‘বাংলাদেশি বজরঙ্গি’ সনু বাবা-মায়ের কাছে ফিরছে আগামীকাল


❏ বুধবার, জুন ২৯, ২০১৬ দেশের খবর, বরিশাল

fd


বরগুনা প্রতিনিধি:

বরগুনায় গতকাল আদালতের রায়ের পর ‘বাংলাদেশি বজরঙ্গি’ জামাল ইবনে মুসার (টুপি পরা) সঙ্গে সনু  ভারতের দিল্লি থেকে পাচার করে বরগুনার বেতাগীতে আনা শিশু সনু তার বাবা-মায়ের কাছে ফিরছে। বরগুনার আদালতের নির্দেশে গতকাল মঙ্গলবার তাকে নিজেদের জিম্মায় নিয়েছে ভারতীয় হাইকমিশন। এরপর ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ জানিয়েছেন, আগামীকাল বৃহস্পতিবার নাগাদ সনু নয়াদিল্লি পৌঁছাবে।

আদালত সূত্র জানায়, সনুকে তার বাবা-মায়ের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য ভারতীয় হাইকমিশনের প্রথম সচিব রমাকান্ত গুপ্তর জিম্মায় দিতে গত সোমবার বরগুনার শিশু আদালতে আবেদন করেন তার আইনজীবী। এই আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আদালতের বিচারক এবং বরগুনার অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ আবু তাহের প্রথমে পাঁচ লাখ এবং পরে এক লাখ টাকা জামানত দেওয়ার শর্ত জুড়ে দেন। এতে রমাকান্ত গুপ্ত সম্মত হননি। ফলে বাবা-মায়ের কাছে সনুর ফিরে যাওয়ার বিষয়টি ঝুলে যায়।

গতকাল মঙ্গলবার ভারতীয় হাইকমিশনের নিযুক্ত আইনজীবী সঞ্জীব কুমার দাস আবার ওই আদালতে জামানত ছাড়াই সনুকে ফিরিয়ে দেওয়ার আবেদন করেন। আদালত চলমান মামলায় সনুকে হাজির করার শর্তে তাকে ভারতীয় হাইকমিশনের ওই কর্মকর্তার জিম্মায় দেওয়ার আদেশ দেন।
গতকাল বিকেল সাড়ে চারটার দিকে বরগুনার অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ আদালত থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে সনুকে গ্রহণ করেন রমাকান্ত গুপ্ত।

ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ গতকাল এক টুইটে বলেন, ঢাকার ভারতীয় হাইকমিশন সনুকে নিজেদের জিম্মায় নিয়েছে। সে ৩০ জুন নাগাদ দিল্লি পৌঁছাবে। সনুকে দেখভাল ও ফিরিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করার জন্য বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ধন্যবাদ জানান সুষমা।

২০১০ সালে নয়াদিল্লি থেকে পাচার করে বরগুনার বেতাগী উপজেলার গেরামর্দন গ্রামে আনা হয় সনুকে (তখন বয়স ছিল পাঁচ বছর)। পাচারের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিরা তাকে ওই গ্রামের হাসি বেগমের কাছে তুলে দেয়। হাসি বেগম বিভিন্ন সময় সনুর ওপর অত্যাচার করতেন। গ্রামের বাসিন্দা ঢাকার একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা জামাল ইবনে মুসা সম্প্রতি বিষয়টি জানতে পেরে এর প্রতিবাদ করেন এবং সনুকে মা-বাবার কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার উদ্যোগ নেন।

এতে ক্ষিপ্ত হয়ে জামালের বিরুদ্ধে চারটি মামলা করেন হাসি বেগম। এসব মামলায় জামাল দুই দফায় ১ মাস ১৯ দিন কারাভোগ করেছেন। তাঁর চাকরিটিও গেছে। শারীরিক নির্যাতনে সনু একপর্যায়ে হাসি বেগমের বাড়ি থেকে পালায়। পরে জামাল তাকে খুঁজে বের করে আদালতে তুলে দিলে আদালতের নির্দেশে পরে সনুকে যশোরের কিশোর উন্নয়ন কেন্দ্রে পাঠানো হয়। নিজের টাকায় জামাল গত ১৪ মে দিল্লিতে গিয়ে সনুর বাবা-মায়ের সন্ধান পান। জামাল গত ২১ মে সনুর বাবা মেহবুব ও মা মমতাজ বেগমকে নিয়ে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজের সঙ্গে দেখা করে বিস্তারিত জানানোর পর বর্তমানে ভারত ও বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে সনুকে দেশে ফিরিয়ে নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়। এর মধ্যে ভারতীয় হাইকমিশনের উদ্যোগে পরীক্ষায় সনুর সঙ্গে তার বাবা-মায়ের ডিএনএ মিলে যায়।

গতকাল আদালতের আনুষ্ঠানিকতা শেষে সনুকে বরগুনা জেলা জজ আদালতের সামনের চত্বরে আনা হলে সেখানে হৃদয়বিদারক এক দৃশ্যের অবতারণা হয়। সনু ও জামাল একে অপরকে জড়িয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন। জামাল বলেন, ‘আমার ওপর দিয়ে অনেক ঝড় গেছে। আজ সেই কষ্ট মুছে গেল। ওকে আমি ওর বাবা-মায়ের কাছে ফিরিয়ে দিতে পেরেছি। এর চেয়ে খুশি আমার জীবনে আর কী হতে পারে।’

সনু বলে, ‘যেদিন শুনেছি আমাকে বাবা-মায়ের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হবে, সেদিন থেকে আমি বাবা-মাকে দেখার জন্য অপেক্ষায় আছি। তাদের কাছে ফিরে যাওয়ার জন্য আমি সবগুলো রোজাও রেখেছি।’

দিল্লিতে অবস্থানরত সনুর মা মুমতাজ বেগমের সঙ্গে গতকাল বিকেলে এই প্রতিবেদকের কথা হয়। তাঁর ছেলের ফিরে যাওয়ার খবর তাঁকে জানালে তিনি কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘এটা আমাদের জন্য খুব খুশির খবর। এত বছর পর ছেলেটা আমার কোলে ফিরে আসবে, এটা স্বপ্নের মতো মনে হচ্ছে। ওকে ফিরে পাওয়ার জন্য আমরা অধীর হয়ে আছি।’