সংবাদ শিরোনাম
  • আজ ২৬শে শ্রাবণ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

বাংলাদেশে ডাল চাষের সমস্যা ও সম্ভাবনা

২:৩৫ অপরাহ্ণ | মঙ্গলবার, জুলাই ৭, ২০২০ ফিচার
Gazipur

চাষাবাদের ঊষালগ্ন থেকেই বাংলাদেশে ডালের চাষ হয়ে আসছে। সেই সাথে আমাদের খাদ্যাভাসেও ডাল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে।  ডাল গরীবের আমিষ হিসাবেও পরিচিত। অন্যদিকে ডাল থেকে পাওয়া যায় সস্তা ও সহজে হজমযোগ্য আমিষ।

এদেশে সাধারণতঃ খেসারী, মসুর, ছোলা, মাসকলাই, মুগ, মটর, ফেলন ও অড়হর প্রভৃতি ডালের চাষ হয়ে আসছে।  কম উর্বর মাটিতে, স্বল্প পরিচর্যা ও বৃষ্টি নির্ভর ফসল হিসাবে ডালের চাষ হয়ে থাকে। যার জন্য ফলনও খুব কম হয়। অথচ দরিদ্র জনগোষ্ঠীর পুষ্টি স্বল্পতা দূর করতে, মাটির হারানো উর্বরা শক্তি ফিরে পেতে, মাটিতে জৈব পদার্থের পরিমাণ বৃদ্ধি করতে, সর্বোপরি দেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জনে ডালের আবাদ বৃদ্ধি এখন সময়ের দাবি।

কিন্তু বিশাল জনগোষ্ঠীর খাদ্য চাহিদা পূরণের জন্য কৃষক বিভিন্ন ধরনের দানা ফসল, প্রধানত ধান ও গম চাষ করে আসছে। এতে করে আমাদের আবাদী জমিসমূহের বেশীর ভাগই দানা জাতীয় খাদ্য শস্য আবাদে ব্যবহার হচ্ছে। অপরদিকে ডাল জাতীয় ফসলসহ বিভিন্ন ধরনের পুষ্টিমানযুক্ত ফসলের আবাদ দিন দিন কমে যাচ্ছে। ফলশ্রুতিতে, আমাদের দেশ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করলেও পুষ্টি অর্জনে ব্যর্থ হচ্ছে। সেকারণেই আমাদের দেশের মানুষ নানাবিধ রোগে আক্রান্তও হচ্ছে। যেহেতু, মানুষ তার পর্যাপ্ত খাদ্য চাহিদা এবং ভাতভিত্তিক খাদ্যাভাস ও সেচ সুবিধা বৃদ্ধির কারণে ধান ও গমের আবাদই বেশি করছে, সেই কারণে ডাল আবাদে জমির পরিমাণ বৃদ্ধিতো দূরের কথা ডালের আবাদী জমিসমুহই হারিয়ে যাচ্ছে দানা ফসল চাষে।

বর্তমানে বাংলাদেশে ডাল চাষের এলাকা ৮.১৯ লাখ হেক্টর, মোট উৎপাদন ১০.৩৯ লাখ মেঃ টন এবং গড় ফলন ১.২৭ টন/হেঃ (কৃষি ডায়েরী ২০১৯)। অথচ ঋঅঙ এর হিসাব অনুযায়ী একজন মানুষের প্রতিদিন প্রায় ৪৫ গ্রাম ডাল খাওয়ার কথা। সেই হিসাব অনুযায়ী আমাদের দেশে বৎসরে প্রায় ২৫ লাখ মেঃ টন ডালের প্রয়োজন। কিন্তু দেশের উৎপাদন মাত্র ১০.৩৯ লাখ মেঃ টন, যা মোট চাহিদার মাত্র ৪১%। অর্থাৎ প্রয়োজনের তুলনায় এখনও ৫৯% ঘাটতি রয়েছে। তবে ডাল আবাদে রয়েছে বিভিন্ন সমস্যা যেমন-ডাল ফসলের ফলন কম, বিভিন্ন ধরণের রোগ পোকামাকড়ের আক্রমণ, ভালো বীজের অভাব, প্রতিকূল আবহাওয়ার প্রতি সংবেদনশীল এবং অন্যান্য ফসলের তুলনায় লাভ কম ইত্যাদি। সেইসাথে এ সমস্ত সমস্যার পাশাপাশি উন্নত জাত ও প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে লাভজনক ডাল চাষেরও যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে।

ডাল চাষে সাধারণ সমস্যা ও সম্ভাবনা

সমস্যাঃ সাধারণত ডালের প্রচলিত জাতসমূহ কম উৎপাদনশীল এবং প্রতিকূল আবহাওয়ার প্রতি খুবই সংবেদশীল বিশেষ করে দেরীতে বপন করা হলে রোগ ও পোকামাকড়ের আক্রমণ বেশী হয়। এ পর্যন্ত ১১৩ টি রোগ ও ৩০ টি পোকা সনাক্ত করা হয়েছে যা ডাল ফসলের ক্ষতি সাধন করে থাকে। অনুর্বর জমি, স্বল্পতম পরিচর্যা এবং সামান্যতম বিনিয়োগের মাধ্যমে অপরিকল্পিত চাষাবাদ ব্যবস্থাপনায় ডাল চাষ হয়ে থাকে। বিভিন্ন উৎপাদন উপাদান যেমন- সার ও সেচ প্রভৃতির প্রতি ঋণাত্মক প্রভাব। অন্যান্য ফসল যেমন- ধান, গম, শাক-সব্জি, তামাক ইত্যাদির সাথে লাভের প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে না পারা। স্বল্প সময়ের শীতকাল এবং অস্থিতিশীল ফলন। উন্নত প্রযুক্তি প্রয়োগে কৃষকের অনীহা। অপ্রতুল এবং অপরিকল্পিত বীজ উৎপাদন, সংগ্রহ, সংরক্ষণ এবং বিতরণ ব্যবস্থা। ডাল চাষে বিশেষ ঋণ সুবিধার অভাব। সর্বোপরি, দূর্বল বাজার ব্যবস্থা।

সম্ভাবনাঃ অন্যদিকে উৎপাদন বৃদ্ধিতে সাধারণ সম্ভাবনার দিকসমূহ- উচ্চ ফলন সম্ভাবনাময় এবং কম ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চিহ্নিত করে শস্য বিন্যাসের ভিত্তিতে উন্নত জাতের খেসারী, মসুর, ছোলা, মটর, ফেলন, অড়হর, মুগ ও মাসকলাই এর নিবিড় প্রযুক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে আবাদ সম্প্রসারণ করা। স্থানীয় জাতের পরিবর্তে উন্নত জাতের নিবন্ধনকৃত ডাল ফসলের মাধ্যমে সঠিক ব্যবস্থাপনায় আবাদ সম্প্রসারণ। দক্ষিণাঞ্চল ও দক্ষিণপশ্চিমাঞ্চল, উত্তরাঞ্চল এবং সিলেটসহ সকল পাহাড়ী অঞ্চলে উন্নত প্রযুক্তিতে ডাল ফসল চাষের আওতায় আনা। পানি নিষ্কাশনের সুবিধাযুক্ত উঁচু/মাঝারি উঁচু জমিতে শস্য বিন্যাসে পতিত জমিতে মুগ ও মাসকলাই এর চাষ সম্প্রসারিত করা।

সম্ভাবনাময় অপ্রচলিত এলাকা যেমন-বরেন্দ্র ভূমি, সিলেট ও দক্ষিণাঞ্চলে ছোলার নিবিড় চাষ সম্প্রসারণ করা। মিশ্র ফসল ও সাথী ফসলের চাষ উৎসাহিত ও সম্প্রসারিত করা। সংগ্রহোত্তর তথ্য ও প্রযুক্তির প্রয়োগ ও দক্ষ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে শস্যের খোয়ানো বা হানি রোধ করা। রোপা আমন ধানে সম্পুরক সেচ প্রদান করে রবি মৌসুমে আবাদকৃত ডাল ফসলের আগাম চাষ নিশ্চিত করা ও দেরীতে লাগানো যায় এমন সম্ভাবনাময় ডাল ফসল যেমন ছোলা ও মুগের চাষ সম্প্ররারণ করা। দেরীতে বপনযোগ্য বারি মসুর-৮ এবং বারি ছোলা-৬ এর আবাদ সম্প্রসারণ করা। প্রান্তিক চাষী পর্যায়ে রোপা আমন ধান-খেসারী/মটর/ছোলা (শাক+গো-খাদ্য)-বোরো ধান লাভজনক শষ্য পর্যায় ব্যবহার। সর্বোপরি, পরিকল্পনামাফিক পরিচ্ছন্ন চাষাবাদ করা। সরকার কর্তৃক সংরক্ষণ ও বাজারজাতকরণের সুবিধাদি প্রদান ও প্রয়োজনবোধে ভরা মৌসুমে আকর্ষণীয় মূল্যে তা সংগ্রহ করা। ডাল শস্যের মাধ্যমে বিভিন্ন ধরণের মুখোরোচক খাদ্যদ্রব্য প্রস্তুত করে বেশি দামে বিক্রি করার ব্যবস্থা করে কৃষকদেরকে ডাল চাষে উৎসাহিত করতে হবে। এছাড়াও বিভিন্ন ধরনের ডাল চাষে যেমন রয়েছে সমস্যা সেই সাথে রয়েছে সম্ভাবনা।

মসুরের চাষের সমস্যা ও সম্ভাবনা

সমস্যাঃ প্রথমতঃ এদেশের জনগনের চাহিদায় মসুর ডালের অবস্থান প্রথম অথচ উৎপাদনে দ্বিতীয় অবস্থানে। আগাম শাক সব্জির আবাদ বৃদ্ধির ফলে মসুর আবাদ বৃদ্ধির উপযোগী জমি কমে যাওয়া। আমন ধান কাটার পর জমিতে রস না থাকা। আবার অনেক সময় বৃষ্টির দরুন মাটিতে অতিরিক্ত রস/পানি জমে থাকায় সময়মত বপন করা যায়না। মসুর দেরীতে বপন করলে বিভিন্ন ধরণের রোগ যেমন- স্টেমফাইলিয়াম ব্লাইট ও মরিচা রোগ এবং জাব পোকার আক্রমন হয়। জমিতে গাছের সংখ্যা কম থাকা এবং সময়মত আগাছা দমন না করা। কৃষকদের আগ্রহ কম থাকায় অযতœ অবহেলায় দেরীতে মসুর ডাল চাষ। উন্নতমানের ভালো বীজের অপ্রতুল এবং প্রকৃত বাজার ব্যবস্থাপনার অভাব।

সম্ভাবনাঃ বাংলাদেশের আবহাওয়া ও মাটি মসুর চাষের জন্য বেশ উপযোগী। ডাল গবেষণা কেন্দ্র এবং বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট কর্তৃক এ পর্যন্ত ১৮টি (৯+৯) মসুরের জাত উদ্ভাবন করেছে, যা উচ্চফলনশীল এবং রোগ প্রতিরোধী। এছাড়াও ডাল গবেষণা কেন্দ্র কর্তৃক উদ্ভাবিত এ জাতসমূহে অন্যান্য পুষ্টি উপাদানের পাশাপাশি আয়রন (জাতভেদে ৫৬.৬-৮৭.৪২ মিলিগ্রাম/কেজি), জিংক (জাতভেদে ৫২.২৪-৬৫.১৫ মিলি গ্রাম/কেজি) এবং সিলেনিয়াম (জাতভেদে ২৫৫-৩৮৭ মাইক্রোগ্রাম/কেজি) সমৃদ্ধ বা মানুষের শরীরের জন্য খুবই উপকারী। উঁচু এলাকাগুলোতে যেখানে আউশ ধান/পাট/গ্রীষ্মকালীন সব্জি চাষ করা হয় সেখানে অতি সহজেই সময়মত মসুর চাষের সুযোগ রয়েছে। জমিতে বীজ গজানোর জন্য রস কম থাকলে বীজ ৮-১০ ঘন্টা ভিজানোর পর শুধুমাত্র বীজের গায়ের পানি শুকিয়ে বপন করলে অংকুরোদগম ও উৎপাদন দুটোই ভালো হয়ে থাকে। ভালো ফলনের জন্য বিঘা প্রতি ৪-৫ কেজি মসুর বীজ ব্যবহার করে জমিতে পরিমিত পরিমাণ গাছ (২০০-২৫০/বর্গ মিটার) পাওয়া সম্ভব যা উচ্চ ফলনের সহায়ক। চরাঞ্চলে এমনকি বিলাঞ্চলেও বন্যার/বর্ষার পানি নেমে যাওয়ার পর মধ্য উঁচু থেকে মধ্যম নীচু জমিতে আমন ধানের জমিতে মসুর সাথী ফসল হিসাবে ছিটিয়ে সময়মত স্বল্প খরচে বিনা চাষে বপন করার সুযোগ রয়েছে। আখের সাথে মসুর আন্তঃফসল হিসাবে চাষ করারও যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে।

উদ্ভাবিত জাতসমূহের মধ্যে বারি মসুর-৬, বারি মসুর-৭, এবং বারি মসুর-৮ অপেক্ষাকৃত অধিক ফলনশীল এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাসম্পন্ন। তন্মধ্যে বারি মসুর-৮ দেরীতে বপনযোগ্য (৩০ নভেম¦র পর্যন্ত) এবং এখন পর্যন্ত সম্পূর্ণরূমে স্টেমফাইলিয়াম ব্ল্াইট রোগ প্রতিরোধী। এছাড়া বারি মসুর-৯ স্বল্প মেয়াদী (৮৫-৯০ দিন) হওয়ায় আমন-পতিত-বোরো ধান ফসল ধারায় দুটি ধানের মাঝে সহজেই চাষ করা সম্ভব। ফলে পতিত জমিতে মসুর চাষের মাধ্যমে মসুরের এলাকা ও উৎপাদন বাড়বে। তবে বারি মসুর-৮ বাদে অন্যান্য জাতের ক্ষেত্রে প্রতিকূল আবহাওয়ায় স্টেমফাইলিয়াম ব্ল্াইট রোগের আক্রমণ হলে ২ গ্রাম রোভারাল/১ গ্রাম ফলিকুর প্রতি লিটার পানিতে মিশিয়ে ৭-১০ দিন অন্তর ২-৩ বার স্প্রে করতে হবে। মরিচা রোগের ক্ষেত্রে টিল্ট ০.৫ মিলি প্রতি লিটার পানিতে মিশিয়ে ৭-১০ দিন অন্তর ২-৩ বার স্প্রে করতে হবে। তবে সময়মত বপন করলে উন্নত জাসমূহে মরিচা রোগ হয় না। এছাড়া, ভিটাভেক্স-২০০/প্রোভেক্স দ্বারা প্রতি কেজি বীজের সাথে ২ গ্রাম মিশিয়ে বীজ শোধন করে বপন করলে মাটিবাহিত রোগ থেকে রেহাই পাওয়া সম্ভব। মসুরের বেশ চাহিদা ও বাজারে মূল্য ভালো থাকায় কৃষকেরা আবাদ করে লাভবান হতে পারে। তাই মসুরের উন্নত জাত (বারি মসুর-৬, বারি মসুর-৭ এবং বারি মসুর-৮) ও প্রযুক্তির প্রসার ঘটায়ে বাংলাদেশে মসুরের এলাকা ও উৎপাদন বৃদ্ধির ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে।

খেসারী চাষের সমস্যা ও সম্ভাবনা

সমস্যাঃ বাংলাদেশে উৎপাদিত ডালসমূহের মধ্যে খেসারীর এলাকা ও মোট উৎপাদন বেশী। কিন্তু হেক্টর প্রতি ফলন কম। আমাদের দেশে খেসারীর স্থানীয় জাত সাধারণতঃ আমন ধানের জমিতে সাথী ফসল হিসাবে চাষ করা হয়। এ স্থানীয় জাতে উচ্চ মাত্রার নিউরোটক্সিন (ঙউঅচ=ঙীধষুষ উরধসরহড় চৎড়ঢ়রড়হরপ অপরফ, যার মাত্রা ০.৪-১.৬%) বিদ্যমান, যা শরীরের জন্য ক্ষতিকর (প্যারালাইসিস রোগের জন্য দায়ী) অধিকন্তু, ফলনও কম। দেরীতে বপন করা হলে জাব পোকার ব্যাপক আক্রমণ হয় এবং ফলনও কমে যায়। খেসারী স্বপরাগী হওয়া সত্ত্বেও ২৮-৩১% পরপরাগায়ন হয়ে থাকে। ফলে জাতের বিশুদ্ধতা রক্ষা করা কঠিন।

সম্ভাবনাঃ স্থানীয় জাতের পরিবর্তে জাতভেদে ডাল গবেষণা কেন্দ্র কর্তৃক উদ্ভাবিত ৫টি খেসারীর জাত উচ্চ ফলনশীল ও কম নিউরোটক্সিনযুক্ত (জাতভেদে, ০.০২-০.০৬%)। খেসারী সারা রাত্রি ভিজিয়ে রাখলে খেসারীতে বিদ্যমান অধিকাংশ নিউরোটক্সিন পানিতে দ্রবিভূত হয়ে যায়। এখানে উল্লেখ্য যে, খেসারী ডালে অন্যান্য ডালের তুলনায় আমিষের পরিমাণ বেশী (২৮-৩৫%)। সময়মত (অক্টোবর শেষ সপ্তাহ-নভেম্বর দ্বিতীয় সপ্তাহের মধ্যে) খেসারী বপন করা এবং জাব পোকার আক্রমণ হলে সুমিথিয়ন/ম্যলাথিয়ন এদের মধ্যে যে কোন একটির ২ মিলিলিটার ১ লিটার পানির সাথে মিশিয়ে স্প্রে করতে হবে। আমন-বোরো ধানের মাঝে পতিত জমিতে সহজেই খেসারী গো-খাদ্য ও সব্জি হিসাবে চাষ করা যায়। জাতের বিশুদ্ধতা রক্ষার জন্য একটি প্লট থেকে অন্য পল্টের দূরত¦ কমপক্ষে ৩০ মিটার দূরত¦ নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।

ছোলার চাষের সমস্যা ও সম্ভাবনা

সমস্যাঃ সাধারণতঃ স্থানীয় এবং উন্নত জাতের দীর্ঘমেয়াদী আমন ধান চাষ করা এবং আমন ধান কাটার পর ছোলা চাষ করা, সেক্ষেত্রে ছোলা চাষের গুরুত্বপূর্ণ এলাকা যেমন- বরেন্দ্র অঞ্চলের মাটিতে ধান কাটার আগেই রস শুকিয়ে যায়, ফলে বীজ ভালোভাবে অংকুরোদগম হয় না। এছাড়া, আবার অনেক এলাকায় মাটিতে রস বেশী থাকায় সময়মত জো আসে না। কম উৎপাদনশীল স্থানীয় জাতের ছোলা আবাদ এবং খুবই ঝুঁকিপূর্ণ- বট্রাইটিস গ্রে মোল্ড (বিজিএম), ফুজারিয়াম উইল্ট, কলার রট এবং গোড়াপঁচা প্রভৃতি রোগ এবং ফল ছিদ্রকারী পোকার আক্রমণ। হালকা পলিমাটি অঞ্চলে বোরনের অভাব। কৃষকদের আগ্রহ কম, দেরীতে বপন, সময়মত আগাছা দমন না করা, খরা এবং উন্নত জাতের ভালো বীজের অপ্রতুলতাসহ সঠিক বাজার ব্যবস্থার অভাব প্রভৃতি ছোলা চাষের অন্তরায়।

সম্ভাবনাঃ বাংলাদেশের বরেন্দ্র অঞ্চল, বৃহত্তর ফরিদপুর, কুষ্টিয়া এবং পাবনা প্রভৃতি জেলার আবহাওয়া ও মাটি ছোলা চাষের জন্য বেশ উপযোগী। ডাল গবেষণা কেন্দ্র এ পর্যন্ত ছোলার ১১টি উন্নত জাত উদ্ভাবন করেছেন, যা উচ্চ ফলনশীল এবং রোগ প্রতিরোধী। তন্মধ্যে বারি ছোলা-৫ দেশের সব অঞ্চলের জন্য চাষ উপযোগী। এছাড়া বরেন্দ্র অঞ্চলে বারি ছোলা-২, বারি ছোলা-৩, বারি ছোলা-৫, বারি ছোলা-৭, বারি ছোলা-৯ এবং বারি ছোলা-১১ ভালো ফলন দিয়ে থাকে। দীর্ঘমেয়াদী ধানের পরিবর্তে স্বল্পকালীন রোপা আমন যেমন- ব্রিধান-৩২, ব্রিধান-৩৩, ব্রিধান-৩৯, ব্রিধান-৬২ এবং বিনা ধান-৭ প্রভৃতি ধানের আবাদ করে অতি সহজে সময়মত ছোলা বপন করা সম্ভব। জমিতে বীজ গজানোর জন্য রস কম থাকলে বীজ ৮-১০ ঘন্টা ভিজানোর পর শুধুমাত্র বীজের গায়ের পানি শুকিয়ে বপন করলে অংকুরোদগম ও উৎপাদন দুটোই ভাল হয়ে থাকে। এছাড়া, মাটিতে রসের অভাব হলে বরেন্দ্র অঞ্চলে গাছ গজানোর ২০-৪০ দিনের মধ্যে একবার হালকা সেচ দিলে ভালো ফলন পাওয়া যায়। বারি ছোলা-৬ দেরীতে (ডিসেম্বর পর্যন্ত) বপন করা যায়। আবার নিম্নাঞ্চল থেকে মধ্যম নিম্নাঞ্চলে রোপা আমন ধানের জমিতে ছোলা সাথী ফসল হিসাবে আবাদ করলে সময়মত বীজ বপন করা যায়। আখের সাথে ছোলা আন্তঃফসল হিসাবে চাষ করারও যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। তবে প্রতিকূল আবহাওয়ায় বট্রাইটিস গ্রে মোল্ড রোগের আক্রমণ হলে এক্রোবাট এম জেড নাকম বালাইনাশক ২ গ্রাম প্রতি লিটার পানিতে মিশিয়ে ৭-১০ দিন অন্তর ২-৩ বার স্প্রে করতে হবে। এছাড়া, ভিটাভেক্স-২০০ দ্বারা প্রতি কেজি বীজের সাথে ৩ গ্রাম মিশিয়ে বীজ শোধন করে বপন করলে মাটিবাহিত রোগ থেকে রেহাই পাওয়া সম্ভব। মাটিবাহিত রোগের প্রকোপ বেশি হলে শস্য-পর্যায় অবলম্বন করতে হবে। ফল ছিদ্রকারী পোকার আক্রমণ দেখা দিলে ১ মি.লি. রিপকর্ড/নাইট্রো-৫০৫ প্রতি লিটার পানিতে মিশিয়ে অথবা ভিরতাকো ০.৬ গ্রাম প্রতি লিটার পানিতে মিশিয়ে গাছ গজানোর ৭০ দিন পর অর্থাৎ ফুল আসা অবস্থায় ১ বার স্প্রে করতে হবে। পরবর্তীতে পোকার আক্রমণ থাকলে ১০-১২ দিন পর পর আরো ২ বার স্প্রে করতে হবে। ছোলার বেশ চাহিদা ও বাজার মূল্যও ভালো থাকায় কৃষকেরা আবাদ করে লাভবান হতে পারে। এছাড়াও অন্যান্য অপ্রচলিত এলাকা যেমন-সিলেট অঞ্চল ও দক্ষিণাঞ্চলে ছোলা চাষের সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে। তাই ছোলার উন্নত জাত ও প্রযুক্তির প্রসার ঘটায়ে ছোলার এলাকা ও উৎপাদন বৃদ্ধির ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে।

মটর চাষের সমস্যা ও সম্ভবনা

সমস্যাঃ বাংলাদেশে মটর একটি অপ্রচলিত ডাল যার এলাকা ও উৎপাদন দুটোই কম। সাধারণতঃ স্থানীয় জাতের আবাদ করা হয়। স্থানীয় জাতসমূহে পাউডারি মিলডিউ রোগের আক্রমন খুব বেশী এবং ফলনও কম। সর্বোপরি, কৃষকদের অযত্ন অবহেলায় মটর চাষ হয়ে থাকে।

সম্ভাবনাঃ মটর অপ্রচলিত ডাল হওয়া সতে¦ও ডাল গবেষণা কেন্দ্র কর্তৃক মটরের উচ্চ ফলনশীল ও রোগ প্রতিরোধী ক্ষমতাসম্পন্ন তিনটি জাত ও উৎপাদন প্রযুক্তি আবিস্কারের ফলে মটর চাষের সম্ভাবনা অনেকগুনে বেড়ে গেছে। মটর চাষ করে এবং আমন ধানের জমিতে সাথী ফসল হিসাবেও আবাদ করা যায়। এক্ষেত্রে বারি মটর-৩ বেশী উপযোগী। আমনের পরবর্তী বোরো ধান না করলে আমন ধানের জমিতে বারি মটর-৩ সহজেই সাথে সাথী ফসল হিসাবে চাষ করে সব্জির জন্য সবুজ পড ও গো-খাদ্য/দানা হিসাবে উৎপাদন করা সম্ভব। মটরের সবুজ পড সব্জি হিসাবে বিক্রি করে কৃষকরা বেশ লাভবান হবেন। উঁচু থেকে মধ্যম উচুঁ জমিতে আমন ও বোরো ধানের মাঝে পতিত জায়গায় সহজেই বারি মটর-২ সবুজ পড ও গো-খাদ্য হিসাবে চাষ করার যথেষ্ট সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু বারি মটর-২ বড় দানার হওয়ায় আমন ধানের সাথে সাথী ফসল হিসাবে চাষের জন্য উপযোগী নয়।  এখানে উল্লেখ্য যে, দেশের উত্তরাঞ্চল, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল ছাড়াও দক্ষিণাঞ্চলের জেলাসমূহে এবং সিলেট অঞ্চলেও মটর চাষের যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। অধিকন্তু, বারি মটর-২ এবং বারি মটর-৩ বসত বাড়ীতে চাষ করে সব্জি হিসাবে সবুজ পড এবং শাকের চাহিদা মেটানোর যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে।

ফেলন চাষের সমস্যা ও সম্ভবনা

সমস্যাঃ বাংলাদেশের চট্টগ্রাম বিভাগ এবং দক্ষিণাঞ্চলের জেলাসমূহে ফেলন একটি জনপ্রিয় ডাল। তবে বেশীর ভাগ ক্ষেত্রেই স্থানীয় জাতের বীজের ব্যবহার এবং অপরিকল্পিতভাবে পুরাতন পদ্ধতিতে চাষাবাদ করা হয়ে থাকে। যার ফলন কম এবং সময়ও বেশী লাগে। এছাড়া, স্থানীয় জাতে রোগ ও পোকামাকড় আক্রমণ বেশি হয়ে থাকে।

সম্ভাবনাঃ স্থানীয় জাতের পরিবর্তে উন্নত জাত যেমন- বারি ফেলন-১ এবং বারি ফেলন-২ জাতের চাষ করা। এ সমস্ত জাত স্থানীয় জাতের চেয়ে ৩০-৪০% ফলন বেশী দেয়। এছাড়াও উন্নত জাত ও আধুনিক পদ্ধতিতে সময়মত চাষাবাদ করলে ৫০-৬০% ফলন পর্যন্ত বেশী হতে পারে। চাষের মাধ্যম ছাড়াও আমন ধানের জমিতে দক্ষিণাঞ্চলে সাথী ফসল হিসেবে ফেলন সময়মত বপন করা যায়। ফলে ফলনও বেশি হয় এবং তুলনামূলক খরচও কম হয়। অধিকন্তু, ডাল ছাড়াও এর কচি ফল সব্জি হিসাবে খাওয়া যায়।

মুগ ও মাসকলাই চাষের সমস্যা ও সম্ভাবনা

সমস্যাঃ আগাম শাকসব্জির আবাদ বৃদ্ধির ফলে মুগ ও মাসকলাইয়ের আবাদ উপযোগী জমি কমে যাওয়া। খরিফ-২ মৌসুমে বৃষ্টির দরুন সময়মত বপন করা যায় না বলে পরবর্তী রবি ফসলের বিলম্ব হয় এবং দেরীতে বপন করলে মুগ ও মাসকলাইয়ে বিভিন্ন রোগের আক্রমণ হয়। খরিফ-১ মৌসুমে রবি ফসল কাটার পর জমিতে রস থাকে না। এছাড়া গম কাটার পর মুগ ও মাসকলাই বপন দেরী হওয়ায় আশানুরুপ ফলন পাওয়া যায় না। খরিফ-১ মৌসুমে একেবারে ফল উঠানো যায় এমন জাতের অভাব। কৃষকদের আগ্রহ কম। লবণাক্ততা, খরা, অতিবৃষ্টি এবং রোগ ও পোকামাকড়ের আক্রমণ এবং উন্নতমানের ভালো বীজের অভাব। সর্বোপরি বাজার মূল্যের উঠা-নামা মুগ ও মাসকলাই চাষের একটি বড় অন্তরায়।

সম্ভাবনাঃ বাংলাদেশের আবহাওয়া ও মাটি মুগ ও মাসকলাই চাষের জন্য বেশ উপযোগী। এ পর্যন্ত ডাল গবেষণা কেন্দ্র মুগের ৮টি ও মসকলাই এর ৪টি উন্নত জাত ও চাষাবাদ পদ্ধতি উদ্ভাবন করেছেন। এছাড়া বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা কেন্দ্র মুগের ৮টি এবং মসকলাইয়ের ১টি জাত উদ্ভাবন করেছেন। এদের মধ্যে বারি মুগ-৬, বারি মুগ-৭, বারি মুগ-৮, এবং বিনা মুগ-৮ স্বল্প মেয়াদী (৬০-৬৫ দিন) ও দেরীতে বপনযোগ্য এবং অধিকাংশ পড প্রায় একসাথে পেকে যায়। দেশের উঁচু এলাকাগুলোতে যেখানে আউশ ধান/পাট/গ্রীষ্মকালীন সব্জি চাষ করা হয় সেখানে অতিসহজেই খরিফ-২ মৌসুমে মুগ ও মাসকলাই চাষের সুযোগ রয়েছে। চরাঞ্চলে এমনকি বিলাঞ্চলেও বন্যা/বর্ষার পানি নেমে যাওয়ার পর মাসকলাই ছিটিয়ে চাষ করার সুযোগ রয়েছে। আউশ ধানের উঁচু জমিতে সাথী ফসল হিসাবে মাসকলাইয়ের চাষ করা যেতে পারে। খরিফ-১ মৌসুমে অর্থাৎ রবি ফসল বিশেষ করে মসুর এবং সরিষা কর্তন করে জমিতে সেচ দিয়ে আগাম মুগ ও মাসকলাই চাষ করা যেতে পারে। আগাম গম কাটার পরেও মুগ ও মাসকলাই চাষ করা সম্ভব। গমের জমিতে মুগ ও মাসকলাই সাথী ফসল হিসাবে চাষ করা যায়। তবে এ মৌসুমে মুগ ও মাসকলাই চাষের ক্ষেত্রে বীজ গজানোর জন্য জমিতে পরিমিত সেচ দিতে হবে। এছাড়া বৃদ্ধি পর্যায়ে মাটিতে রসের অভাব হলে ১-২ বার হালকা সেচ দিতে হবে। এ মৌসুমে বারি মুগ-৬, বারি মুগ-৭, বারি মুগ-৮ ও বিনা মুগ-৮ এবং বারি মাস-৩ ও বারি মাস-৪ ভালো ফলন দিয়ে থাকে। গম কাটার পর বারি মুগ-৬, বারি মুগ-৭, বারি মুগ-৮ এপ্রিলের ১ম সপ্তাহ পর্যন্ত বপন করা যায়। দক্ষিণাঞ্চলের জেলা যেমন-বৃহত্তর বরিশাল, পটুয়াখালী এবং ভোলা জেলার লবণাক্ততা ও  খরা সমস্যা থেকে কাটিয়ে উঠার জন্য সেচের ব্যবস্থা করতে হবে। এছাড়াও রোগ ও পোকামাকড়ের আক্রমণ থেকে ফসলকে রক্ষার জন্য অনুমোদিত বালাইনাশক সঠিক মাত্রায় সঠিক সময়ে প্রয়োগ করতে হবে। মুগ ও মাসকলাইয়ের বেশ চাহিদা ও বাজার মূল্যও ভালো থাকায় কৃষকেরা আবাদ করে লাভবান হতে পারে। তাই মুগ ও মাসকলাইয়ের উন্নত জাত ও প্রযুক্তির প্রসার ঘটিয়ে মুগ ও মাসকলাইয়ের এলাকা ও উৎপাদন বৃদ্ধির ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে।

উপরের আলোচনা থেকে সহজেই ইহা প্রতীয়মান যে, ডাল চাষের যত সমস্যাই থাকনা কেন উন্নত জাত ও প্রযুক্তি ব্যবহার করে ডালের এলাকা ও উৎপাদন বৃদ্ধির যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। ডালের বাজার মুল্যও ভালো। ফলে কৃষকরা ডাল চাষের মাধ্যমে লাভবান হবেন। ডাল ফসলের মাধ্যমে বিভিন্ন ধরনের মুখোরোচক খাদ্য প্রস্তুতির মাধ্যমে কৃষকরা আয় বৃদ্ধির করতে পারেন। ডাল চাষের ফলে মাটির উর্বরতাও বাড়বে। সর্বোপরি, বলা যায় উন্নত জাত ও প্রযুক্তির ব্যবহারে বাংলাদেশে ডালের উৎপাদনের বৃদ্ধির মাধ্যমে পুষ্টির (বিশেষ করে আমিষ, আয়রন, জিংক, সিলেনিয়াম) যোগান বাড়বে, ও আমদানী নির্ভরতা কমে যাবে, যা দেশের অর্থনীতিকে সাভলম্বী করতে সহায়ক ভূমিকা রাখবে।

লেখক:  মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, ডাল গবেষণা উপ-কেন্দ্র, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট, জয়দেবপুর, গাজীপুর।

Skip to toolbar