বগুড়ার শেরপুরে বিদেশ ফেরত ৭৮ জনের ‘হদিস’ নেই

৭:১৫ অপরাহ্ণ | মঙ্গলবার, মার্চ ২৪, ২০২০ দেশের খবর, রাজশাহী

সাখাওয়াত হোসেন জুম্মা, বগুড়া প্রতিনিধি: বগুড়ার শেরপুর উপজেলায় ২৮ মার্চ মঙ্গলবার পর্যন্ত ১৭০ জন বিদেশ ফেরত ব্যক্তিদের নামের সন্ধান পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ১লা মার্চ থেকে দেশে ফেরার পর ৯২ জনের হদিস মিলেছে। তবে এই ৯২ জনের কোয়ারেন্টাইন কতটুকু নিশ্চিত করা হয়েছে তা নিয়েও সংশয় রয়েছে।

এদিকে পাওয়া যাচ্ছে না বাকি ৭৮ জনের হদিস। তারা বেশিরভাগই কোয়ারেন্টাইনের বাহিরে বিচ্ছিন্নভাবে চলাফেরা করে আসছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে সরকার ১৭০টি দেশের সাথে বিমান যোগাযোগ বন্ধ করে দেওয়ায় নতুন করে বিভিন্ন দেশ থেকে বাংলাদেশে প্রবেশের আর কোনো সুযোগ নেই।

শেরপুরে প্রবাসী বা বিদেশ ফেরত ব্যক্তিরা বেশিরভাগ ভারত, চীন, মালোয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, সৌদি আরব, দক্ষিণ কোরিয়া, ইটালীসহ বিভিন্ন দেশ থেকে ফিরেছেন বলে সংশ্লিষ্ট সুত্র থেকে জানা গেছে। উপজেলার প্রায় সকল ইউনিয়ন ও পৌরসভাতেই বিদেশ ফেরত ব্যক্তিরা ছড়িয়ে ছিটিয়ে অবাধে চলাফেরা করছেন এখনও।

অন্যদিকে গত বুধবার (১৮ মার্চ) থেকে একাধিক মোবাইল কোর্ট পরিচালনার মাধ্যমে কোয়ারেন্টাইন নিশ্চিত করণ অভিযান অব্যাহত রেখেছেন স্থানীয় উপজেলা প্রশাসন ও থানা-পুলিশ।

একদিকে শেরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো: লিয়াকত আলী সেখ ও সহকারী কমিশনার ভূমি জামসেদ আলাম রানা কোয়ারেন্টাইন নিশ্চিত করতে গত বুধবার থেকে বিভিন্ন এলাকায় আলাদা মোবাইল কোর্ট পরিচালনার মাধ্যমে জরিমানা সহ করোনা সন্দেহভাজনদের কোয়ারেন্টাইনের উপকারিতা সম্পর্কে অবগত করছেন।

অন্যদিকে শেরপুর থানার অফিসার ইনচার্জ মো: হুমায়ুন কবীর ও পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) মো: আবুল কালাম আজাদ এর সার্বিক তত্তাবধায়নে পুলিশ কর্মকর্তারাও সকল বিদেশ ফেরতদের কোয়ারেন্টাইন নিশ্চিত করার চেষ্টায় দিন-রাত কাজ করে যাচ্ছেন।

জানা গেছে, সরকারী ভাবে করোনা ভাইরাস পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার জন্য একটি জাতীয় নীতিমালা করা হয়েছে। নীতিমালার অংশ হিসেবে বিভাগীয়, জেলা, উপজেলা, পৌরসভা, ইউনিয়ন এবং ওয়ার্ড পর্যায়ে সংশ্লিষ্ট জনপ্রতিনিধিদের সমন্নয়ে কমিটি করে দেওয়া হয়েছে। কর্মপরিধি অনুযায়ী এই কমিটির কাজ হচ্ছে উপজেলা প্রসাশনের দেওয়া তালিকা অনুযায়ী বিদেশ থেকে কারা এসেছে, কোয়ারেন্টাইন মানছে কিনা খতিয়ে দেখা, যদি না মানে অনতিবিলম্বে প্রসাশনকে অবহিত করা।

তবে নজরদারি কম থাকায় বিদেশ ফেরতরা কোয়ারেন্টাইন এড়িয়ে অবাধে চলাফেরা করতে পারছেন বলে দাবি করেছেন স্থানীয়রা। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সবাইকে নজরদারির মধ্যে রাখা সম্ভব হচ্ছে না আমাদের। তবে আমাদের পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। তবে ব্যক্তি সচেতনতার উপর কিছু নেই বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট প্রসাশন।

তবে করোনা ভাইরাস নিয়ন্ত্রণ ও হোম কোয়ন্টোইন নিশ্চিত করণ প্রসঙ্গে শেরপুর উপজেলা প্রসাশন ও থানা পুলিশের কর্মকর্তারা বর্তমান পরিস্থিতি মোটামুটি নিয়ন্ত্রনে আছে বলে দাবি করেছেন।

তবে উপজেলা প্রসাশন, থানা-পুলিশ ও স্বাস্থ বিভাগ যথাক্রমে- উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো: লিয়াকত আলী সেখ, সহকারী কমিশনার ভূমি জামসেদ আলাম রানা, শেরপুর থানার ওসি মো: হুমায়ুন কবীর, পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) মো: আবুল কালাম আজাদ ও উপজেলা স্বাস্থ ও প: প: কর্মকর্তা মো: আব্দুল কাদের এই সকল কর্মকর্তাদের সাথে কথা বলে তাদের কাছ থেকে আলাদা আলাদা তথ্য পাওয়া গেলেও একটি কথায় মিল পাওয়া গেছে, পরিস্থিতি আমাদের নিয়ন্ত্রনে আছে। তবে তাঁরা এটাও জানান, ব্যক্তি সচেতনতার কোনো বিকল্প নেই।

বগুড়ার মোহাম্মদ আলী হাসপাতাল করোনা আইসোলেশন ইউনিটে রুপান্তরিত হচ্ছে

করোনাভাইরাসের জরুরী পরিস্থিতি মোকাবেলায় বগুড়া জেলা শহরের ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট মোহাম্মদ আলী হাসপাতালের পুরোটাকেই আইসোলেশন ইউনিট ঘোষণার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। দেশে করোনা পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত এই হাসপাতালে সাধারণ রোগীদের সব ধরনের চিকিৎসা কার্যক্রম বন্ধ থাকবে। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন সব রোগীকে দ্রুততম সময়ের মধ্যে বগুড়ার শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে সরিয়ে নেওয়া করা হবে।

২৩ মার্চ সোমবার বগুড়ার জেলা প্রশাসক ফয়েজ আহম্মেদের সভাপতিত্বে করোনাভাইরাস মোকাবেলায় প্রস্তুতি কার্যক্রম নিয়ে মতবিনিময় সভায় এ সিদ্ধান্ত গ্রহন করা হয়। একই সঙ্গে পরিস্থিতি মোকাবেলায় জেলার সরকারি হাসপাতালগুলোতে সাধারণ সর্দি-কাশি, জ্বর ও মাথাব্যথার চিকিৎসার বদলে টেলি মেডিসিন বা মুঠোফোনে স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম চালু রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বগুড়া মোহাম্মদ আলী হাসপাতালের আবাসিক কর্মকর্তা ডা. শফিকুল আমিন কাজল জানান, এখনও এই সংক্রান্ত সরকারি নির্দেশনা তারা হাতে পাননি। যে কারণে এখোনোও হাসপাতালের স্বাভাবিক কর্মকান্ড চলছে।

সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, জরুরি পরিস্থিতিতে জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ, শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও মোহাম্মদ আলী হাসপাতালের চিকিৎসক-নার্সরা সমন্বিতভাবে ২৫০ শয্যার আইসোলেশন ইউনিটে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসা সেবা দেবেন। তারা পালা করে ২৪ ঘণ্টা আইসোলেশন ইউনিটের দায়িত্ব পালনের পর ১৪ দিনের জন্য কোয়ারেন্টাইনে থাকবেন।

সভায় বলা হয়, নানা কারণে বগুড়া উল্টরাঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ একটি জেলা। জনসমাগম বেশি হওয়ার কারণে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ঝুঁকিও এখানে অনান্য স্থানের চাইতে বেশি। বিদেশ ফেরত ব্যক্তিরা যাতে কোনোভাবেই কোয়ারেন্টাইন ভঙ্গ না করেন সে জন্য প্রশাসনকে সর্বোচ্চ নজরদারি করতে হবে। সবাইকে দায়িত্বশীল ও সচেতন হতে হবে। বিনা প্রয়োজনে আগামী দুই সপ্তাহ জনসমাগম এড়িয়ে চলতে হবে।

প্রচারপত্র বিলি, স্যানিটাইজার, মাস্ক বিতরণের নামে রাজনৈতিক লোক দেখানো কর্মসূচি বন্ধ রাখার পরামর্শ দিয়ে বলা হয়, দলবলে প্রচারপত্র বিলিতে করোনাভাইরাস সংক্রমণের ঝুঁকি রয়েছে। তাছাড়া কাগজের তৈরি প্রচারপত্রের মাধ্যমেও করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়তে পারে। এসব কর্মসূচির বদলে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচার চালানো যেতে পারে।

সভায় বগুড়ার সিভিল সার্জন গউসুল আজিম চৌধুরী পরিস্থিতি মোকাবিলায় স্বাস্থ্য বিভাগের নানা পদক্ষেপের কথা তুলে ধরে বলেন, শাজাহানপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও মোহাম্মদ আলী হাসপাতালে ১০০ শয্যার আইসোলেশন ইউনিট খোলার উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল। কিন্তু শাজাহানপুরে নির্মাণ কাজ চলছে। এখন ভরসা মোহাম্মদ আলী হাসপাতাল।

মোহাম্মদ আলী হাসপাতালের সুপারিনটেনডেন্ট এ টি এম নুরুজ্জামান বলেন, মোহাম্মদ আলী হাসপাতালের চারদিকে আবাসিক ও ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা রয়েছে, রয়েছে সরকারি ওষুধের কারখানা। এখানে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত ব্যক্তিদের চিকিৎসা দেয়া ঝুঁকিপূর্ণ। আবার হাসপাতালে চিকিৎসক সংকটও রয়েছে। নেই আইসিইউ সুবিধা।