দুমাস ধরে মাঝ সাগরে জাহাজে আটকে আছে আরও সাড়ে আটশো রোহিঙ্গা

১০:১১ পূর্বাহ্ণ | বৃহস্পতিবার, মে ২৮, ২০২০ ফিচার

সময়ের কণ্ঠস্বর ডেস্ক- প্রায় সাড়ে আটশো রোহিঙ্গা শরণার্থীকে নিয়ে আরেকটি বড় জাহাজ গত দুমাস ধরে সাগরে ভেসে বেড়াচ্ছে বলে খবর পাওয়া যাচ্ছে।

মালয়েশিয়া যাওয়ার জন্য এই জাহাজে উঠেছিলেন এমন চারজনের পরিবারের সাথে বিবিসি টেলিফোনে কথা বলতে পেরেছে। তারা প্রত্যেকেই জানিয়েছেন, মালয়েশিয়ায় ঢুকতে না পারার পর এই জাহাজটি সাগরে ভেসে বেড়াচ্ছে। মানবপাচারকারী দালাল চক্রের সূত্রে জাহাজটি মিয়ানমারের উপকূলে রেঙ্গুনের কাছাকাছি কোথাও আছে বলে তারা জানতে পেরেছেন।

দুমাস ধরে এই জাহাজে থাকা আত্মীয়-পরিজনদের কোন খোঁজখবর না পেয়ে চারটি পরিবারই ভীষণ উদ্বিগ্ন। গত এপ্রিলে রোহিঙ্গা শরণার্থী বোঝাই আরও দুটি জাহাজ একইভাবে মালয়েশিয়ায় ঢুকতে ব্যর্থ হয়ে বাংলাদেশে ফিরে এসেছিল। সেই দুটি জাহাজে মারা গিয়েছিল বহু শরণার্থী।

টেকনাফের নয়াপাড়া ক্যাম্পের শরণার্থী হালিমা খাতুন জানান, তার ছেলে মাহমুদুল্লাহ (১৮) এই জাহাজে উঠেছিল মালয়েশিয়া যাওয়ার জন্য। তারপর গত দুই মাসের বেশি সময় ধরে আর কিছুই জানেন না ছেলে কোথায়-কেমন আছে।

হালিমা খাতুনের ছয় ছেলে-মেয়ের মধ্যে মাহমুদুল্লাহই একমাত্র পুত্র সন্তান।

‘আমার ছেলে গিয়েছে আজ দুই মাস পাঁচদিন হলো। ছেলে যে এখন কোথায় আছে কিছু্ই জানি না। একবার শুনি ওরা ইন্দোনেশিয়ার কাছাকাছি কোথাও, আবার শুনি রেঙ্গুনের কাছে। আবার শুনি থাইল্যান্ডের কাছে।’

হালিমা খাতুন জানান, দালালকে প্রায় চল্লিশ হাজার টাকা দিতে হয়েছিল ছেলেকে মালয়েশিয়া পাঠানোর জন্য। সেই দালালরা এখন আবার টাকা দাবি করছে তার ছেলেকে মালয়েশিয়ায় নামিয়ে দেয়া হবে এমন প্রতিশ্রুতি দিয়ে।

এই জাহাজে নয়াপড়া ক্যাম্পের আরও যাদের স্বজনরা আছে, তাদের কাছ থেকে নানা আশংকার কথা শুনেছেন হালিমা খাতুন।

‘কেউ বলছে জাহাজে লোকজন মারা যাচ্ছে, বহু মানুষের শারীরিক অবস্থা খুব খারাপ। আমরা খুব চিন্তায় আছি।’

নয়াপাড়ার কেবল একটি ক্যাম্প থেকেই ২৭টি পরিবার এই জাহাজে উঠেছিল বলে সেখানকার কয়েকজন শরণার্থী জানিয়েছেন।

নয়াপাড়া ক্যাম্পের আবদুল খালেক জানান, তার নিজের মামাতো বোন ওই জাহাজে চড়েছিল মালয়েশিয়া যাওয়ার জন্য। প্রায় এক মাস আগে তার সঙ্গে সর্বশেষ যোগাযোগ হয়। তারপর থেকে আর কোন খবর পাচ্ছেন না। সর্বশেষ খবর অনুযায়ী, জাহাজটি তখন মিয়ানমারের উপকূলের কাছে ঘোরাঘুরি করছিল।

আবদুল খালেক বলেন, ‘কিছুদিন আগে উদ্ধার করা যে রোহিঙ্গাদের এখন ডেঙ্গার চরে রাখা হয়েছে, তারা নাকি বলছে, জাহাজটি রেঙ্গুনের কাছেই আছে। দিনের বেলায় জাহাজটি গভীর সমুদ্রে থাকে। রাতে এটি ফিরে আসে উপকূলের কাছে। যাতে নৌবাহিনি বা কোস্টগার্ড তাদের ধরতে না পারে।’

তিনি বলেন, যাদের আত্মীয়-স্বজনরা এই জাহাজটিতে আছে, তাদের ঘরে ঘরে এখন কান্নার রোল। ‘আমাদের মা বোনরা অনেক কান্নাকাটি করছে, আত্মীয়স্বজনরা অনেক কান্নাকাটি করছে।’

নয়াপাড়া ক্যাম্পের বাসিন্দা ইউসুফ আলীর মেয়ে খাদিজাও (১৮) আছেন একই জাহাজে। ‘আমার মেয়ে গেছে আজ দুইমাস তিনদিন। আজ পর্যন্ত কোনো খবর পাইনি মেয়ের‍‍।’

তসলিমার ছেলে (১৭) এবং ভাইয়ের স্ত্রী এক সঙ্গে এই জাহাজে উঠেছিলেন।

‘আমার ছেলে যাওয়ার পর দুই মাস চারদিন হয়েছে আজ। এর মধ্যে আর কোন খবর পাইনি, কোন যোগাযোগ নেই। দালালও আর ফোন ধরছে না। আমি শুনেছি, ওরা মালয়েশিয়া পর্যন্ত গিয়ে আবার ফিরে এসেছে।’

বাংলাদেশের রোহিঙ্গা শিবিরগুলো থেকে মানবপাচার চক্রের মাধ্যমে এভাবে সমুদ্রপথে মালয়েশিয়ায় যাওয়ার ঘটনা এর আগে বহু ঘটেছে। এই শরণার্থীদের অনেকে সাগরে ডুবে অথবা জাহাজেই খাবার ও পানির অভাবে মারা গেছেন।

গত ১৪ই এপ্রিল বাংলাদেশের টেকনাফ উপকূলে এসে পৌঁছেছিল ৩৯৬ জন রোহিঙ্গা বোঝাই এক বিরাট নৌকা। শরণার্থীরা জানিয়েছিলেন, মালয়েশিয়ায় ঢুকতে ব্যর্থ হওয়ার পর তারা দুই মাস এই নৌকাতেই মাঝ সাগরে আটকে ছিলেন। সেখানে মারা গিয়েছিল প্রায় ৫০ জন মানুষ। তাদের লাশ সাগরে ফেলে দেয়া হয়েছিল।