প্রথম শহীদ মিনারের রূপকার ভাষা সৈনিক ডা. গোলাম মাওলা

১১:৪৯ পূর্বাহ্ণ | মঙ্গলবার, ফেব্রুয়ারি ১৮, ২০২০ ফিচার

ইসমাইল হোসেন স্বপন- বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামের অনুপ্রেরণা হচ্ছে ভাষা আন্দোলন। সেই ভাষা আন্দোলনের সাফল্য থেকে বাঙালি পেয়েছে মুক্তির সংগ্রামের উজ্জীবনী শক্তি ও সাহস। ভাষা সৈনিক হিসেবে দেশের অনেকেরই অবদান রয়েছে। এদের মধ্যে অন্যতম একজন ডা. গোলাম মাওলা। ভাষা আন্দোলনে তাঁর অবদান চিরস্মরণীয় ও অনস্বীকার্য।

তিনি বহুমুখী প্রতিভার এক অনন্য উজ্জ্বল তারকা এবং নীতি নৈতিকতার আদর্শের প্রাণ পুরুষ। ছাত্রজীবন থেকে আমৃত্যু সেই সংগ্রামে অবিচল থেকে বলে গেছেন শোষণ-বৈষম্যহীন সমাজের কথা।

তিনি ছিলেন প্রথম শহীদ মিনারের রূপকার। ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি বৃহস্পতিবার দুপুরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হোস্টেল প্রাঙ্গণে বাংলা ভাষার জন্য আন্দোলনকারীদের স্তব্ধ করে দিতে যে স্থানটিতে গুলি করা হয়েছিলো ঠিক সে স্থানটিতেই তার নির্দেশনায় নির্মিত হয় প্রথম শহীদ মিনার।

বহুমুখী প্রতিভার এক অনন্য উজ্জ্বল তারকা এবং নীতি নৈতিকতার আদর্শের প্রাণ পুরুষ ১৯২০ সালের ২০শে অক্টোবর নড়িয়া উপজেলার মোক্তারেরচর ইউনিয়নের পোড়াগাছা গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত্র পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন।

গ্রামের লোকেরা তাকে কালু বলে ডাকতো। তার বাবা আলহাজ আবদুল গফুর ঢালী এবং মা ছুটু বিবি। বাবা তৎকালীন ইউনিয়ন বোর্ডের প্রেসিডেন্ট ছিলেন। গ্রামের লোক তাতে বড়কর্তা বলে ডাকতো। বড়কর্তা ছিলেন গরিবের অকৃত্রিম বন্ধু।

ডা. গোলাম মাওলা জাজিরা থানার পাচুখার কান্দির প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে ৫ম শ্রেণী পাস করে নড়িয়া বিহারী লাল উচ্চবিদ্যালয়ে ষষ্ঠ শ্রেণীতে ভর্তি হন এবং এ স্কুল থেকে ম্যাট্রিক পাস করেন। ১৯৪১ সালে ঢাকার জগন্নাথ কলেজ থেকে আইএসসি এবং ১৯৪৩ সালে বিএসসি শেষ করেন। ঢাকা ও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ভূতত্ত্ব বিদ্যায় এমএসসি শেষে ১৯৪৬ সালে কলকাতা মেডিকেল কলেজে ভর্তি হন।

১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পা ঢাকা মেডিকেল কলেজে দ্বিতীয় বর্ষ এমবিবিএস কোর্সে ভর্তি এবং ১৯৫৪ সালে এমবিবিএস পাস করেন। ছাত্রাবস্থায় তিনি কলকাতায় ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েন এবং সেখানেই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে রাজনীতিতে অবদান রাখেন।

ব্রিটিশ শাসন থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য শৃঙ্খলিত মানুষের আন্দোলন, হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গার বীভৎস চেহারা, দেশ বিভাগের পর স্বদেশত্যাগী মানুষের দুঃখ-দুর্দশা, শাসক শ্রেণীর নিপীড়ন-অত্যাচার তাকে একজন মানবতাবাদী, আপসহীন নির্লোভ রাজনীতিবিদ হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভে তাড়িত করে।

১৯৫২ সালের অগ্নিঝড়া দিনগুলোতে ডা. গোলাম মাওলার ভূমিকা ছিলো অত্যন্ত উজ্জল ও গৌরবময়।১৯৫২ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি রাত্রে ঢাকা মেডিকেল কলেজ প্রাঙ্গণে রাষ্ট্রভাষা কর্মপরিষদের সভায় যে চারজন ছাত্রনেতা ১৪৪ ধারা ভঙ্গের পক্ষে মত দিয়েছিলেন তাদের মধ্যে ডা. গোলাম মাওলা অন্যতম।

২১ ফেব্রুয়ারি গুলিবর্ষণের পর সেদিন রাত ৯টায় মেডিকেল কলেজ ব্যারাকে ডা. আজমলের কোয়াটারে কর্মীদের যে সভা হয় সেখানে সভাপতিত্ব করেন ডা. গোলাম মাওলা। ওই সভায় ডা. গোলাম মাওলাকে আহ্বায়ক করে সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা কর্মপরিষদ পূনর্গঠিত হয়।

২৩ ফেব্রুয়ারি রাতে ডা. গোলাম মাওলার কথামতো ডা. বদরুল আলমের (ঢাকা মেডিকেল কলেজের মেধাবী ছাত্র) স্কেচ (ডিজাইন) অনুযায়ী হাসপাতালের প্রশাসনিক ভবন নির্মাণের জন্য আনা ইট, বালু, সিমেন্ট দিয়ে ডা. গোলাম মাওলা নিজে ডা. আলীম চৌধুরী, ডা. এসডি আহমেদসহ কয়েকজনকে সঙ্গে নিয়ে যে স্থানটিতে গুলি করে ছাত্র-জনতাকে হত্যা করে মৃতদেহ ফেলে রাখা হয়েছিলো সে স্থানটিতে নিজেরাই নির্মাণ করেন প্রথম শহীদ মিনার।

যদিও শহীদদের স্মৃতির উদ্দেশে নির্মিত প্রথম শহীদ মিনারটি ২৫ ফেব্রুয়ারি সরকারের পেটুয়া পুলিশ বাহিনী ভেঙে গুড়িয়ে ভীতসহ উপড়ে ফেলে গর্তে মাটি ভরাট করে নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছিল ।

তিনি ছাত্রজীবন শেষে সরাসরি আওয়ামী লীগে যোগদান করেন। ১৯৫৬ সালে শরীয়তপুর জেলার নড়িয়া থেকে আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থী হিসাবে নির্বাচিত এবং ১৯৬২ সালে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৪৮ সালে ভাষা আন্দোলন শুরু হওয়ার পর থেকে ১৯৫২ সালে আন্দোলনের চূড়ান্ত পর্ব পর্যন্ত তার সাংগঠনিক কার্যতৎপরতা, সততা, সাংগঠনিক ক্ষমতা, সিদ্ধান্তে অটল থাকার অঙ্গীকার ভাষা আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে।

অকুতোভয় এই সংগ্রামী নেতা ১৯৬৭ সালের ২৯শে মে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

বাঙালির ভাষা আন্দোলন আজ আন্তর্জাতিক মর্যাদা লাভ করেছে। বিশ্ববাসীর কাছে বাঙালির ভাষা আন্দোলনের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস পৌঁছে গেছে। সেই সঙ্গে পৌঁছে গেছে এই আন্দোলনের অন্যতম ভাষা সৈনিক ডা. গোলাম মাওলার নাম।তিনি বাঙালির কাছে চিরকাল স্মরণীয় ও বরণীয় হয়ে থাকবেন।

Loading...