করোনা ঠেকাতে পুরোপুরি লকডাউন দেশের ৫০ জেলা, আংশিক ১৩ জেলা

৯:১৮ পূর্বাহ্ণ | রবিবার, জুন ৭, ২০২০ ফিচার

সময়ের কণ্ঠস্বর ডেস্ক- করোনা মহামারীর বিস্তার রোধে দুই মাসেরও বেশি সময় ধরে সাধারণ ছুটি শেষে ৩১ মে খুলে দেয়া হয়েছে সরকারি ও বেসরকারি অফিস। সীমিত পরিসরে চালু করা হয় গণপরিবহন। এরপর থেকেই সংক্রমণের ঝুঁকি আরও বৃদ্ধি পাচ্ছে। দিন দিন আক্রান্ত আর মৃত্যুর সংখ্যা দীর্ঘ হতে চলেছে।

এরইমধ্যে করোনা মহামারীর বিস্তারে বিশ্বের শীর্ষ ২০ দেশের তালিকায় বাংলাদেশ ঢুকে পড়েছে। এ অবস্থায় সরকার আবারও ‘লকডাউন’ এর পথে যাচ্ছে। তবে এবার পুরো দেশ একসঙ্গে ‘লকডাউনে’ যাবে না সরকার। আক্রান্তের আধিক্য বিবেচনায় রেড জোন, ইয়েলো জোন ও গ্রিণ জোনে চিহ্নিত করে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বাস্তবায়ন হবে স্বাস্থ্যবিধি ও আইনি পদক্ষেপ।

সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে এ কথা জানানোর পর স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে দেশের তিনটি বিভাগ, ৫০টি জেলা ও ৪০০টি উপজেলাকে পুরোপুরি লকডাউন (রেড জোন বিবেচিত) দেখানো হচ্ছে।

এর মধ্যে আংশিক লকডাউন (ইয়েলো জোন বিবেচিত) দেখানো হচ্ছে পাঁচটি বিভাগ, ১৩টি জেলা ও ১৯টি উপজেলাকে। আর লকডাউন নয় (গ্রিণ জোন বিবেচিত) এমন জেলা দেখানো হচ্ছে একটি এবং উপজেলা দেখানো হচ্ছে ৭৫টি।

মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে শনিবার (৬ জুন) সর্বশেষ আপডেট করা তালিকায় বরিশাল বিভাগের মধ্যে পুরোপুরি লকডাউন বলা হচ্ছে বরগুনা, বরিশাল, পটুয়াখালী ও পিরোজপুরকে। এই বিভাগে আংশিক লকডাউন ভোলা ও ঝালকাঠি।

চট্টগ্রাম বিভাগে পুরোপুরি লকডাউন বলা হচ্ছে ব্রাহ্মণবাড়িয়া, চাঁদপুর, কুমিল্লা, কক্সবাজার, ফেনী, খাগড়াছড়ি, লক্ষ্মীপুর ও নোয়াখালীকে। এই বিভাগে আংশিক লকডাউন বান্দরবান, চট্টগ্রাম ও রাঙ্গামাটি।

ঢাকা বিভাগের মধ্যে পুরোপুরি লকডাউন বলা হচ্ছে গাজীপুর, গোপালগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, মাদারীপুর, মানিকগঞ্জ, মুন্সিগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ, নরসিংদী, রাজবাড়ী, শরীয়তপুর ও টাঙ্গাইলকে। এই বিভাগে শুধু ঢাকা ও ফরিদপুর আংশিক লকডাউন।

খুলনা বিভাগের মধ্যে চুয়াডাঙ্গা, যশোর, খুলনা, মেহেরপুর, নড়াইল ও সাতক্ষীরাকে পুরোপুরি লকডাউন বলা হচ্ছে। এই বিভাগে আংশিক লকডাউন বলা হচ্ছে বাগেরহাট, কুষ্টিয়া ও মাগুরাকে। খুলনা বিভাগেই দেশের একমাত্র গ্রিণ জোন চিহ্নিত জেলা ঝিনাইদহ, অর্থাৎ এটি লকডাউন নয়।

রাজশাহী বিভাগের মধ্যে পুরোপুরি লকডাউন বলা হচ্ছে বগুড়া, জয়পুরহাট, নওগাঁ, নাটোর ও রাজশাহীকে। এই বিভাগে আংশিক লকডাউন চাঁপাইনবাবগঞ্জ, পাবনা ও সিরাজগঞ্জ।

রংপুর বিভাগের আটটি জেলাকেই পুরোপুরি লকডাউন বলা হচ্ছে। জেলাগুলো হলো- দিনাজপুর, গাইবান্ধা, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, নীলফামারী, পঞ্চগড়, রংপুর ও ঠাকুরগাঁও।

সিলেট বিভাগের সব ক’টি জেলাকেই বলা হচ্ছে পুরোপুরি লকডাউন। বিভাগের জেলাগুলো হলো- হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার, সুনামগঞ্জ ও সিলেট।

ময়মনসিংহ বিভাগেরও সব ক’টি জেলাকে পুরোপুরি লকডাউন বলা হচ্ছে। এ চারটি জেলা হলো জামালপুর, ময়মনসিংহ, নেত্রকোনা ও শেরপুর।

এদিকে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে ঢাকা মহানগরীর ৩৮টি এলাকাকে আংশিক লকডাউন (ইয়েলো জোন বিবেচিত) হিসেবে দেখানো হচ্ছে। তবে লকডাউন নয় (গ্রিণ জোন বিবেচিত) বলে দেখানো হচ্ছে ১১টি এলাকাকে। এখন পর্যন্ত পুরোপুরি লকডাউন (রেড জোন বিবেচিত) হিসেবে ঢাকার কোনো এলাকাকে দেখানো হচ্ছে না।

মহানগরীর আংশিক লকডাউন বলে চিহ্নিত ৩৮টি এলাকা হলো- আদাবর, থানা, উত্তরা পূর্ব, উত্তরা পশ্চিম, ওয়ারী, কদমতলী, কলাবাগান, কাফরুল, কামরাঙ্গীরচর, কোতয়ালী, খিলক্ষেত, গুলশান, গেন্ডারিয়া, চকবাজার, ডেমরা, তেজগাঁও, তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল, দক্ষিণখান, দারুসসালাম, ধানমন্ডি, নিউমার্কেট, পল্টন মডেল, পল্লবী, বংশাল, বাড্ডা, বিমানবন্দর, ভাটারা, মিরপুর মডেল, মুগদা, মোহাম্মদপুর, যাত্রাবাড়ী, রমনা মডেল, লালবাগ, শাহআলী, শাহজাহানপুর, শেরেবাংলা নগর, সবুজবাগ, সুত্রাপুর ও হাজারীবাগ থানা এলাকা।

আর লকডাউন নয় বলে চিহ্নিত ১১টি এলাকা হলো- উত্তরখান থানা, ক্যান্টনমেন্ট থানা, খিলগাঁও, তুরাগ, বনানী, ভাষানটেক, মতিঝিল, রামপুরা, রূপনগর, শাহবাগ ও শ্যামপুর থানা এলাকা।

স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয় থেকে জানা যায়, আজ রোববার (৭ জুন) থেকেই কিছু জায়গায় জোনিং ব্যবস্থার মাধ্যমে লকডাউন শুরু হচ্ছে। বেশি আক্রান্ত এলাকাকে রেড, অপেক্ষাকৃত কম আক্রান্ত এলাকাকে ইয়োলো ও একেবারে কম আক্রান্ত বা সংক্রমণমুক্ত এলাকাকে গ্রিণ জোন হিসেবে চিহ্নিত করে স্বাস্থ্যবিধি বাস্তবায়ন করা হবে। গ্রিণ জোনে সতর্কতা এবং ইয়েলো জোনে সংক্রমণ যেন আর না বাড়ে সেজন্য পদক্ষেপ থাকলেও রেড জোনে করোনার বিশেষ গাইডলাইন অনুযায়ী কঠোর হবে পুলিশ।

এলাকাভিত্তিক লকডাউন প্রসঙ্গে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন জানিয়েছেন, ”প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে বেশ কিছুদিন এটা নিয়ে আমরা কাজ করেছি। বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের পরামর্শ নিয়ে একটি পরিকল্পনা তৈরি করে রবিবার প্রধানমন্ত্রীর কাছে উপস্থাপন করা হবে। কীভাবে কী করা হবে, সেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত তিনি দেবেন, তার নির্দেশনায় আমরা পরবর্তী ব্যবস্থা নেবো।”

তিনি জানান, এখানে ম্যাপিং করা হচ্ছে, কীভাবে কোন এলাকা লকডাউন করা হবে, তার প্রক্রিয়া কী হবে, সেসব নিয়ে বেশ কিছু সুপারিশ তৈরি করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদন ও নির্দেশনা পাওয়া গেলে সেটা বাস্তবায়ন করা হবে।

তিনি বলছেন, ”এলাকাভিত্তিক চলাচলে যদি আমরা কৌশল নিতে পারি, তখন সেখানে চলাচল কম হবে, ফলে সংক্রমণও কম হবে। এখন ঢাকার কথা যদি ধরেন, সব এলাকায় তো একরকম সংক্রমণ নেই। সুতরাং সব তো একরকম করা যাবে না। কোথাও বেশি আছে, কোথাও কম। সেই অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়ার পরিকল্পনা করছি।”

এর মাঝে গত শুক্রবার থেকে কক্সবাজার পৌরসভাকে রেড জোনের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। সেখানে ২০শে জুন পর্যন্ত এলাকাটি লকডাউন থাকবে।

এদিকে করোনাভাইরাস প্রতিরোধে পরীক্ষামূলকভাবে রাজধানী ঢাকার দুটি ওয়ার্ড সরকার লকডাউনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে জানা গেছে। ওয়ার্ড দুটি হচ্ছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ৪১ নম্বর ওয়ার্ড (ওয়ারী) ও উত্তর সিটি করপোরেশনের ২৭ নম্বর ওয়ার্ড (ধানমন্ডির রাজাবাজার)।

রবিবার (৭ জুন) সকাল থেকে এ দুটি ওয়ার্ড লকডাউন ঘোষণা করা হতে পারে বলে জানিয়েছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। এজন্য সব ধরনের প্রস্তুতি রয়েছে বলে জানিয়েছে দুই সিটি করপোরেশন

উল্লেখ্য, করোনাভাইরাসের কারণে টানা ৬৬ দিন বন্ধের পর গত ৩১ মে থেকে সরকারি-বেসরকারি অফিস চালু হয়েছে। এরপর থেকে পরিস্থিতি আগের চেয়ে অবনতি হয়। এমন অবস্থায় ১ জুন সরকারের উচ্চপর্যায়ের এক সভায় করোনাভাইরাসের সংক্রমণ বিবেচনায় দেশের বিভিন্ন এলাকাকে ‘রেড, ইয়েলো ও গ্রিন জোনে’ ভাগ করার সিদ্ধান্ত হয়। এরপর কি প্রক্রিয়ায় সেটি হবে তা নিয়ে কাজ শুরু করেন বিশেষজ্ঞরা। সেই কাজ ইতিমধ্যে প্রায় শেষ পর্যায়ে।