ঘুষের চুক্তি অনুযায়ী টাকা না দেয়ায় প্রতিবাদকারীই চার্জসীটভুক্ত আসামী !

৭:৩৭ অপরাহ্ণ | রবিবার, জানুয়ারি ২৬, ২০২০ ঢাকা
Madaripur

মেহেদী হাসান সোহাগ, স্টাফ রিপোর্টার : ৬৬ বয়সী বৃদ্ধ খলিল বেপারী পেশায় একজন কৃষক। বিগত দিনে মাদারীপুর সদর উপজেলার ঝিকরহাটি এলাকা মাদকের অভয়আশ্রমে পরিনত হলে জোড়ালো প্রতিবাদ করেন তিনি। সেখান থেকেই শত্রুতা সৃষ্টি হয় মাদক কারবারীদের সাথে। সে শত্রুতার জেরে কয়েকটি মামলাও হয় তার বিরুদ্ধে। এলাকার পুণরায় তদন্ত করে মামলা থেকে অব্যহতি দেয়া হয়। কিন্তু তার কিছুদিন পর আবারও একটি মামলায় আসামী করে মামলা দেয়া হয়। মামলা থেকে অব্যহতি দিতে চুক্তি হয়, টাকাও দেয়া হয়’ পুরো টাকা না দেয়ায় ১মাসের মাথায় মামলায় আসামী করে চার্জসিট দেয়া হয়। তবে চার্জসিট দেয়ার পর মাদক ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে বিপুল পরিমান টাকা নিয়ে তার ঘুষের টাকা ফেরত দেয়া হয়েছে বলে জানান খলিল বেপারী।

জানা যায়, মাদক ব্যবসায়ীরা সুযোগের সন্ধানে থাকে কখন খলিল বেপারীকে আবার ফাঁসানো যায়। ২০১৯ সালের ২৭ জুলাই মাদারীপুর সদর মডেল ধানধীন মস্তফাপুর বাসস্টান্ডের ঢাকা- বরিশাল মহাসড়কে একটি কাভার্ড ভ্যান(ঢাক মেট্রো-ন-১৩-২৯৬৬) কে আটক করে জেলা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রন অফিসের পরিদর্শক আবুল কালাম আজাদ ও তার সঙ্গীয় ফোর্স। সেই কাভার্ড ভ্যান থেকে চটের বস্তার মধ্য হতে ১২ পোটলা গাজা যার আনুমানিক ওজন ২৪ কেজি উদ্ধার করা হয় এবং ড্রাইভার আশরাফুল ইসলাম(২৪) কে আটক করে জেল হাজতে প্রেরন করা হয়। এ ঘটনায় তাকে মাদক মামলায় আসামী করা হয়েছে বিষয়টি খলিল পরে জানতে পারে। শুনেই যেন তার মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়ে। কোন ভাবেই বুঝে উঠতে পারেনি এ কাজ কেমন করে হলো। তার পর বহুবার প্রশাসনের দ্বারে দ্বারে ধন্যা দিয়েও কোন উপায়ান্ত করতে পারেনি খলিল বেপারী। যোগাযোগ করে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রন অফিসের পরিদর্শক মোঃ আবুল কালাম আজাদের কাছে। আবুল কালাম আজাদকে ৫০ হাজার টাকাও দেয় বলে জানান খলিল বেপারী’ যাতে সে মামলার হয়রানী থেকে মুক্তি পায়। কিন্তু কোন ফায়দা হয়নি খলিল বেপারীর। অনুদানে পাওয়া স্ত্রীর চিকিৎসার টাকা ঘুষ দিয়েও কোন ফল পাওয়ার আগেই খলিল বেপারীকে আসামী করে চার্জসিট দিয়ে দেয় মামলার আইও। তার পরপরই বদলি হয়ে চলে যান আবুল কালাম আজাদ। এখানেই কষ্ট শেষ হয়নি খলিল বেপারীর। খুজে পায় ঐ মাদক মামলার কারাভোগকারী আশরাফুল ইসলাম(ড্রাইভার) কে।

ড্রাইভার আশরাফুল জানান,খলিল বেপারী নামের কোন লোককে আমি চিনিই না। আর আমার গাড়িতে যে এ ধরনের মাল(মাদক) আছে তাও আমি জানতাম না, আর মস্তফাপুরে কোন মাল ডেলিভারি হওয়ার কথাও ছিল না। আমি নিজে ভুক্তভোগী হয়েছি আমার কপালে ছিল তাই বলে আমি একজন নিরপরাধ লোকের ক্ষতি করতে পারবো না।

আশরাফুলের কাছে জানতে চাওয়া হয় খলিল বেপারীর নাম তাহলে মামলায় আসলো কি ভাবে? তার উত্তরে আশরাফ বেপারী জানান,আমাকে প্রচুর পরিমান নির্যাতন করে বলা হয় তুই বলবি খলিল বেপারী নামের একজনের মাল(গাজা) মাদক। যে অফিসার আমাকে আটক করে সে এবং তার সাথের লোকজন আমাকে বলে তুই খলিল বেপারীর নাম বললে তোকে ছেড়ে দিব। আমি নিজে জেল খাটলেও বলবো খলিল বেপারীকে আমি চিনি না, আর মাল(মাদক) ও তার না। আমি জানতে পেরেছি সে আমার বাবার বয়সী মানুষ আমি তার অভিশাপ নিতে পারবো না।

খলিল বেপারী জানান, আমি মাদকের প্রতিবাদ করে মাদক মামলার আসামী হয়ে দ্বারে ঘুরছে নিজেকে নির্দোশ প্রমান করতে। এ সমাজ ব্যবস্থা ও প্রশাসনের উপরে আস্থা উঠে গেছে । সমাজে খারাপ কাজের কোন প্রতিবাদ কেউ যেন না করে আমার মত, তাহলে হয়তো তাদেরও আমার মত ভুক্তভোগী হয়ে কষ্টে কষ্টে জীবন শেষ হয়ে যাবে। আমি চাই এসব ভোগান্তি থেকে মুক্তি পেয়ে স্বাভাবিক ভাবে জীবন যাপন করে পরপারে পাড়ি জমাতে। এলাকায় একটা প্রমান নেই আমি মাদকের সাতে জড়িত। আমি এর প্রতিবাদ করেছি। তাছাড়া আমি এই মামলা থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য লোক মাধ্যম পরিদর্শকের কাছে গেলে সে ৭০হাজার টাকা দাবী করেন আমাকে মামলা থেকে অব্যহতি দিবে কিন্তু আমি লোক মাধ্যম ৫০ হাজার টাকা দিলে একমাস পর মামলা থেকে অব্যহতি না দিয়ে মাদক ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে বিপুল পরিমান টাকা নিয়ে আমার টাকা ফেরত দিয়েছে।

ঘটমাঝি এলাকার শালিস মাদব্বর আনোয়ার দর্জি, তোবারক খান সহ কয়েকজন বলেন, খলিল বেপারী কোনদিনই মাদকের সাথে জড়িত ছিল না। সে এলাকার ভাল কাজের সাথে থাকে বলেই আজ মাদক মামলার আসামী। খলিল বেপারি একটি মসজিদের কমিটির সাথে জড়িত। আমরা তার এই মামলা থেকে  মুক্তি চাই।

ঘটমাঝি ইউনিয়নের ইউপি চেয়ারম্যান এড. বাবুল আক্তার বলেন, আমার জানা মতে খলিল বেপারী একজন ভাল মানুষ । তাকে পূর্বশুত্রুতার জেরে এই মামলায় ফাঁসানো হয়েছে। এর আগেও তাকে মাদক মামলা দেয়া হয়েছিল কিন্তুসেই মামলা থেকে সে অব্যহতি পেয়েছে।

মানবাধিকার সংগঠন এইআরসিবিএম সভাপতি সবুল বিশ্বাস বলেন, মাদকের বিরোধিতা করে যদি সে নিজেই মামলার আসামী হয় তাহলেতো কেউ আর ভাল কাজে এগিয়ে আসবে না। তাই আমি মনে করি খলিল বেপারীর বিরুদ্ধে যে মামলা করা হয়েছে তা উদ্দেশ্যমূলক। এই মামলা থেকে তাকে অব্যহতি দিয়ে সমাজের ভালকাজ করার উৎসাহ দিতে হবে। মানববাধিকার লঙ্ঘন হয় এমন কাজ করা উচিত না।

মাদক মামলার বাদী মাদারীপুর জেলা মাদকদ্রব্য অধিদপ্তরের পরিদর্শক, মো. আবুল কালাম আজাদ বলেন, আমি মাদকসহ একজনকে আটক করে বাদী হয়ে মামলা করেছি। বাকিটা মামলার আইও সে কি করছে সেটা তার ব্যাপার। টাকা কথা জানতে চাইলে সে জানায় আমি এবিষয় কিছু জানিনা। আমি মামলার বাদী আর কিছুনা।

মাদারীপুর মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সহকারি পরিচালক (মামলার আইও) মো. আসলাম হোসেন জানান, যাকে আটক করা হয়েছিল তার স্বীকারক্তি ও তদন্তকরে আমি মামলার চার্জসিট দিয়েছি। সে নির্দোষ হলে তার প্রমাণ দিয়ে আদালত থেকে মুক্তি পেতে পারে। ঘুষের টাকা সম্পর্কে জানতে চাইলে সে জানায়, এরকম কোন কথা কারো সাথে আমার হয় নাই। যদি কেউ এরকম করে থাকে তার প্রমাণ পেলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

Loading...