শিবির সন্দেহে ঢাবিতে ৪ শিক্ষার্থী‌কে রাতভর ছাত্রলীগের নির্যাতন

৪:২১ অপরাহ্ণ | বুধবার, জানুয়ারি ২২, ২০২০ শিক্ষাঙ্গন

সময়ের কণ্ঠস্বর ডেস্ক- ছাত্রশিবিরের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত সন্দেহে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হলের চার ছাত্রকে স্টাম্প ও রড দিয়ে পেটানোর পর হল প্রশাসনের মাধ্যমে পুলিশে দিয়েছে ছাত্রলীগ।

গতকাল মঙ্গলবার রাত ১১টার দিকে শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হলের অতিথিকক্ষে ‘গেস্টরুম কর্মসূচি’ শেষে রাত দুইটা পর্যন্ত ওই শিক্ষার্থীদের পেটান ছাত্রলীগের একদল নেতা-কর্মী। পরে হল প্রশাসন ও বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরিয়াল টিমের মাধ্যমে তাঁদের রাজধানীর শাহবাগ থানায় সোপর্দ করা হয়। আজ বুধবার বেলা দেড়টার দিকে তাঁদের ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।

মারধরের শিকার চার শিক্ষার্থী হ‌লেন, ট্যুরিজম অ্যান্ড হস‌পিটা‌লি‌টি ম্যা‌নেজ‌মেন্ট বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী মুকিমুল হক চৌধুরী, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী সানোয়ারুল ইসলাম, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃ‌তি বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী মিনহাজ উদ্দিন, আরবি বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী আফসার উদ্দিন।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, রাত ১১টার দিকে জহুরুল হক হলের গেস্টরুমে ছাত্রলীগের নিয়মিত গেস্টরুম চলছিল। তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী মো. মুকিম চৌধুরীকে শিবির সন্দেহে গেস্টরুমে ডাকা হয়। সেখানে হল শাখা ছাত্রলীগের বিলুপ্ত কমিটির সহ-সভাপতি আনোয়ার হোসেন ও যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক আমির হামজা তাদের অনুসারীদের দিয়ে মুকিমকে প্রথমে মানসিক চাপ দেন।

এতে স্বীকার না করায় তাকে লাঠি, স্টাম্প ও রড দিয়ে বেধড়ক মারধর করতে থাকেন। পরে তার ফোনের চ্যাটলিস্ট দেখে ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীকে সঙ্গে নিয়ে সানওয়ারুল ইসলাম, মিনহাজ উদ্দীন ও আফসার উদ্দীনকে গেস্টরুমে আনা হয়। সেখানে তাদের বেধড়ক মারধর করেন ছাত্রলীগের নেতারা। রাত দুইটা পর্যন্ত তাদের ওপর বিভিন্ন ধরনের নির্যাতন চলে। পরে গভীর রাতেই তাদের প্রক্টরিয়াল টিমের মাধ্যমে শাহবাগ থানায় হস্তান্তর করা হয়। পুলিশ তাদের ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করে।

জানা যায়, নির্যাতনকারী আনোয়ার হোসেন ও আমির হামজা দুজনেই কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ সভাপতি আল নাহিয়ান খান জয়ের অনুসারী। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক প্রত্যক্ষদর্শী এক শিক্ষার্থী বলেন, রাত ১১টা থেকে মুকিমকে পাওয়া যাচ্ছিল না। পরে আমরা বন্ধুরা রাত একটায় তাকে খুঁজতে বের হলে গেস্ট রুম থেকে বড় ভাইয়েরা মুকিমকে সাথে নিয়ে বের হতে দেখি। এসময় মুকিম আহত অবস্থায় ছিল বলেও নিশ্চিত করেছেন এ শিক্ষার্থী।

অভিযুক্ত ছাত্রলীগের নেতারা দাবি করছেন, তাদের কাছ থেকে শিবির সংশ্লিষ্ট বই উদ্ধার করা হয়েছে। তবে সাংবাদিকরা জানতে চাইলে এর কোনো ছবি অথবা প্রমাণ দিতে পারেননি তারা।

শিবির সন্দেহে গেস্টরুমে ডাকা হলেও তাদের কাছে শিবিরের রাজনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়‌নি।

ঘটনার বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক এ কে এম গোলাম রব্বানী বলেন, ওই চার ছাত্র কোনো শৃঙ্খলাপরিপন্থী কাজে জড়িত কি না, তা খতিয়ে দেখতে তাঁদের থানায় দেওয়া হয়েছে। অভিযোগের কোনো প্রমাণ না পাওয়া গেলে তাঁদের ছেড়ে দেওয়া হবে।

শাহবাগ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবুল হাসান আজ বেলা পৌনে দুইটার দিকে বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনো অভিযোগ না পাওয়ায় ওই চার ছাত্রকে জিজ্ঞাসাবাদের পর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। শিবিরসংশ্লিষ্টতার কোনো প্রমাণ পাওয়া গেছে কি না, জানতে চাইলে ওসি বলেন, ‘এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে চাইছি না।’

ঘটনার বিষয়ে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি আল নাহিয়ান খান বলেছেন, তিনি জানতে পেরেছেন যে শিবিরসংশ্লিষ্টতা থাকায় চার ছাত্রকে থানায় দেওয়া হয়েছে। তবে তাঁদের মারধর করা হয়েছে কি না, তা তাঁর জানা নেই। তিনি বলেন, কারও ওপর শারীরিক আঘাত কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

এদিকে এ ঘটনার প্রতিবাদে আজ বিকেলে ক্যাম্পাসে বিক্ষোভের ডাক দিয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) সহসভাপতি (ভিপি) নুরুল হকের নেতৃত্বাধীন ১২ ছাত্রসংগঠনের জোট সন্ত্রাসবিরোধী ছাত্রঐক্য।

Loading...