গুলশানের সেই মৃত্যুপুরী থেকে নতুন জীবন ফিরে পাওয়াদের বর্ণনায় উঠে এলো ঘটনার বীভৎসতা!

৩:১৫ পূর্বাহ্ন | রবিবার, জুলাই ৩, ২০১৬ Breaking News, Uncategorized, আলোচিত বাংলাদেশ, স্পট লাইট

সময়ের কণ্ঠস্বর – শুক্রবার রাতে একদল বন্দুকধারী রাজধানীর কূটনীতিকপাড়ার হলি আর্টিজেন বেকারিতে ঢুকে বিদেশিসহ বেশ কয়েকজনকে জিম্মি করে। শনিবার দুপুরে সেনাবাহিনীর সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, গুলশানের হোলি আর্টিজান বেকারিতে হামলার ঘটনায় মোট জিম্মি  হয়ে পড়া ২০ জন সহ হামলাকারী  ৬ জঙ্গীর মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়েছে।  এছাড়া বিদেশি নাগরিকসহ মোট ১৩জনকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে। নিহত হয়েছেন পুলিশের দুই কর্মকর্তা ।

এ ঘটনায় শুধু বাংলাদেশ নয়, বিশ্ব গনমাধ্যমেও ব্যপক আলোচিত হয়েছে। সারাদেশের মানুষসহ প্রবাসী বাংলাদেশীদের প্রতিটা মুহুর্ত কেটেছে উৎকণ্ঠায় । কিন্তু গনমাধ্যমের উপর কড়াকড়ি থাকায় সব ঘটনার প্রকাশ পাচ্ছিলোনা সাথে সাথে। এতে করে অনেকেই আরো বেশি উৎকণ্ঠায় পড়েন ।

রেস্টুরেন্টে আটকে পড়া দেশী-বিদেশী নাগরিকরা ‘জিম্মি সংকটের’ লোমহর্ষক বর্ণনা দিয়েছেন। প্রায় ১২ ঘণ্টা ধরে টয়লেট, ছাদ, পানির ট্যাংকে বসে মৃত্যুর বিভীষিকা প্রত্যক্ষ করেছেন। জীবন বাঁচাতে দোতলার ছাদ থেকে লাফিয়েও পড়েছেন কেউ কেউ। তাদের বর্ণনায় উঠে আসে ঘটনার বীভৎসতা। অভিযান শেষে হলি আর্টিজানের কয়েকটি ছবি গনমাধ্যমে প্রকাশ পায়। আর এতে দেখা গেছে, গলাকাটা লাশ পড়ে আছে হোটেলের নিচতলার মেঝেতে, সিঁড়ির পাশে। নারী-পুরুষ একসঙ্গে মৃত্যুকে জড়িয়ে ধরেছেন এমন সব দৃশ্য উঠে এসেছে প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনায়।

সন্ত্রাসীরা রেস্তোরাঁয় ঢুকেই হামলা চালায়। শুরুতে ফাঁকা গুলি ছুড়তে থাকে। এতে হলি আর্টিজানে থাকা অতিথি ও কর্মকর্তা-কর্মচারীরা প্রাণভয়ে ছোটাছুটি শুরু করেন। কেউ কেউ বাথরুম ও রান্নাঘরে লুকানোর চেষ্টা করেন। হোটেলের বেশ কয়েকজন বেয়ারা ও বাবুর্চি প্রাণ বাঁচাতে ভবনের ছাদে গিয়ে আশ্রয় নেন। কিন্তু ভবনের বিভিন্ন স্থানে তল্লাশি শেষে ছাদেও পৌঁছে যায় অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীরা। এ সময় ছাদ থেকে লাফিয়ে পড়েন তারা।

ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী রেস্তোরাঁর জুসবার ম্যান লেলিন হামলার অন্যতম প্রত্যক্ষদর্শী। হামলার সময় হোটেলের অন্য কর্মচারীদের সঙ্গে তিনিও ছাদে গিয়ে আশ্রয় নেন। তিনি বলেন, সবকিছু অন্যদিনের মতোই চলছিল। অতিথিরা বিভিন্ন টেবিলে খাবার খাচ্ছিলেন আর গল্প করছিলেন। আমরা খাবার পরিবেশন ও রান্না করছিলাম। এর মধ্যে দরজার কাছে হঠাৎ বিকট শব্দে একটা কিছু বিস্ফোরণ হয়। এর পরপরই এলোপাতাড়ি গুলি করতে করতে রেস্তোরাঁয় ঢুকে পড়ে বেশ কয়েকজন অস্ত্রধারী।

gul-hamla

লেলিন বলেন, সাধারণত রেস্তোরাঁয় স্বল্প আলো জ্বলে। তাই হামলাকারীদের পুরোপুরি চেনা যাচ্ছিল না। তবে স্বল্প আলোতেই তাদের হাতের অস্ত্রগুলো চকচক করছিল। তাদের পরনে বুলেটপ্র“ফ জ্যাকেটের মতো কিছু একটা ছিল।

লেলিন জানান, হামলার সময় তিনি ভাগ্যজোরে বেঁচে যান এবং নতুন জীবন পান। কারণ ওই সময় তিনি এক গ্লাস জুস নিয়ে রেস্তোরাঁর ভেতরের একটি জায়গায় পরিবেশন করতে গিয়েছিলেন। ফিরে এসেই হামলাকারীদের গোলাগুলির মুখে পড়ে যান।

তিনি বলেন, হামলাকারীদের প্রথম শিকারে পরিণত হন রেস্তোরাঁর পিৎজা সেফ সাইফুল ইসলাম। তাকে প্রথমেই গুলি করে সন্ত্রাসীরা। এরপর আল্লাহু আকবার চিৎকার দিয়ে বিদেশী অতিথিদের গুলি করতে শুরু করে।

তিনি জানান, প্রাণভয়ে হুড়োহুড়ি করে একটা ছোট বাথরুমে আশ্রয় নেন রেস্তোরাঁর কয়েক জন কর্মকর্তা-কর্মচারী। পরে একে অপরের সহায়তায় অনেকে ছাদ থেকে লাফিয়ে পড়েন। বেশ কয়েকজন ছাদে থাকা পানির ট্যাংকের মধ্যে আশ্রয় নেন। ছাদ থেকে লাফিয়ে পড়তে গিয়ে আহত হন পিৎজা অ্যাসোসিয়েট মুন্না, বেকারি ডিসওয়াশার শাওন। হামলার সময় পুরো রেস্তোরাঁয় অন্তত ৪০/৪৫ জন স্টাফ ছিল। গুলির শব্দ শুনে তাদের অনেকে কান্নায় ভেঙে পড়েন। উচ্চৈঃস্বরে দোয়া-দরুদ পড়তে শুরু করেন অনেকে। লেলিন বলেন, হামলাকারীরা বেছে বেছে বিদেশীদের হত্যা করে। তবে তারা ইচ্ছে করলে সবাইকেই হত্যা করতে পারত।

রাজধানীর গুলশানের হলি আর্টিজান বেকারি অ্যান্ড রেস্টুরেন্টে জিম্মি থাকা একটি পরিবারের ৪ সদস্য বাঁচার আকুতি জানিয়ে পুলিশকে গুলি না করার অনুরোধ করেছিল। শুক্রবার রাত পৌনে ১১টায় পরিবারটির পক্ষ থেকে পুলিশকে এ তথ্য জানান বনানী এলাকার বাসিন্দা আনোয়ারুল হক। বনানীর বেসিক ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের পরিচালক হাসানাত তার স্ত্রী, ৯ বছরের মেয়ে ও ৬ বছরের ছেলেকে নিয়ে হলি আর্টিজান রেস্টুরেন্টে যান।

ঘটনার সময় তিনি পরিবারসহ সন্ত্রাসীদের হাতে জিম্মি হয়ে পড়েন। সেখান থেকে রাত ১০টা ৪১ মিনিটে মোবাইল ফোনে তার চাচা আনোয়ারুল হককে জানান, পুলিশ যেন এখানে গুলি না করে। গুলি করলে ওরা আমাদের বাঁচতে দেবে না। কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে দুই-তিন লাইনে এ কথা বলেই তিনি ফোনটি কেটে দেন। এরপর তার চাচা দ্রুত এ বিষয়টি পুলিশকে জানান। ইঞ্জিনিয়ার হাসানাতের পরিবারের মধ্যে উৎকণ্ঠা ও উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়ে। ইঞ্জিনিয়ার হাসানাত ও তার পরিবারকে অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার করেছিল সেনাবাহিনী। এ সময় তিনি বলেন, আল্লাহর শুকরিয়া। আমরা নতুন জীবন পেলাম।

আর্টিজান রেস্টুরেন্টের হিসাবরক্ষক ইমাম হোসেনের খোঁজে রাতেই ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন তার বাবা আবদুল খালেক। তিনি জানান, মাত্র ৬ মাস আগে তার ছেলে ওই রেস্টুরেন্টে চাকরি নিয়েছিল। সে বাবাকে বাঁচানোর জন্য আকুতি জানান। ফোন পেয়ে তার বাবা ছুটে এসে জানান, ১২টা ১০ মিনিটে তিনি সর্বশেষ ছেলের সঙ্গে কথা বলেছেন। এরপর মোবাইল ফোনে রিং হলেও তার ছেলে রিসিভ করেনি।

হলি আর্টিজানে জিম্মি হওয়াদের মধ্যে নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির ছাত্রী তার বাবাকে ফোন করে বাঁচার আকুতি জানান। তার বাবা বলেন, ইফতারের কিছুক্ষণ পরই মেয়ে আমাকে ফোন করে বলে, বাবা আমরা বিপদে, আমাদের বাঁচাও। ওই শিক্ষার্থীর বাবা বোরহান বলেন, বিকেলের দিকে তার মেয়ে তার ৪/৫ জন বান্ধবীকে নিয়ে ওই রেস্টুরেন্টে খেতে যায়। ফোনে মেয়ে জানিয়েছে ভেতরে অস্ত্রধারীরা সবাইকে জিম্মি করে ঘুরে বেড়াচ্ছে।

আমেরিকান স্ট্যান্ডার্ড স্কুলের প্রিন্সিপাল লোরি অ্যান ওয়ালশ ইমদাদ ফেসবুকে তার পেজে লিখেছেন, হামলাকারীরা ঢুকেই ইতালীয় বেকার ও তার স্ত্রীকে গুলি করে। তারা ২০ জন বিদেশীকে জিম্মি করে।

রেস্তোরাঁটির সুপারভাইজার ও ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী সুমন রেজা ঘটনার বর্ণনা দিয়ে বলেন, ‘আমরা ব্যস্ত ছিলাম। হঠাৎ করে শুনি গোলাগুলি হচ্ছে। দেখি আমাদের পিৎজা বানানোর যে কিচেন, তার সামনে দু’জন লোক। ওরা সেখান থেকে প্রথম আক্রমণ শুরু করে। প্রথমে ফাঁকা গুলি করে। হোটেলের অতিথিরা ফ্লোরে শুয়ে পড়েন যার যার মতো করে। আমরা যে যেভাবে পেরেছি ছাদে চলে যাই।

সুমন রেজা আরও বলেন, হামলাকারীদের বয়স হবে ২২ থেকে ২৮ বছর। দু’জনের মুখ ভালোভাবে দেখেছি, তাদের দাড়ি ছিল না। হামলাকারীরা প্রায় দশ-বারোটি শক্তিশালী বোমা নিক্ষেপ করে। বোমার বিস্ফোরণে পুরো বিল্ডিং কাঁপছিল। আমি (সুমন) কয়েক জন ছাদ থেকে লাফ দিয়ে নিরাপদে অবস্থান নেই। এ সময় হোটেলের লোকজন ভয়ে তারা দিগি¦দিক পালাতে থাকেন। কেউ কেউ চেয়ার-টেবিলের নিচে শুয়ে পড়েন।

আটকে পড়া সমীরের এসএমএস : হলি আর্টিজানে আটকা পড়া একজন তার ভাইয়ের সঙ্গে মোবাইল ফোনে এসএমএস আদান-প্রদান করে। শুক্রবার রাত পৌনে একটা থেকে শনিবার সকাল সোয়া ছয়টা পর্যন্ত যোগাযোগ রাখতে পেরেছিলেন তার ভাই। অপেক্ষমাণ ভাই ও তিতুমীর কলেজের ছাত্র গোপাল রায় বলেন, কিচেনে বাবুর্চি হিসেবে কাজ করেন তার বড় ভাই সমীর রায়। ভাগ্নে রিন্টু কীর্তনীয়াও একই রেস্তোরাঁয় কাজ করে। তারা দু’জন একই সঙ্গে ভেতরে একটি টয়লেটে জিম্মি অবস্থায় ছিলেন। সকালে রিন্টুকে উদ্ধার করা হয় এবং পরে সমীরকে উদ্ধার করা হয়। রাত সাড়ে নয়টায় গোপাল প্রথম ফোন দেন সমীরকে। তিনি ফোন ধরেননি। রাত ১টা ৪৪ মিনিটে সমীর তার ভাই গোপালের পাঠানো এসএমএসের প্রথম জবাব দেন। গোপাল লিখেন কী অবস্থায় আছেন? সমীরের জবাব আমি ও ভাগ্নে ভালো আছি। ওরা লক করে দিছে দরজা বাইরে থেকে।

গোপাল : র‌্যাব সব দেখতেছে, আপনাদের যাতে ক্ষতি না হয়, তাই কিছু করতেছে না। সমীর : ছোট সুমন জানে আমাদের টয়লেট কোথায়। আমরা সেখানে। পারলে ওয়াল ভাঙো। গোপাল : ফেসবুক অন করেন। প্লিজ গিভ মি ওয়ান পিকচার। রাত ২টা ১৫ মিনিটে গোপাল আবার এসএমএস পাঠান। গোপাল : ওরা কি জানে আপনারা টয়লেটে? সমীর : হ্যাঁ। গোপাল : আপনাদের কিছু বলে কি? সমীর : ঠিক আছি। আমাদের কাছে কিছু চায় না। আমাদের তালা মেরে রেখেছে। গোপাল : আপনারা টয়লেটে এক সাইড হয়ে বসেন। ওরা ফায়ার করতে পারে। সমীর : হ্যাঁ, আছি।

ভোর ৪টা ৪৮ মিনিটে গোপাল আবার এসএমএস করেন সমীরকে। গোপাল : দাদা, এখন কেমন? সমীর : এই তো। ভোর ৫টা ২৮ মিনিটে গোপাল আবারও বার্তা পাঠান। গোপাল : আমরা সবাই আশীর্বাদ করি সুস্থভাবে আমাদের কাছে ফিরে আসেন। সমীর : হ্যাঁ, ভাই। ভোর ৫টা ৪৮ মিনিটে সমীর গোপালকে এসএমএস দেন। সমীর : এখন হয়তো র‍্যাব ঢুকবে। তোমরা তাড়াতাড়ি টয়লেটে আসো। এখানে খুব কষ্টে আছি। গোপাল : আমি এক মেজরকে বলেছি। সকাল ৬টা ২২ মিনিটে গোপাল বার্তা পাঠান। ‘প্লিজ বলেন এখন কেমন আছেন?’ তবে সমীর ওই বার্তার কোনো জবাব দেননি। গোপাল জানিয়েছেন, তাদের বাড়ি বরিশালের আগৈলঝাড়া উপজেলার জোগাড়পাড় গ্রামে। তারা দুই ভাই, তিন বোন। গোপাল নিজেও গুলশানের ৫০ নম্বর সড়কে একটি রেস্তোরাঁয় কাজ করেন। তবে শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত গোপালকে উদ্ধার করা হয়েছে।