শুক্রবার রাত ৯ টা থেকে শনিবার সকাল ৯ টা রুদ্ধশ্বাস অভিযানের প্রতিটি ঘন্টায় যা ঘটেছিলো

২:২০ অপরাহ্ন | শনিবার, জুলাই ২, ২০১৬ Breaking News, আলোচিত বাংলাদেশ, জাতীয়, স্পট লাইট

সময়ের কণ্ঠস্বর ডেস্ক-

শুক্রবার রাতে একদল বন্দুকধারী রাজধানীর কূটনীতিকপাড়ার হলি আর্টিজেন বেকারিতে ঢুকে বিদেশিসহ বেশ কয়েকজনকে জিম্মি করে। সকালে কমান্ডো অভিযানে মুক্ত হন তাদের অনেকে।

আজ শনিবার দুপুরে সেনাবাহিনীর সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, গুলশানের হোলি আর্টিজান বেকারিতে হামলার ঘটনায় মোট জিম্মি  হয়ে পড়া ২০ জন সহ হামলাকারী  ৬ জঙ্গীর মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়েছে।  এছাড়া বিদেশি নাগরিকসহ মোট ১৩জনকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে। এঘটনায় নিহত হয়েছেন পুলিশের দুই কর্মকর্তা ।

এই ঘটনায় শুধু বাংলাদেশ নয়, বিশ্ব গনমাধ্যমেও ব্যপক আলোচিত হয়েছে। সারাদেশের মানুষসহ প্রবাসী বাংলাদেশীদের প্রতিটা মুহুর্ত কেটেছে উৎকণ্ঠায় । কিন্তু গনমাধ্যমের উপর কড়াকড়ি থাকায় সব ঘটনার প্রকাশ পাচ্ছিলোনা সাথে সাথে। এতে করে অনেকেই আরো বেশি উৎকণ্ঠায় পড়েন । অভিযানের অনেক ঘটনাই তাই জানা হয়নি সবার ।  শুক্রবার রাত ৯ টা থেকে শনিবার সকাল ৯ টা রুদ্ধশ্বাস অভিযানের প্রতিটি ঘন্টায় উল্লেখযোগ্য যা ঘটেছিলো একনজরে  তাই  সময়ের কণ্ঠস্বরের পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো  ।

আতংক, নির্মমতা, রুদ্ধশ্বাস অভিযান আর দেশজুড়ে উৎকণ্ঠার টানা ১২ ঘন্টায় যা ঘটেছিলো গুলশানে

শুক্রবার রাত ৯ টা

রাত পৌনে ৯ টার দিকে ‘আল্লাহু আকবর’ বলে ৮-৯ জন বন্দুকধারী সন্ত্রাসী ঢাকার গুলশান এলাকার স্প্যানিশ রেস্তোরাঁ হলি আর্টিজান বেকারি রেস্তোরাঁয় প্রবেশ করে। রেস্টুরেন্টটিতে ঢুকে নির্বিচারে গুলি ছোড়ে তারা ।  এসময় বাইরে থাকা মানুষেরা একটি বিস্ফোরণের শব্দ শুনতে পায় ।প্রথম দফায় জঙ্গী হামলার ধরন না বুঝেই প্রস্তুতি ছাড়াই সাহসী ভুমিকায় সন্ত্রাসীদের ঠেকাতে গিয়ে  দুজন পুলিশ কর্মকর্তা গুলিবিদ্ধ হন এবং ৫০ জনেরও বেশি মানুষ আহত হয়। এরপর  রাত সাড়ে ৯ টার দিকে খবর পেয়ে পুলিশ-র‍্যাব -বিজিবি ঘটনাস্থলে ছুটে যায়। ছুটে যান ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গুলশান জোনের সহকারী উপ-কমিশনার (এডিসি) আহাদুল ইসলাম, বনানী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সালাহ উদ্দিন খান ও গোয়েন্দা পুলিশের সহকারী কমিশনার (এসি) রবিউল ইসলামসহ আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তারা।

শুক্রবার রাত ১০টা

ঘটনাস্থলে পৌঁছেই কর্মকর্তারা জানতে পারেন, রেস্টুরেন্টে হামলা চালিয়ে বিদেশি নাগরিকসহ বেশ কিছু লোককে জিম্মি করে রেখেছে সন্ত্রাসীরা। তৎক্ষণাৎ ওসি সালাহ উদ্দিন ও এসি রবিউল ইসলামসহ কর্মকর্তারা জিম্মিদের উদ্ধারে অগ্রসর হওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। তারা এগোতে থাকলে গুলি-বোমা ছুড়তে থাকে দুর্বৃত্তের দল। এতে গুলিবিদ্ধ হন সালাহ উদ্দিন ও রবিউলসহ বেশ কিছু পুলিশ সদস্য। তাদের উদ্ধার করে ভর্তি করা হয় ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতাল ও ইউনাইটেড হাসপাতালসহ বিভিন্ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রে। এসময় বন্ধ করে দেওয়া হয় কাকলী, বনানী, গুলশান ১ নং মোড়, নতুন বাজার, নর্দা থেকে গুলশান এলাকায় প্রবেশের সব পথ।

রাত পৌনে ১১ টার দিকে জিম্মি পরিস্থিতি নিয়ে মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্টের মুখপাত্র জন কিরবি ঢাকার ঘটনা নিয়ে সংবাদ সম্মেলন করেন। কিরবি বলেন, ‘দূতাবাসের পক্ষে কাজ করা সব মার্কিন নাগরিকের দায়িত্ব আমাদের। কোনো মার্কিন নাগরিক এবং স্থানীয় কোনো কর্মকর্তা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন কি না, তা নির্ধারণ করতে আমরা স্থানীয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কাজ করছি।’

শুক্রবার রাত ১১টা

gulsha-trajedi

 

খবর পেয়ে রাত সোয়া ১১টার দিকে ঘটনাস্থলে যান র‌্যাবের মহাপরিচালক (ডিজি) বেনজীর আহমেদ। সেখানে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, এ ঘটনার শান্তিপূর্ণ সমাধানের চেষ্টা করা হচ্ছে। ভেতরে বেশ কয়েকজনকে জিম্মি করা হয়েছে। বেনজীর আহমেদ যখন কথা বলছিলেন তখন ঘটনাস্থলে পৌঁছায় স্পেশাল উইপন্স অ্যান্ড ট্যাক্টিকস (সোয়াট) টিম। র‍্যাবের মহাপরিচালকএসময় গণমাধ্যমকে ঘটনাস্থল থেকে সরাসরি সম্প্রচার বন্ধের আহ্বান জানান। বন্ধ হয়ে টেলিভিশনে সরাসরি সম্প্রচার ।

রাত ১২টা

রাত ১২টায় খবর আসে, গুলিবিদ্ধ হয়ে ইউনাইটেড হাসপাতালে ভর্তি হওয়া ওসি সালাহ উদ্দিন মারা গেছেন। তার কিছুক্ষণ পর আসে গুলিবিদ্ধ এসি রবিউলের মৃত্যুর খবরও। এরমধ্যে গুলশান ৭৯ নম্বর সড়কে বাড়তে থাকে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের উপস্থিতি। রাত সাড়ে ১২টায় ঘটনাস্থলে পৌঁছায় পুলিশের বোমা নিষ্ক্রিয়কারী দল, ৪টি এপিসি কার। উপস্থিত হন ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়া। তখন জানানো হয়, রেস্টুরেন্টটির ভেতরে বিদেশি নাগরিকসহ ৩০ জনের বেশি মানুষকে সন্ত্রাসীরা জিম্মি করেছে।

তার আগে রাত সোয়া ১২টার দিকে রেস্টুরেন্ট পর্যবেক্ষণকারী আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর এক সদস্য জানান, বেকারিটি সম্পূর্ণ অন্ধকারে। ভেতরে ঢুকে প্রথমেই আলো নিভিয়ে দেয় জিম্মিকারীরা। অন্ধকার থাকায় আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারছিলো না।

শনিবার রাত ১টা

এরমধ্যে ঘটনাস্থলে জড়ো হয়ে স্বজনের খোঁজ নিতে থাকেন জিম্মি লোকদের আপনজনেরা। তখন কোনো কোনো স্বজন তাদের সঙ্গে জিম্মি কারও কারও কথা হয়েছে বলেও জানান। এমনকি তারা বাঁচার আকুতি প্রকাশ করেছেন বলেও তা বর্ণনা করেন। ওইসময় রেস্টুরেন্ট থেকে পালিয়ে আসা এক কর্মী জানান, এতে থাকা অতিথিদের বেশিরভাগই বিদেশি। রাত সোয়া ১টার দিকে অভিযান পরিচালনার স্বার্থে ওই এলাকায় আলো জ্বালায় ফায়ার সার্ভিস। এরমধ্যে শুরু হয় প্রশাসনের ঊর্ধ্বতনদের বৈঠক। এর মিনিট দশেক পর ঘটনাস্থল পরিদর্শনে আসেন পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) একেএম শহীদুল হক।

বাংলাদেশ সময় রাত দেড়টার দিকে মার্কিনভিত্তিক সাইট ইন্টেলিজেন্স গ্রুপ একটি টুইট পোস্ট করে যাতে ইসলামিক স্টেটের (আইএস) জঙ্গিরা এই হামলা চালিয়েছে বলে দাবি করা হয়। আইএসের কথিত বার্তা সংস্থা আমাক নিউজ এই তথ্য জানিয়েছে বলে টুইটে উল্লেখ করে সাইট ইন্টেলিজেন্স।

শনিবার রাত ২টা

রাত পৌনে ২টার দিকে রেস্টুরেন্টের বাইরে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলে ভেতরের অবস্থার বিবরণ দেন কর্মচারী সুমন রেজা। তিনি জিম্মি সংকট থেকে পালিয়ে বেঁচে আসেন। সুমনই জানান, ভেতরে ৭-৮ জন সন্ত্রাসীর হামলার কথা এবং সেখানে বেশ কিছু লোকের জিম্মি হওয়ার কথা।

শনিবার রাত ৩টা

রাত পৌনে ৩টার দিকে রেস্টুরেন্টটির পাশের বাড়ি থেকে আটকে পড়া দু’জনকে উদ্ধার করে আনে সোয়াট। উদ্ধার হওয়া দু’জন রেস্টুরেন্টের আর্জেন্টাইন ডিয়াগো ও বাংলাদেশি বেলারোস। সোয়াটের একটি দল বুলেট প্রুফ ঢালের সহায়তায় বাড়িটিতে ঢুকে দু’দফায় দু’জনকে উদ্ধার করে। বাহিনীর সদস্যরা একজন সামনে একজন পেছনে, আর সামনে দু’জন এভাবে চতুর্মুখী দৃষ্টি রেখে অভিযানে যান।

শনিবার ভোর ৪টা

জিম্মি সংকটের প্রায় আট ঘণ্টা পর রাত ৪টার দিকে অভিযানে নামে ৠাবের নেতৃত্বে যৌথবাহিনী। তবে শুরুতেই অন্তত পাঁচটি সাউন্ড গ্রেনেডের শব্দ শোনা যায়। ভোর ঠিক ৪টায় ভেতর থেকে পুলিশ এক তরুণকে আটক করে। গ্রেপ্তার এড়াতে পালানোর সময় তাঁর পায়ে গুলি করে পুলিশ। এরপর ৪টা ৫ মিনিটে আরও একটি গ্রেনেড বিস্ফোরণ হয়।

শনিবার ভোর ৫টা

আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী যৌথ বাহিনী অভিযান পরিচালনার জন্য প্রস্তুত হন। যৌথ বাহিনীতে ছিল- সেনাবাহিনী, পুলিশ, র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‍্যাব), বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি), নৌবাহিনীর কমান্ডো এবং বিশেষ বাহিনী সোয়াত।

অন্যদিকে, গুলশানে হামলার প্রেক্ষিতে বাংলাদেশে অবস্থানরত নাগরিকদের নিরাপদ আশ্রয়ে থাকার পরামর্শ দেয় যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের দূতাবাস। সন্ত্রাসী হামলার পর ঢাকাজুড়ে রেড অ্যালার্ট জারি করা হয়। নিরাপত্তা বলয় গড়ে তোলা হয় রেস্টুরেন্টকেন্দ্রিক ৪ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে।

শনিবার সকাল ৬ টা

সন্দেহভাজন হিসেবে রেস্টুরেন্টের সামনে থেকে দু’জনকে আটক করে ডিবি। সে দু’জন হলেন, রেস্টুরেন্টের সিকিউরিটি গার্ড হায়দার ও রান্নার সহকারী নাসির।

শনিবার সকাল ৭টা

সকাল সাড়ে ৭টার দিকে মাঠে আসে সেনাবাহিনীর বিশেষ কম্যান্ডো দল। আসে সেনাবাহিনীর ১১টি এপিসি, ১৬টি জিপ ও ৩টি ভ্যানসহ বেশ কিছু সাঁজোয়া যান। দায়িত্ব পালন করতে দেখা যায় মিলিটারি পুলিশকে। সেনাবাহিনীর নেতৃত্বাধীন যৌথবাহিনী ফের অভিযানে নামে। গুলি-গ্রেনেডে প্রকম্পিত হতে থাকে গুলশান এলাকা।

শনিবার সকাল ৮টা

সোয়া ৮টার পর থামতে থাকে গুলির শব্দ। এগোতে থাকে ফায়ার ব্রিগেড। মিলতে থাকে জিম্মিদশার অবসানের ইঙ্গিত। সেনা কমান্ডোদের অভিযানের মুখে প্রায় ২০ মিনিট পর গুলির শব্দ থেমে যায়। সোয়া ৮টায় ভেতরে ঢুকতে দেখা যায় ফায়ার ব্রিগেডের সদস্যদের। প্রথমেই অক্ষত অবস্থায় বের করে আনা হয় কয়েকজন নারী ও শিশুকে। এরপর একাধিক আহত ব্যক্তিকে বের করে আনা হয়। এদের মধ্যে একজন বিদেশি নাগরিকও ছিলেন।

শনিবার সকাল ৯ টা

৮টা ২০ মিনিটে র‌্যাবের একটি অ্যাম্বুলেন্স বাইরে বের হয়ে যেতে দেখা যায়। ৮টা ২৭ মিনিটে এগিয়ে যায় সেনাবাহিনীর চারটি অ্যাম্বুলেন্স। ৮টা ৩৪ মিনিটে ঘটনাস্থলে পৌঁছান সেনাপ্রধান জেনারেল আবু বেলাল মো. শফিউল হক। একইসময়ে পৌঁছান নৌবাহিনী প্রধান অ্যাডমিরাল নিজাম উদ্দিন আহমেদ ও ফায়ার সার্ভিসের মহাপরিচালক (ডিজি) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আলী আহমেদ খান। ৮টা ৪০ মিনিটে পুলিশের একটি অ্যাম্বুলেন্স উদ্ধারকৃতদের নিয়ে ঘটনাস্থল থেকে বের হয়ে যায়। ৯টা ২ মিনিটে ফের বিকট শব্দে কেঁপে ওঠে গুলশানের ৭৯ নম্বর রোড। ৯টা ৫ মিনিটে ঘটনাস্থল থেকে নৌ ও সেনাপ্রধানদের প্রস্থান।

শনিবার সকাল ১০ টা

৪৫ মিনিটের কমান্ডো অভিযানের পর সকাল সাড়ে ৯টার দিকে জিম্মি থাকা ২০ জনের মরদেহ ও জঙ্গী সাতজনের মধ্যে ৬ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয় রেস্টুরেন্টটি থেকে। সেখান থেকে জীবিত উদ্ধার করা হয় অন্তত ১৩ জনকে। উদ্ধারকৃতদের মধ্যে একজন জাপানি নাগরিক।

এরপর শনিবার দুপুর সোয়া ১টার দিকে সংবাদ সম্মেলন করে অভিযান নিয়ে প্রেসস ব্রিফিং করেন আইএসপিআর ।