করোনাকালে “এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট” হিসেবে দায়িত্ব পালনের গল্প

১০:৪৪ অপরাহ্ণ | রবিবার, মে ২৪, ২০২০ ফিচার
corona

এস আহমেদ ফাহিম,নোবিপ্রবি প্রতিনিধি: নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (নোবিপ্রবি) এর কম্পিউটার সায়েন্স এন্ড টেলিকমিউনিকেশন ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী নিরুপম মজুমদার। তিনি ৩৭ তম বিসিএসে প্রশাসন ক্যাডারে উত্তীর্ণ হন। বর্তমানে তিনি সহকারী কমিশনার ও এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে বরিশাল জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে কর্মরত আছেন।

করোকালীন সময়ে দায়িত্বপালন, দায়িত্বপালনের অভিজ্ঞতা সহ বিভিন্ন বিষয়ে সময়ের কণ্ঠস্বরের সাথে কথা বলেছেন নিরুপম মজুমদার।

সময়ের কণ্ঠস্বর: করোনার এই সময়ে নিজেকে কীভাবে মানসিকভাবে ভালো রেখেছেন?

নিরুপম মজুমদার: করোনা সবার উপর অদৃশ্য একটা চাপ সৃষ্টি করেছে। অচেনা এবং অদৃশ্য শত্রুর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে গিয়ে আমাদের প্রশাসনের অনেকেই আক্রান্ত হয়েছেন। তাদের দেখে অনুপ্রেরণা পেয়েছি। কখনো পিছিয়ে যাওয়ার কথা মাথায় আসেনি। যেহেতু আগে থেকেই মানুষের পাশে দাঁড়ানোর, মানুষের সেবা করার ইচ্ছে ছিলো তাই অধৈর্য্য হই নি। তবে অবসর সময়টুকু বই পড়েছি। তা অনেকাংশে মানসিক চাপ কমিয়েছে। এছাড়া আপনজনদের খোঁজ খবর নেওয়া, পুরানো বন্ধুত্বের স্মৃতিচারণ এবং হারিয়ে যাওয়া সম্পর্কগুলো ঝালাই করে সময়টা খারাপ কাটেনি। নিজেকে চাঙা রাখতে কয়েকটা গাছ কিনেছিলাম, ওগুলোর পরিচর্যা করা প্রতিদিনের একঘেয়েমি থেকে মুক্তি দিচ্ছে।

সময়ের কণ্ঠস্বর: করোনা কালীন দায়িত্বপালন কতটা চ্যালেঞ্জিং বলে মনে করেন?

নিরুপম মজুমদার: স্বাভাবিক সময়ে দায়িত্ব পালন থেকে সম্পূর্ণ আলাদা অভিজ্ঞতায় ভরপুর করোনা কালীন সময়টা। শুরুতেই আমরা লোকজনকে ঘরে রাখতে তাদের কাছে গিয়ে গিয়ে বুঝাতাম। মাস্ক পরা এবং সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করতে খুব খাটতে হয়েছে। লকডাউন কার্যকর করতে রেগুলার মোবাইল কোর্ট পরিচালনা, দ্রব্যমূল্যের দাম নিয়ন্ত্রণে বাজার মনিটরিং, টিসিবির পণ্যের সঠিক ব্যবস্থাপনা এবং ত্রাণ পৌঁছে দেওয়ার মতো কাজ করতে হয়েছে। এগুলো যথেষ্ট চ্যালেঞ্জিং ছিলো। এবং নিজে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা যে ছিলো না তা নয়, বরং তা সত্ত্বেও চ্যালেঞ্জ নিয়ে কাজ করার দৃঢ় মনোবল সব সময় ছিলো।

সময়ের কণ্ঠস্বর: করোনাকালীন দায়িত্বপালনে অভিজ্ঞতা কেমন?

নিরুপম মজুমদার: স্বল্প সময়ে বেশ কিছু অভিজ্ঞিতা অর্জন করা হলো। প্রতিটা মানুষ যেন এক একটা গল্প। ভালো খারাপ মিলিয়ে বিভিন্ন ধরনের ঘটনার সম্মুখীন হয়েছি। এর মধ্যে টিবিসির পণ্য বিক্রয়ে অনিয়ম করতে দেখা যায়। দোষী ব্যক্তিকে শাস্তির আওতায় আনাটা একটা অভিজ্ঞতা।তাছাড়া ত্রাণ দিতে গিয়ে মানুষজনের আবেগ দেখে আবেগাক্রান্ত হয়েছি। মানুষের মুখের হাসি অমূল্য। আবার বহুজনকে পেয়েছি বিনা প্রয়োজনে বাইরে ঘোরাঘুরি করে। এছাড়া বাজার মনিটরিং করতে গিয়ে বুঝলাম দুর্যোগকালীন সময়েও কতিপয় অসাধু ব্যবসায়ী পণ্যের অধিক দাম রাখে। দুর্যোগের মধ্যেও লোভে পড়ে নিত্যপণ্যের অযথা দাম বাড়ানো দেখে হতবাক হয়েছি।

সময়ের কণ্ঠস্বর: করোনাকালীন দায়িত্বপালনে বাইরের পরিবেশ কেমন দেখছেন?

নিরুপম মজুমদার: প্রতিদিন দেখা জীবনটা কয়েক দিনেই পাল্টে দিয়েছে করোনা ভাইরাস। মানুষ আতংকিত, বিমর্ষ, দিশেহারা। কিন্তু তারপরেও পেটের তাগিদে মানুষ বাইরে বেরিয়ে এসেছে। তবে সবচেয়ে বেশি খারাপ অবস্থায় দেখেছি পথের মধ্যে পড়ে থাকা ঘর বাড়িহীন মানুষ, পথশিশু, ভবঘুরে, ভিক্ষুকদের। আমাদের কর্মব্যস্ত বরিশাল লঞ্চ ঘাটটা নিথর হয়ে আছে। কয়েক হাজার মানুষের মুখে ভাত তুলে দিত এই লঞ্চঘাট, অথচ এখন জনশুন্য। মানুষ অকারণে ভিড় জমাতে চাইতো টিস্টলে। তবে কিছুদিন লক ডাউন খুব ভাল ভাবে কার্যকর হয়েছে। পরে মানুষ বুঝতে পেরে নিজেরাই ঘর থেকে বের হওয়া ছেড়ে দিয়েছে। কিন্তু, এক শ্রেণীর মানুষ করোনার আতংক বাদ দিয়ে ছোট শিশু নিয়ে পর্যন্ত বাজারে এসেছে। একটা কথা বলতে হবে একদিকে আমাদের দারিদ্রতা অন্যদিকে অসচেতনতা পরিস্থিতি কিছুটা খারাপ করেছে।

সময়ের কণ্ঠস্বর: দায়িত্বপালনে জনসাধারণের সহযোগিতা কেমন পাচ্ছেন?

নিরুপম মজুমদার: ব্যপারগুলো কিছুটা আপেক্ষিক! জনসাধারণ আমাদের পাশে ছিলেন কিন্তু তাদের বুঝাতে সময় লেগেছে করোনার ভয়াবহতা। বারবার তাদের কাছে গিয়ে অনুরোধ করতে হয়েছে ঘরে থাকার জন্য। সরকারী আদেশ অমান্য করে অনেক দোকান খোলা রাখা হয়েছিল। কিন্তু তারা বুঝতে পারছিলো না এতে করোনা ছড়িয়ে পড়বে। এতো তৎপরতার পরে মাঝেমধ্যে হতাশা ভিড় করে যখন দেখি মহামারীটাকে জনতা ছেলে খেলা হিসেবে নিয়েছে। আইন অমান্য করে ঘুরছে শপিং মলে, বাজারে যেখানে সামাজিক দূরত্বের কোন বালাই নেই।

সময়ের কণ্ঠস্বর:জনসাধারণের উদ্দেশ্যে করোনা মোকাবিলায় আপনার পরামর্শ?

নিরুপম মজুমদার: জনসাধারণকে বলতে চাই প্রশাসন তাদের পাশে ছিলো, আছে, থাকবে। তাদের যে কোন সেবায় প্রশাসন নিবেদিত। তবে তাদেরকেও সাহায্য করতে হবে। সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করতে হবে এবং যতটা সম্ভব ঘরে থাকতে হবে, অপ্রয়োজনে বাইরে ঘুরাঘুরি করা একদম ঠিক হবে না। আগে জীবন বাঁচুক, পৃথিবী সুস্থ হোক সব করা যাবে। এবং, আর একটা বিষয় জনতাকে সহনশীল হতে হবে, ভেঙে পড়া যাবে না।

সময়ের কণ্ঠস্বর: বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া শিক্ষার্থীদের জন্য আপনার পরামর্শ?

নিরুপম মজুমদার: বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া শিক্ষার্থীদের কাছে প্রত্যাশা অনেক। চাইলেই তারা অনেক কিছু করতে পারবে। তারা প্রতিনিয়ত বিশ্বের অন্যান্য দেশের খবরাখবর রাখছে, করোনায় মৃতের সংখ্যা দেখছে। আমার মনে হয় তারা এগুলো ভালো বিশ্লেষণ করতে পারবে এবং অনলাইন মিডিয়াতে তারা এ বিষয়ে কথা বলছে। প্রতি ঘরে ঘরে একজন সচেতন হলে রুখে দেওয়া যাবে এই দুর্যোগ। তরুণেরা অবসর সময় কাজে লাগিয়ে নতুন কিছু শিখতে পারে, বই পড়তে পারে।

এছাড়া অনেক দিন সময়ের অভাবে যে কাজগুলো ফেলে রেখেছিলো তা অবশ্যই শেষ করা উচিত। পরিবারের সদস্যদের সাথে সময় কাটানোর পাশাপাশি তাদের কাছে তুলে ধরতে হবে করোনার ভয়াবহতা। আর একটা ব্যপার তারা খেয়াল রাখতে পারে- এ সময় নারী নির্যাতন, শিশু নির্যাতনের ঘটনা যেন না ঘটে এবং পারিবারিক কলহ যেন কোন অবস্থাতেই না হয় সেদিকে কড়া চোখ রাখতে হবে।

আমাদের এই ইদের খুশিটা যেন শেষ না হয়, করোনা যেন কেড়ে নিতে না পারে আর একটিও প্রাণ সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। বেঁচে থাকার ইচ্ছেতে ইদটা বাসাতে কাটাতে হবে, বন্ধুদের খোঁজ অনলাইনে রাখতে হবে, শুভেচ্ছা বিনিময়ে তাতে কোন ভাটা পড়বে না। আমরা দূরে থাকি, সুস্থ থাকি।