“আন্তর্জাতিক জীববৈচিত্র্য দিবস”: হুমকির মুখে পৃথিবীর জীববৈচিত্র‍্য

১০:১৫ অপরাহ্ণ | শুক্রবার, মে ২২, ২০২০ ফিচার
bau

জীববৈচিত্র‍্য বাংলাদেশ তথা সমগ্র বিশ্বের মূল্যবান সম্পদ। বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের বেঁচে থাকার জন্য জীববৈচিত্র‍্য অনস্বীকার্য। সারা বিশ্বে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ঝুঁকি মোকাবেলায় জীববৈচিত্র‍্য সংরক্ষণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। স্বাধীনতার পর ১৯৭৪ সালে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জীব বৈচিত্র‍্য ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার জন্য দূষণ নিয়ন্ত্রণ সেল ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইন প্রণয়ন করেন।

এরই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশ ১৯৯২ সালের ২২ মে কেনিয়ার রাজধানী নাইরোবিতে বায়োডাইভার্সিটি (সিবিডি) চুক্তিতে স্বাক্ষর করে। এরপর ৫ জুন ১৯৯২ সালে ব্রাজিলের রিও ডি জেনিরোতে জাতিসংঘের পরিবেশ কর্মসূচীর ধরিত্রী সম্মেলনে সিবিডি বিভিন্ন দেশের স্বাক্ষরের জন্য উন্মুক্ত করা হয়। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বিশ্বের প্রায় ১৬৮ টি দেশ সিবিডি চুক্তিতে স্বাক্ষর করে এবং সিবিডি ওই বছরের ২৯ ডিসেম্বর থেকে কার্যকর হয়। বর্তমানে এই চুক্তিতে স্বাক্ষরকারী দেশের সংখ্যা ১৯৫ টি।

জীববৈচিত্র‍্য সম্পর্কে সচেতনতা তৈরির লক্ষ্যে ২৯ ডিসেম্বর কে “আন্তর্জাতিক জীববৈচিত্র‍্য দিবস” হিসেবে ২০০০ সাল পর্যন্ত পালন করা হয়। কিন্তু ডিসেম্বর শেষ সপ্তাহে নানা ধরনের ছুটি থাকায় ২০০০ সালের পর থেকে প্রতিবছর ২২ মে বিশ্বব্যাপী এ দিবসটি পালনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। বর্তমান সময়ে শিল্প ও বিজ্ঞানের অভূতপূর্ব উন্নতির ফলে আবিষ্কৃত হচ্ছে নিত্যনতুন প্রযুক্তি। আধুনিক প্রযুক্তির যথেচ্ছ ব্যবহার এবং ক্রমাগত শিল্পায়ন ও নগরায়নের ফলে পরিবেশে অতিমাত্রায় নিঃসরিত হচ্ছে গ্রীন হাউজ গ্যাস। যার ফলে পরিবেশ দূষিত হচ্ছে এবং জীববৈচিত্র‍্য হুমকীর সম্মুখীন হচ্ছে।

পৃথিবীর ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার প্রয়োজনীয় চাহিদা মেটানো এবং নির্বিচারে বনাঞ্চল উজাড় করার ফলে বিলুপ্ত হচ্ছে অনেক প্রজাতির উদ্ভিদ ও প্রাণি। সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাজ্যের রয়াল বোটানিক গার্ডেন ও কিউ এবং স্টকহোম বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানীদের এক গবেষণায় দেখা গেছে গত ২৫০ বছরে পৃথিবী থেকে প্রায় ৫৭১ প্রজাতির উদ্ভিদ এবং একই সময়ে পশু, পাখি ও সরীসৃপ মিলিয়ে বিলুপ্তি প্রজাতির সংখ্যা প্রায় ২১৭।

সিবিডি কার্যক্রমের শুরুর দিকে পৃথিবীব্যাপী জীববৈচিত্র‍্য সংরক্ষণের ব্যাপারে দৃশ্যমান কোন অগ্রগতি হয় নি। সেই কারণে ২০১০ সালে জাপানের আইসিতে অনুষ্ঠিত সিবিডির সাধারণ সভায় ২০১১-২০২০ সাল পর্যন্ত ১০ বছর মেয়াদী পাঁচটি সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য স্থির করা হয়। লক্ষ্যগুলো হচ্ছে- জীববৈচিত্র‍্য হ্রাসের কারণ নির্ণয়, জীববৈচিত্র‍্যের ওপর প্রত্যক্ষ চাপ কমানো, বাস্তুতান্ত্রিক প্রজাতি ও জেনেটিক বৈচিত্র‍্য রক্ষা করা, জীববৈচিত্র‍্য ও বাস্তুতন্ত্র থেকে প্রাপ্ত সেবাগুলো সবার জন্য বৃদ্ধি করা, অংশগ্রহণমূলক পরিকল্পনা এবং জ্ঞান ব্যবস্থাপনা ও সক্ষমতা বৃদ্ধি করা।

তারই ধারাবাহিকতায় জীববৈচিত্র‍্য সংরক্ষণ ও জনসচেতনতা গড়ে তোলার লক্ষ্যে “জাতীয় জীববৈচিত্র‍্য কৌশল ও কর্মপরিকল্পনা (এনবিএসপি ২০১৬-২০২০)” প্রণয়ন ও সংশোধন করা হয়েছে। পরিবেশের ঝুঁকি মোকাবেলা ও জীববৈচিত্র‍্য রক্ষার জন্য জনসাধারণের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নের জন্য সরকার গৃহীত প্রতিটি উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি এবং পরিবেশ, প্রতিবেশ ও জীববৈচিত্র‍্য রক্ষার বিষয়টি প্রাধান্য পাচ্ছে।

জীববৈচিত্র‍্য পৃথিবীর রক্ষা কবচ হিসেবে কাজ করে থাকে। দক্ষিণ আমেরিকা মহাদেশে অবস্থিত পৃথিবীর অন্যতম জীববৈচিত্র‍্য সমৃদ্ধ আমাজান রেইনফরেস্ট পৃথিবীর প্রায় ২০% অক্সিজেন সরবরাহ করে থাকে। কিন্তু অতীব পরিতাপের বিষয় পৃথিবীর ফুসফুস খ্যাত সর্ববৃহৎ এই রেইনফরেস্ট অপরিকল্পিত বৃক্ষনিধনের ফলে আগামী ৫০ বছরের মধ্যে বিলীন হয়ে যেতে পারে। এছাড়াও বাংলাদেশে অবস্থিত পৃথিবীর সর্ববৃহৎ ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট এবং ইউনেস্কো কর্তৃক স্বীকৃত বিশ্ব প্রাকৃতিক ঐতিহ্যবাহী স্থান সুন্দরবনের অস্তিত্বও আজ নানাবিধ কারণে হুমকির সম্মুখীন। তাই পৃথিবী নামক গ্রহটির অস্তিত্ব রক্ষায় এবং আগামী প্রজন্মের জন্য এই ধরিত্রীকে বসবাস উপযোগী করে গড়ে তোলার জন্য জীববৈচিত্র‍্য সংরক্ষণের গুরুত্ব অনস্বীকার্য।

লেখক- মো: মাসুদ রানা
লেকচারার, কৃষি সম্প্রসারণ শিক্ষা বিভাগ
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ।