঙ্গে জড়িত হিসেবে সন্দেহের তীর রিফাত নামে তার এক সহপাঠীর দিকে। তবে তদন্তসংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তারা এ নিয়ে এখনো পরিষ্কার করে কোনো কিছু বলতে রাজি নন।

এদিকে রুম্পা হত্যার ঘটনায় ক্ষোভে ফেটে পড়েছেন স্টামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। তারা হত্যাকারীদের চিহ্নিত ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে গতকাল শুক্রবার বিশ্ববিদ্যালয়ের সিদ্ধেশ্বরী ক্যাম্পাস এবং রাজধানীর ভিকারুননিসা নূন স্কুলের সামনে বিক্ষোভ ও মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেন। এছাড়া একই দাবিতে আজ শনিবারও স্টামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সিদ্ধেশ্বরী ও ধানমণ্ডি ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করার কথা রয়েছে।

রুম্পা হত্যা মামলার তদন্তে জড়িত পুলিশ কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গতকাল রাত ৮টা পর্যন্ত তারা আলোচিত এই হত্যার সুনির্দিষ্ট কোনো ক্লু খুঁজে বের করতে পারেননি। তবে রুম্পার ব্যবহৃত মোবাইল ফোনের কল লিস্টের সূত্র ধরে হত্যাকাণ্ডের রহস¨ উদঘাটনের চেষ্টা চলছে। কারা তাকে বাসার নিচ থেকে কেন ডেকে নিয়ে গেছে সেটা জানার চেষ্টা করছে পুলিশ।

রমনা থানার ওসি মনিরুল ইসলাম গতকাল বিকেলে এক জাতীয় দৈনিককে বলেন, ‘বুধবার সন্ধ্যার পর রুম্পা বাসা থেকে বেরিয়েছিলেন। তিনি নিজের মোবাইল ফোনটিও সঙ্গে নেননি। তার মৃত্যুর বিষয়টি এখনো পরিষ্কার নয়। আমরা ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনের অপেক্ষায় আছি। থানায় হত্যা মামলা হয়েছে। সেটার তদন্ত চলছে।’

রুম্পা হত্যা মামলার তদন্তসংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা বলেন, ‘শান্তিবাগে রুম্পার বাসার গলি ও যেখানে রুম্পার লাশ পাওয়া গেছে সেখানকার কয়েকটি ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরার ফুটেজ সংগ্রহ করা হয়েছে। সেগুলো আমরা বিশ্লেষণ করে দেখছি। আশা করছি শিগগিরই রুম্পার মৃত্যুর রহস্য উদঘাটন এবং ঘাতকদের গ্রেপ্তার করা যাবে।’

এই পুলিশ কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘রুম্পার মোবাইল ফোনের কল লিস্ট পরীক্ষা করে দেখা হচ্ছে। এর মাধ্যমে জানা যাবে, কে তাকে বাসা থেকে ডেকে নিয়েছে। কারণ বাসা থেকে রুম্পাকে ফোন করে ডেকে নেওয়া হয়। এক্ষেত্রে প্রেমঘটিত বিষয়কেও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।’

জানা গেছে, ঘটনার দিন রুম্পা দুটি টিউশনি শেষে সন্ধ্যায় বাসায় ফেরেন। পরে কাজ আছে বলে বাসা থেকে বের হন তিনি। বাসা থেকে নিচে নেমে নিজের ব্যবহৃত মোবাইল ফোন ও জুতো বাসায় পাঠিয়ে দিয়ে এক জোড়া পুরনো স্যান্ডেল পায়ে দিয়ে চলে যান। রাতে আর বাসায় ফেরেননি তিনি।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে রুম্পার চাচা নজরুল ইসলাম বলেন, ‘আমার ভাতিজির সঙ্গে স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটির একটি ছেলের সম্পর্ক ছিল। তাদের ভেতরে ঝামেলা চলছিল বলে আমরা শুনেছি। তবে এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে ওই ছেলের কোনো সম্পর্ক আছে কি না তা আমরা জানি না। এ ব্যাপারে আমি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলেছি। কর্তৃপক্ষ ওই ছেলেকে ডেকে জিজ্ঞাসাবাদ করবে।’

নজরুল জানান, ঘটনার দিন বিকালে রুম্পা পাশের একটি বাড়িতে টিউশনি করতে গিয়েছিল। সেখান থেকে সন্ধ্যার দিকে বাসায় ফিরে আবার নিচে চলে যায়। এরপর রুম্পা দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়ুয়া তার এক চাচাতো ভাইকে ফোন করে বাসার নিচে স্যান্ডেল আনতে বলে। শিশুটি স্যান্ডেল নিয়ে এলে পায়ের হিল খুলে স্যান্ডেল পরেন রুম্পা। ওই চাচাতো ভাইয়ের কাছে নিজের কানের দুল, মোবাইল ফোন, ঘড়ি, হিল জুতো ও টাকাসহ নিজের ব্যাগটি দিয়ে রুম্পা সেগুলো ওপরে নিয়ে যেতে বলে। একই সঙ্গে মাকে বলতে বলে, তার আসতে দেরি হবে।

চাচা নজরুল বলেন, ‘আমার প্রশ্ন কেন সে এগুলো রেখে যাবে? আত্মহত্যার পরিকল্পনা? তাই হলে তো নিজের বাড়ির ছাদই আছে। সেটা বাদ দিয়ে আত্মহত্যার জন্য বাইরে যাবে কেন? নাকি কোনো ঝামেলা ছিল? তাই এগুলো রেখে গিয়েছিল। এসব ভালো করে তদন্ত করতে হবে।’

স্টামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের তৃতীয় সেমিস্টারের একজন শিক্ষার্থী জানান, বিশ্ববিদ্যালয়ের সহপাঠী রিফাতের সঙ্গে রুম্পার প্রেমের সম্পর্ক রয়েছে। মৃত্যুর আগে কয়েক দিন ধরে তাদের মধ্যে টানাপড়েন চলছিল।

স্টামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক শেখ নাহিদ নেওয়াজ বলেন, ‘আমি রুম্পাদের ৬৯ ব্যাচের ওরিয়েন্টেশন ক্লাস নিয়েছিলাম। সে শান্ত ও লক্ষ্মী মেয়ে ছিল। সে বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘স্ট্রে বার্ড’ নামে একটি সাংস্কৃতিক সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত ছিল। তার বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ ছিল না। ঘটনাটি তদন্ত করে জড়িতদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া হোক।’

রমনা থানা পুলিশের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘সিদ্ধেশ্বরীর যে বাড়ির সামনে (৬৪ / ৪ নম্বর) রুম্পার লাশ পাওয়া যায়, তার পাশে আরও দুটি ভবন রয়েছে। আমরা ধারণা করছি, এর যেকোনো একটি ভবন থেকে রুম্পাকে ফেলে দেওয়া হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত আমরা কোনো আসামিকে গ্রেপ্তার করতে পারিনি।’

উল্লেখ্য, গত বুধবার রাতে রাজধানীর ইনার সার্কুলার রোড থেকে রুম্পার লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। এরপর ময়নাতদন্ত শেষে শুক্রবার ভোর ৫টায় রুম্পার লাশ গ্রামের বাড়ি ময়মনসিংহের চরনিলক্ষীয়া ইউনিয়নের বিজয়নগরে নিয়ে আসা হয়। সেখানে বেলা ১০টায় জানাজা শেষে পারিবারিক গোরস্থানে দাদী রুবিলা খাতুনের কবরের পাশে তাকে সমাহিত করা হয়।

রুম্পার বাবা মো. রুককুন উদ্দিন হবিগঞ্জ জেলার পুলিশ ফাঁড়ির পরিদর্শক হিসাবে কর্মরত। মা নাহিদা আক্তার পারুল গৃহিণী। এক ভাই ও এক বোনের রুম্পা সবার বড়।

রুম্পা ২০১৪ সালে রাজারবাগ পুলিশ লাইনস্ স্কুল থেকে জিপিএ-৫ পেয়ে এসএসসি, ২০১৬ সালে ভিকারুন্নিসা নুন স্কুল এন্ড কলেজ থেকে জিপিএ-৫ এইচএসসি উত্তীর্ণ হন।

রুম্পা স্ট্যামফোর্ড ইউনিভার্সিটির ইংরেজি বিভাগের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন। আর ছোট ভাই আশরাফুল আলম রাজধানীর ঢাকার ন্যাশনাল আইডিয়াল স্কুল এন্ড কলেজে উচ্চ মাধ্যমিকে অধ্যয়নরত।

রাজধানী ঢাকার শান্তিবাগে একটি ফ্ল্যাটে মায়ের সঙ্গে থেকে পড়াশোনা করতেন রুম্পা ও তার ছোট ভাই। পড়াশোনার পাশাপাশি রুম্পা টিউশনি করাতেন।

Loading...