সুন্দরবন বুক পেতে না দিলে এবার ঢাকাও লন্ডভন্ড হতো

১০:২৫ পূর্বাহ্ণ | শুক্রবার, মে ২২, ২০২০ ফিচার

সময়ের কণ্ঠস্বর ডেস্ক- আইলা, সিডর, ফণি, বুলবুল, আম্পান-আর কত শত্রুর সঙ্গে যুদ্ধ করবে? প্রিয় বাংলাদেশকে রক্ষা করতে আর কত চিতিয়ে বুক বাড়িয়ে দেবে? সুন্দরবন তো আমাদের দেখছে, আমরা কী সুন্দরবনকে দেখছি!

প্রলংকারী ঘূর্ণিঝড় সিডর, আইলা, ফণি ও বুলবুল ক্ষত কাটতে না কাটতেই আবারও মায়ের আঁচলের মতো বুক পেতে উপকূলীয় এলাকার মানুষ ও সম্পদ রক্ষা করেছে সুন্দরবন। বাঘের মতো তর্জন-গর্জন করে আসা ঘূর্ণিঝড় আম্পানের আঘাতে নিজে ক্ষত-বিক্ষত হলেও উপকূলের তেমন ক্ষতি হতে দেয়নি।

আজ ২২ মে বিশ্ব জীববৈচিত্র্য দিবস। এই সময়ে আবারও সুন্দরবন প্রমাণ করল এটি বাংলাদেশের জীববৈচিত্রের সবচেয়ে বড় আধারই শুধু না, তা আমাদের প্রাকৃতিক রক্ষাকবচও।

দুর্যোগ ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সুন্দরবন না থাকলে কলকাতা শহরে ঘূর্ণিঝড় আম্পান যে তাণ্ডব চালিয়েছে, একই পরিণিত হতো ঢাকাসহ আশপাশের গুরুত্বপূর্ণ শহরগুলোর। গতকাল পর্যন্ত পশ্চিবঙ্গে ৭০ জন এবং বাংলাদেশে অন্তত ২১ জন মারা যাওয়ার খবর পাওয়া গেছে। ঘূর্ণিঝড়ের সময় ঢাকায় বাতাসের গতিবেগ ছিল ঘণ্টায় ৭২ কিলোমিটার, আর কলকাতায় ছিল ১১২ কিলোমিটার। তাই সুন্দরবন না থাকলে ঢাকাতেই ১০০ কিলোমিটারের বেশি গতি নিয়ে ঝড়টি চলে আসত।

তবে ওই ঝড়ের কারণে সুন্দরবনের বেশ ক্ষতি হয়েছে। বন বিভাগের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, ঘূর্ণিঝড় সিডর ও আইলার মতো এবারও সুন্দরবনের মিষ্টি পানির উৎস ৬৫টি পুকুর, বন বিভাগের ১৮টি টিনের তৈরি ফাঁড়ি, ২৮টি জেটিসহ অন্যান্য অবকাঠামোর ক্ষতি হয়েছে। কেওড়াসহ বিভিন্ন গাছও ভেঙে পড়েছে। সুন্দরবনের সাতক্ষীরা ও খুলনা এলাকায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে। মোট ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ করতে চার সদস্যের একটি কমিটিও করেছে বন বিভাগ।

এ বিষয়ে প্রধান বন সংরক্ষক আমীর হোসেন চৌধুরী বলেন, ‘বনের মধ্যে যেসব পুকুর লবণাক্ত হয়ে পড়েছে সেগুলো শুধু বন বিভাগের কর্মীদের মিষ্টি পানির প্রধান উৎস না, বনের বাঘ, হরিণ, বানর ও অন্যান্য বন্য প্রাণী সেখান থেকে খাবার পানি পায়। ফলে আমরা দ্রুত পুকুরগুলো লবণপানিমুক্ত করার পরিকল্পনা করছি। তবে প্রতিবারই সুন্দরবন নিজে ক্ষত সয়ে আমাদের রক্ষা করছে।’

ঘূর্ণিঝড় আম্পানের ছোবল থেকে উপকূলীয় এলাকা রক্ষায় সুন্দরবন যে ঢাল হিসেবে কাজ করেছে সেই ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে সুন্দরবন একাডেমির নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক আনোয়ারুল কাদির বলেন, সুন্দরবন দিয়ে অতিক্রম করায় আম্পানের তাণ্ডব কিছুটা কম হয়েছে। বরাবরের মতো এবারও উপকূলীয় এলাকার মানুষ ও সম্পদ রক্ষা করতে বুক চিতিয়ে লড়াই করলো সুন্দরবন।

তিনি বলেন, ভারত থেকে আম্পান যে গতি নিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছিল তার প্রভাব সেভাবে পড়তে পারেনি বনের গাছপালায় এই ঝড় বাঁধা পাবার কারণে। ভারতের সুন্দরবনের অংশের চেয়ে বাংলাদেশ অংশে গাছ ঘন থাকায় ঘূর্ণিঝড়ের বাতাস বাধাপ্রাপ্ত হয়ে অপেক্ষাকৃত কম গতি নিয়ে খুলনাসহ উপকূলীয় অঞ্চলে আঘাত হানে।

শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড় ঠেকাতে এর আগেও ঢাল হিসেবে কাজ করেছে সুন্দরবন। বিশেষ করে ২০০৭ সালের ১৫ নভেম্বর ঘূর্ণিঝড় সিডর এবং ২০০৯ সালের ২৫ মে ঘূর্ণিঝড় আইলার তাণ্ডব থেকে এই বন উপকূলকে রক্ষা করেছে।

সেই ঝড়ে সুন্দরবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল অনেক বেশি। তবে কয়েক বছরের মধ্যে প্রাকৃতিক নিয়মে অনেকখানি সামলে ওঠে সুন্দরবন। এরমধ্যে গতবছরের শেষ দিকে ঘূর্ণিঝড় বুলবুলও এসেছিল একই পথ ধরে, তখনও ঢাল হয়ে ছিল সুন্দরবন।