পঞ্চগড়ে আ.লীগ নেতার প্রশ্রয়ে অবসরে যাওয়ার বদলে পদে বহাল মাদ্রাসা সুপার!

১০:৫৮ পূর্বাহ্ণ | মঙ্গলবার, ফেব্রুয়ারি ১৮, ২০২০ দেশের খবর, রংপুর

নাজমুস সাকিব মুন, পঞ্চগড় প্রতিনিধি: পঞ্চগড়ে মাদ্রাসার সুপারের বিরুদ্ধে ৬০ বছর বয়স পূর্ণের পরও প্রভাব খাটিয়ে পদে বহাল থাকার পাঁয়তারা করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

জেলার দেবীগঞ্জ উপজেলার সুন্দরদিঘী ইউনিয়নের খারিজা গুয়াগ্রাম হাজরা ডাঙ্গা দাখিল মাদ্রাসার সুপার মতিউর রহমানের বিরুদ্ধে এই অভিযোগ উঠেছে।

মতিউর রহমান চলতি ২০২০ সালের ৩১ জানুয়ারি ৬০ বছর পূর্ণ করায় অবসরে যাওয়ার কথা। কিন্তু সরকারি নীতিমালাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে এখনো তিনি দায়িত্ব হস্তান্তর করেন নি।

অভিযোগ উঠেছে মাদ্রাসার গভর্নিং বডির সভাপতি মকছেদ আলীর প্রশ্রয়ে সাবেক সুপার মতিউর রহমান দায়িত্ব আঁকড়ে থাকার চেষ্টা করছেন। মকছেদ আলী দন্ডপাল ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি হওয়ায় মাদ্রাসার অন্যান্য শিক্ষকদের মতামত ও সরকারি নীতিমালার তোয়াক্কা না করে রাজনৈতিক প্রভাব খাটানোর চেষ্টা করছেন বলে অভিযোগ করেছেন মাদ্রাসার শিক্ষক ও স্থানীয়রা।

মতিউর রহমান সুপার থাকাকালীন গভর্নিং বডির সাথে আঁতাত করে নিয়োগ বাণিজ্যে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে সাবেক এই সুপারের বিরুদ্ধে।

চাকুরীর মেয়াদ উত্তীর্ণ হওয়ার পরও এখনো মাদ্রাসার অফিস সংলগ্ন একটি কক্ষে থাকেন মতিউর রহমান। যা সম্পূর্ণ বিধি বহির্ভূত। মাদ্রাসায় ১৯৮২ সালে চাকরিতে যোগদানের পর থেকেই তিনি মাদ্রাসার অফিস কক্ষে ও পরে স্থানীয়দের তোপের মুখে অফিস কক্ষের পাশের কক্ষে থাকতে শুরু করেন।

জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জ উপজেলার বাসিন্দা ছুতির উদ্দিনের ছেলে মতিউর রহমান। চাকরিতে যোগদানের পর থেকে মতিউর কখনই তার পরিবারকে নিয়ে আসেন নি। এই অযুহাতে তিনি চাকরিকালীন পুরো সময় বাইরে বাসা ভাড়া না নিয়ে মাদ্রাসা কক্ষেই থাকতেন।

গোপন সূত্রে জানা যায়, মাদ্রাসার গভর্নিং বডির সভাপতি মকছেদ আলী ও সাবেক সুপার মতিউর রহমান ব্যাক ডেটে আয়া, নিরাপত্তা প্রহরী, লাইব্রেরিয়ান, অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর পদে লোক পদে গোপনে নিয়োগ প্রদানের পাঁয়তারা করছেন। এতে বড় ধরণের আর্থিক লেনদেন হবে বলে নিশ্চিত করেছে সূত্রটি। ইতিমধ্যে প্রার্থীদের নিকট থেকে মোটা অংকের টাকা নেয়া হয়েছে বলে জানে গেছে।

রবিবার (১৬ ফেব্রুয়ারি) অফিস চলাকালীন সময়ে সরেজমিনে মাদ্রাসায় গিয়ে দেখা যায় যে কক্ষটিতে মতিউর থাকেন সেটা তালাবদ্ধ। দায়িত্ব হস্তান্তরে টালবাহানা ও ব্যাক ডেটে নিয়োগ বাণিজ্যের বিষয়ে জানতে মতিউরের মুঠোফোনে বেশ কয়েকবার ফোন করলেও তিনি লাইনটি কেটে দেন। এরপর গভর্নিং বডির সভাপতি মকছেদ আলীকে ফোন করে দেখা করতে চাইলে তিনি দেবীগঞ্জে আছেন বলে জানান। একই সাথে সাবেক সুপার মতিউর তার সাথে থাকার বিষয়টি নিশ্চিত করেন।

ফোনে মকছেদ আলী জানান, নতুন সুপারের পদটির নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত সাবেক সুপার মতিউর রহমানকে বেতন-ভাতা দেয়া হবে না শর্তে ৬ মাসের জন্য দায়িত্বে বহাল রাখা হয়েছে। এর স্বপক্ষে উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নিকট থেকে কোন লিখিত অনুমতি নেয়া হয়েছে কিনা জানতে চাইলে মকছেদ জানান তাদের কাছে লিখিত অনুমতি রয়েছে। লিখিত অনুমতি দেখাতে বললে তিনি বিষয়টি কৌশলে এড়িয়ে যান। একজন অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষককে সাথে নিয়ে কি কারণে তিনি উপজেলা শিক্ষা অফিসে ঘোরাঘুরি ও স্থানীয় রাজনৈতিক ব্যক্তিদের সাথে যোগাযোগ করছেন প্রশ্ন করলে কোন সদুত্তর দিতে পারেন নি মকছেদ।

মতিউর রহমান শিক্ষা অফিসে অবস্থান করছেন খবর পেয়ে সাংবাদিকরা সেখানে উপস্থিত হয়ে তার সাথে কথা বলেন। প্রথমে গভর্নিং বডির সভাপতি মকছেদ আলী বলেন সুপার শিক্ষা কর্মকর্তার সাথে মিটিংয়ে আছেন, তাই ফোন ধরছেন না। কিন্তু শিক্ষা কর্মকর্তা ফোনে জানান মতিউর রহমান নামে কেউ তার সাথে নেই। পরে শিক্ষা কর্মকর্তার অফিসে গিয়ে দেখা যায় মাদ্রাসা সুপার একাই বসে আছেন।

সেখানে মাদ্রাসা সুপার মতিউর রহমান জানান, মাদ্রাসা সভাপতি মকছেদ আলী ও কমিটির সদস্যরা আমাকে রেজুলেশন করে ছয় মাসের জন্য নিয়োগ দিতে মাদ্রাসা বোর্ডে আবেদন করেছেন। কিন্তু তিনি রেজুলেশনের কপি দেখাতে পারবেন কিনা জানতে চাইলে কিছু বলেন নি।

তবে মাদ্রাসার শিক্ষকদের জন্য সর্বশেষ এমপিও নীতিমালা ২০১৮ অনুযায়ী শিক্ষকদের অবসরের বয়স ৬০ বছর করা হয়েছে। ৬০ বছর পূর্ণ করা কাউকে প্রতিষ্ঠান প্রধান, সহকারী প্রধান বা সাধারণ শিক্ষক পদে পুনঃনিয়োগ বা চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ করা যাবে না। বেতন-ভাতা প্রদান না করে কাউকে দায়িত্বে বহাল রাখার ব্যাপারেও কোন উল্লেখ নেই।

৬০ বছর পূর্ণ করার পর কোন শিক্ষককে পুনরায় দায়িত্বে বহাল রাখা যায় কিনা এই ব্যাপারে জানতে কথা হয় দেবগঞ্জ উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা সলিমুল্লাহর সাথে। তিনি জানান, ৬০ বছর বয়স পূর্ণের পর কোন শিক্ষককে পুনরায় দায়িত্বে বহাল রাখার কোনো এখতিয়ার মাদ্রাসার গভর্নিং বডির সদস্যদের নেই। মাদ্রাসা সুপারের অবসরে যাওয়ার পর দিন থেকে সহকারি সুপার ভারপ্রাপ্ত হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। এই জন্য আলাদা করে নির্দেশনা দেয়ার কোন প্রয়োজন নেই। তবে মতিউরের বিষয়টি আপনাদের কাছে শুনলাম। খোঁজ নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানাবো।

দেবীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা প্রত্যয় হাসান জানান, এখনো এই ব্যাপারে কেউ অভিযোগ দেন নি। তবে আপনি যেহেতু বললেন বিষয়টি নিয়ে খোঁজ নিব। অভিযোগের সত্যতা মিললে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।