থামছেনা তনুর মায়ের কান্না

৩:৪৫ অপরাহ্ন | বুধবার, জুলাই ৬, ২০১৬ আলোচিত বাংলাদেশ

সময়ের কণ্ঠস্বর ডেস্ক –   নৃশংসতার বলি হয়ে গত ২০ মার্চ কুমিল্লা সেনানিবাসের জঙ্গলে প্রাণ হারান কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজছাত্রী ও নাট্যকর্মী সোহাগী জাহান তনু। তনু না থাকায় এবার ঈদে নতুন জামা-কাপড় কেনা হয়নি পরিবারের কারোরই। এখন তনুর স্মৃতিকেই খুঁজে বেড়াচ্ছেন তারা।

tonur-maa

এদিকে, হত্যাকাণ্ডের প্রায় সাড়ে ৩ মাস পেরিয়ে গেলেও এ পর্যন্ত মামলার রহস্য উদঘাটন বা ঘাতকদের শনাক্ত করতে পারেনি মামলার তদন্তকারী সংস্থা সিআইডি। মামলার তদন্তে দৃশ্যমান অগ্রগতি বা আসামি গ্রেফতার না হওয়ায় তনুর পরিবার ও স্বজনদের মাঝে ক্ষোভ বিরাজ করছে।

জানা যায়, এবার ঈদ আনন্দ নেই দেশব্যাপী আলোচিত কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজছাত্রী ও নাট্যকর্মী সোহাগী জাহান তনুর পরিবারে। গত সোমবার দুপুরে তনুর বাবা, মা ও ছোট ভাই আনোয়ার হোসেন রুবেল ময়নামতি সেনানিবাসের বাসা থেকে গ্রামের বাড়ি মুরাদনগর উপজেলার মির্জাপুরে যান। বাড়ির পাশের কবরস্থানে সমাহিত করা হয়েছে তনুকে।

তনুর ছোট ভাই আনোয়ার হোসেন রুবেল জানান, ‘আমরা দুই ভাইয়ের একমাত্র ছোট বোন ছিল তনু। তাই সে সবাইকে নিয়ে উচ্ছ্বাসে মেতে থাকতো। সে বাসায় ৮/১০ পদের রান্না করতো। হালিম, পুডিং, চটপটি, কেক, পিঠা, কেক,ফিন্নি, পোলাও, মাংস এসব রান্না নিয়ে ঈদের ২/৩ দিন আগে থেকেই ব্যস্ত হয়ে পড়তো তনু আপা।

বড় ভাই নাজমুল হোসেন ঢাকা থেকে টাকা পাঠালে রোজার শেষের দিকে শুরু হতো ঈদের কেনাকাটা, বাবাও টাকা দিতেন। মায়ের কাপড়, বাবা এমনকি আমার কাপড়ও পছন্দ করে দিত তনুই। কিন্তু এবার কিছুই কেনা হয়নি।’

তনুর বাবা ইয়ার হোসেন জানান, ‘আমার এবার ঈদ নেই। আমি কখনোই ঈদ বাড়িতে করিনি। প্রতিবছর ঈদের দিন আমার মেয়ে তনু ঘরের সকল রান্না-বান্না করতো। এবার তো তনু নেই। তাই তার কবরের পাশেই গ্রামের বাড়িতে ঈদের দিন কাটাবো। বড় ছেলে নাজমুল ঢাকা থেকে সরাসরি গ্রামের বাড়িতে চলে যাবে।

তিনি আরো জানান, তনুর দাদার বাড়িতেই থাকেন। রোজা শুরুর আগেই তাকে সেনানিবাসের কোয়ার্টারে নিয়ে আসা হতো। কোরবানির ঈদের পর বাড়ি যেতেন। এবার তাকে আনা হয়নি। গ্রামের বাড়িতে বিদ্যু ছিল না। তাই কোয়ার্টারেই ঈদ করা হতো। এবার বাড়িতে বিদ্যুৎ এসেছে।

বাড়িতে আলো এসেছে, কিন্তু আমার ঘরের আলো নিভে গেছে, আব্বা বাড়িতে অসুস্থ, তাই বাড়িতেই তনুকে ছাড়াই এ প্রথম ঈদ করা হচ্ছে।’

ইয়ার হোসেন ক্ষোভের সঙ্গে জানান, ‘দেশের সকল হত্যাকাণ্ডের বিচার হয়, আমার তনুর বিচার হবে না কেন ? এতোদিন হয়ে গেল সিআইডি কিছুই করছে না, শুধু বিচারের আশ্বাস দিচ্ছে।’

সাড়ে ৩ মাসেও মামলার অগ্রগতি নেই :

গত ২০ মার্চ রাতে তনুর মরদেহ কুমিল্লা সেনানিবাসের একটি জঙ্গল থেকে উদ্ধার করা হয়। পরদিন কুমিল্লা মেডিকেল কলেজের ফরেনসিক বিভাগে ময়নাতদন্ত শেষে মুরাদনগর উপজেলার মীর্জাপুর গ্রামে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়। পরে আদালতের নির্দেশে ৩০ মার্চ দ্বিতীয় দফায় ময়নাতদন্ত করা হয়। দুই দফায় তদন্তকারী কর্মকর্তা/সংস্থা পরিবর্তন শেষে ৩১ মার্চ মামলাটি সিআইডিতে হস্তান্তর করা হয়।

গত ৪ এপ্রিল তনুর প্রথম ও ১২ জুন দ্বিতীয় ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে দেয়া তার মৃত্যুর কারণ নির্ণয় করতে পারেনি কুমিল্লা মেডিকেল কলেজের ফরেনসিক বিভাগের ডাক্তাররা। প্রথম প্রতিবেদনে ধর্ষণের আলামত পাওয়া না গেলেও দ্বিতীয় ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে ‘সেক্সুয়াল ইন্টারকোর্স’ উল্লেখ করায় তনুর পরিবারসহ দেশজুড়ে বিতর্কের জন্ম দেয়।

বিচারের দাবিতে দেশব্যাপী প্রতিবাদ-বিক্ষোভ এবং সরকারের উচ্চ পর্যায় থেকে বিচারের আশ্বাস দেয়া হলেও তদন্ত সংস্থা সিআইডি এখনো মামলার রহস্যের জট খুলতে পারেনি। তবে সিআইডির শেষ ভরসা তনুর ডিএনএ প্রতিবেদন।

সিআইডির ফরেনিক ল্যাবে তনুর ডিএনএ প্রতিবেদনে ৩ পুরুষের শুক্রানু পাওয়া গেলেও তা শনাক্ত করতে এখনো সন্দেহভাজনদের ডিএনএ সংগ্রহ করতে আদালতের অনুমতি নেয়া হয়নি। এতে তনু হত্যার রহস্য উদঘাটন ক্রমেই অনিশ্চয়তার দিকে ধাবিত হচ্ছে বলে তনুর পরিবার ও সচেতন মহলের আশঙ্কা।