রোহিঙ্গা ক্যাম্পে করোনা নিয়ন্ত্রণে সেনাবাহিনীর ডিজইনফেকশন বুথ

১০:২৯ অপরাহ্ণ | শনিবার, মে ১৬, ২০২০ চট্টগ্রাম
sensa

চট্টগ্রাম প্রতিনিধি: বিশ্ব মহামারি করোনায় সবখানে আতঙ্ক, উদ্বিগ্নতায় স্থবির ও অচল সবকিছু। মানব জীবনকেই অমূল্য হিসেবে দেখছেন সবাই। বাংলাদেশেও করোনা নিয়ে উদ্বিগ্নতা শুরু থেকেই। পর্যটন শহর কক্সবাজার ও পৃথিবীর বৃহত্তর শরণার্থী শিবির রোহিঙ্গা ক্যাম্পকে করোনা মুক্ত রাখতে নানা পদক্ষেপ নিয়েছিল জেলা প্রশাসন।

সবার একাগ্রচিত্ততায় বিগত দু’মাসেরও অধিক সময় করোনার থাবা থেকে মুক্ত ছিল রোহিঙ্গা ক্যাম্প। কিন্তু গত বৃহস্পতিবার থেকে সেখানেও থাবা বসিয়েছে বর্তমান আতংক করোনা। প্রথমদিন একজন, পরের দিন দু’জন এবং শনিবার (আজ) আরো একজন রোহিঙ্গার করোনা পজেটিভ এসেছে।

কক্সবাজার মেডিকেল কলেজের ল্যাবে শনিবার (১৬ মে) ১৮৪ জনের স্যাম্পল টেস্টের মধ্যে ২৪ জনের রিপোর্ট ‘পজেটিভ’ এসেছে। রামুর পুরাতন একজন করোনা রোগীর ফলোআপ রিপোর্ট আবারো এসেছে ‘পজেটিভ’। বাকী ১৫৯ জনের রিপোর্ট ‘নেগেটিভ’ পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছন, মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ ডা. অনুপম বড়ুয়া।

তার মতে, শনিবার ‘পজেটিভ’ আসা ২৪জন করোনা রোগীর মধ্যে কক্সবাজার সদর উপজেলায় ৬ জন, চকরিয়া উপজেলায় ৮ জন, পেকুয়া উপজেলায় ১ জন, উখিয়া উপজেলায় ৭ জন এবং রোহিঙ্গা শরনার্থী ১জন ও বান্দারবানের লামা উপজেলায় ১জন রয়েছে। এনিয়ে কক্সবাজার জেলায় শনিবার (১৬ মে) পর্যন্ত করোনা আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৭৫ জনে।

ল্যাবের তথ্য মতে, চকরিয়া উপজেলায় ৬০ জন, কক্সবাজার সদর উপজেলায় ৪১ জন, পেকুয়া উপজেলায় ২২ জন, মহেশখালী উপজেলায় ১২ জন, উখিয়া উপজেলায় ২২ জন, টেকনাফ উপজেলায় ৭ জন, রামু উপজেলায় ৪ জন, কুতুবদিয়া উপজেলায় ২ জন এবং রোহিঙ্গা শরনার্থী ৪ জন।

অতীতের সব প্রাকৃতিক দুর্যোগের মতোই এবারো নির্ভীকচিত্তে মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। সামাজিক দূরত্ব বা হোম কোয়ারেন্টাইন নিশ্চিতের বৃত্তের ভেতরই নিজেদের বন্দি না করে মানবিক হৃদয় নিয়েই দেশের প্রতিটি জেলায় করোনার ছোবলে নিঃস্ব, অভাবী ও সুবিধা বঞ্চিত মানুষের পাশে সেনারা নিজেদের সমর্পণ করছেন।

এরই অংশ হিসেবে মার্চ মাস থেকে বেসমারিক প্রশাসনকে সহায়তায় কক্সবাজারের মাঠ-ঘাট চষে বেড়াচ্ছে সেনাবাহিনীর ১০ পদাতিক ডিভিশন। কক্সবাজারের পাশাপাশি বৃহত্তর চট্টগ্রামের ৪টি উপজেলায়ও একইভাবে কাজ করছেন সেনাসদস্যরা। গত ৮ এপ্রিল থেকে পর্যটন নগরী কক্সবাজারকে লকডাউন ঘোষণা করা হয়। লকডাউনের পর থেকে সেনাসদস্যরা দিন-রাত খাটছেন।

করোনার সংক্রমণ ধরা পড়ায় ঝুঁকির মুখে পড়েছে বৃহত্তম রোহিঙ্গা আশ্রয় শিবির সমূহ। এ পরিস্থিতিতে উখিয়া ও টেকনাফ এলাকায় জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত ১১ লাখ মায়ানমার নাগরিকদের ৩৪টি ক্যাম্পে করোনা ভাইরাস প্রতিরোধে সচেতনতা বৃদ্ধিতে নিরলসভাবে কাজ করছে সেনাবাহিনীর ১০ পদাতিক ডিভিশনের সেনাসদস্যরা। অবশ্য করোনা রোগী শনাক্ত হওয়ার আগে থেকেই সেনা সদস্যরা সচেতনতামূলক তৎপরতা পরিচালনা করছে।

রামু সেনানিবাসের গণমাধ্যম সমন্বয়ক মেজর তানজিল জানিয়েছেন, করোনা রোধে ক্যাম্পে সামাজিক দূরত্ব, লকডাউন নিশ্চিতে সেনাবাহিনীর টহল ও চেকপোস্টের কার্যক্রম বহুগুনে বৃদ্ধি করা হয়েছে। রোহিঙ্গা ক্যাম্পের প্রবেশদ্বার উখিয়াতে ডিজইনফেকশন বুথ স্থাপন করে সকল গাড়ী জীবাণুমুক্ত করে প্রবেশ করানো হচ্ছে।

ইতোমধ্যে করোনা আক্রান্ত রোহিঙ্গাদের সংস্পর্শে আসা পরিবার ও অন্য ব্যক্তিদের কোয়ারেন্টিন নিশ্চিতসহ জায়গাগুলো লকডাউন করা হয়েছে। আক্রান্তদের সংস্পর্শে আসা রোহিঙ্গাদের লকডাউনের আওতায় আনা হয়েছে। সংক্রমণ রোধে ইতিমধ্যে ওই ব্লকের এক হাজার ২৭৫ টি ঘর রেড মার্ক করে লাল পতাকা দিয়ে লকডাউন করা হয়েছে।

দেখা যায়, করোনা ভাইরাস প্রতিরোধে সেনাবাহিনীর নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় রোহিঙ্গা ক্যাম্পের প্রবেশদ্বারে উখিয়াতে ডিজইনফেকশন বুথের মাধ্যমে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্য সামগ্রী বহনকারী ছোট বড় সকল যানবাহন, জরুরী প্রয়োজনে প্রবেশকৃত গাড়ি সমূহকে জীবাণুমুক্ত করার পাশাপাশি প্রত্যেক গাড়ীর বারকোড স্ক্যান করে শুধুমাত্র আরআরআরসি’র অনুমতিপত্র সাপেক্ষে প্রবেশ করতে দিচ্ছেন সেনাসদস্যরা।

পাশাপাশি সেনাসদস্যরা ক্যাম্পসমূহে মাইকিং করে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়া করোনা ভাইরাস প্রতিরোধে সম্যক জ্ঞান ও সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে বিনা প্রয়োজনে ক্যাম্প থেকে বের না হতে সকলকে অনুরোধ জানাচ্ছেন। পাশাপাশি বেশি বেশি হাত ধোয়া, মাস্ক ব্যবহার ও সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখাসহ বিভিন্ন স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে অনুরোধ করছেন।

ক্যাম্পে আতঙ্ক না ছড়িয়ে সকলকে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন থাকার আহ্বান জানানোর পাশাপাশি মায়ানমার নাগরিক ক্যাম্প এলাকায় স্থাপিত সেনাবাহিনীর চেকপোস্ট সমূহে নজরদারি বৃদ্ধি করা হয়েছে। বহুগুণে বৃদ্ধি করা হয়েছে যৌথ টহল কার্যক্রমের পরিধি। বিধি নিষেধ আরোপ করা হয়েছে বহিরাগতদের চলাচলেও।

অন্যদিকে শরণার্থী ক্যাম্পে মোতায়েনকৃত সেনা ক্যাম্প সমূহের তত্ত্বাবধানে রোহিঙ্গা মাঝি ও স্বেচ্ছাসেবকদের সাথে বৈঠক অব্যাহত রয়েছে। এছাড়া গত ১৪ মে উখিয়ায় সেনাবাহিনীর কর্ড সেলে টাস্কগ্রুপের তত্বাবধানে রয়েছে আইএসসিজি ও অন্যান্য দেশী-বিদেশী এনজিও সমূহের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা।