ইমামের বর্ননায় শোলাকিয়া মাঠে ঈদের দিনের ঘটনার আদ্যোপান্ত

৬:৩৫ অপরাহ্ন | শনিবার, জুলাই ৯, ২০১৬ আলোচিত, আলোচিত বাংলাদেশ, স্পট লাইট

সময়ের কণ্ঠস্বর ডেস্ক-

উপমহাদেশের বৃহত্তম কিশোরগঞ্জের শোলাকিয়া ঈদগাহ মাঠের প্রবেশপথে সকাল সাড়ে ৮টার দিকে পুলিশের সঙ্গে জঙ্গিদের সংঘর্ষ হয়। জঙ্গিরা পুলিশকে লক্ষ্য করে বোমা নিক্ষেপ করে। পরে চাপাতি ও অস্ত্র নিয়ে তাদের ওপর হামলা চালায়। এতে দুই পুলিশ সদস্যসহ ৪ জন নিহত হয়। ঘটনার সময় সকাল ৯টার দিকে বয়ান (বক্তৃতা) শুরু করেন শোলাকিয়া মাঠের দ্বিতীয় ইমাম হাফেজ মাওলানা সোয়াইব আবদুর রউফ।

গতকাল শুক্রবার ইমাম হাফেজ মাওলানা সোয়াইব আবদুর রউফ শোলাকিয়া মাঠে ঈদের দিনের ঘটনার বর্ণনা করছিলেন।

সোয়াইব আবদুর রউফ বলেন, সকাল নয়টার কিছু আগে বয়ান শুরু করি। নয়টা ৪০ মিনিট পর্যন্ত আমার বয়ান করার কথা। কিন্তু নয়টা ৪৬ বেজে গেল, হুজুর (মাওলানা ফরিদ উদ্দিন মাসউদ) আসেননি, আমাকেও কেউ বয়ান থামাতে বলছে না। আমি ক্লান্ত হয়ে গেছি। আমাকে ইশারা দেওয়া হলো, বয়ান চালিয়ে যান। এ সময় প্রথম সন্দেহ হয়, কোথাও কিছু একটা সমস্যা হয়েছে।

তিনি বলেন, ১০টা পর্যন্ত বয়ান চালিয়ে যাই। এক পর্যায়ে আমি বক্তৃতা শেষ করে পেছনের দিকটায় গেলাম। সেখানে ডিসি (জেলা প্রশাসক) সাহেবের সঙ্গে অন্যদের কথোপকথন থেকে বুঝলাম ঝামেলা হয়েছে। তখন সিদ্ধান্ত হলো যে যথাসময়েই নামাজ হবে।

somoyerkonthosor--solakiya-

যখন সোয়াইব আবদুর রউফ বয়ান করছিলেন, তখন শোলাকিয়া মাঠের আধা কিলোমিটারের মধ্যে আজিমউদ্দীন হাইস্কুলের কাছে পুলিশের সঙ্গে জঙ্গিদের গোলাগুলি চলছিল। মাঠে অনেকেই বিষয়টি আঁচ করতে পেরেছিলেন। অনেকে পরিবার-পরিজনের ফোনে বিষয়টি জানতে পারেন। কিন্তু আবদুর রউফ ছিলেন অন্ধকারে। নামাজ শুরু হওয়ার মিনিট ১৫ আগে কোনো একটা সমস্যার আঁচ পান তিনি।

শোলাকিয়া মাঠের কাছে বিস্ফোরণের পর ইমাম মাওলানা ফরিদ উদ্দিন মাসউদ মাঠে উপস্থিত হতে পারেননি। তিনি শহরের পুরাতন স্টেডিয়ামে হেলিকপ্টার থেকে নামেন। সেখান থেকে মাঠে উপস্থিত হওয়ার কথা থাকলেও তাকে সার্কিট হাউসে যেতে হয়। এর মধ্যে ঈদের নামাজের সময় হয়ে যাওয়ায় বিকল্প ইমাম সোয়াইব আবদুর রউফ নামাজ পড়ান।

সোয়াইব আবদুর রউফ বলেন, শোলাকিয়ায় সাধারণত ঈদের জামাত পড়ান মাওলানা ফরিদ উদ্দিন মাসউদ। আর এর আগে আবদুর রউফ ৪০ মিনিট বয়ান করেন। এবার বয়ানের মাঝখানেই তার ভাই গণমাধ্যমে খবর পেয়ে একবার মুঠোফোনে বলছিলেন, শোলাকিয়ায় গণ্ডগোল হচ্ছে। কিন্তু তিনি তা কর্ণপাত করেননি। তিনি দেখেন, মাঠের পরিস্থিতি একদম স্বাভাবিক। তিনি নয়টার আগে বক্তৃতা শুরু করেন, কিন্তু যখন দেখলেন নির্ধারিত সময় পার হয়ে যাওয়ার পরও কেউ তাঁকে বক্তৃতা থামাতে বলছেন না, কিংবা ইমাম আসছেন না, তখন তার প্রথম সন্দেহ হয়। তিনি পেছনের দিকে তাকালে সেখান থেকে বক্তৃতা চালিয়ে যেতে ইশারা করা হয়।

সোয়াইব আবদুর রউফ বলেন, ঘটনার তাৎপর্য বুঝতে পেরে ও অন্যদের পরামর্শ অনুসারে নামাজ দ্রুততার সঙ্গে শেষ করা হয়। এরপর খুতবা ও দোয়াও একইভাবে সংক্ষিপ্ত করে শেষ করা হয়। কেননা, এই ঘটনার কোনো আঁচ যদি মাঠের কোনো অংশে পড়ত, তবে আরও বড় দুর্ঘটনা ঘটতে পারত।

সোয়াইব আবদুর রউফ বলেন, পবিত্র কোরআনে সুরা মায়েদায় আল্লাহ তাআলা বলেছেন, অন্যায়ভাবে কাউকে হত্যা করা মানে পুরো মানবজাতিকে হত্যা করা। সুতরাং, ধর্মের নাম নিয়ে কেউ এই ধরনের হত্যাকাণ্ড চালালে তা কোনোভাবেই ধর্মসিদ্ধ নয়। এটি অত্যন্ত দুঃখজনক এবং ইসলাম সম্পর্কে অজ্ঞতার বহিঃপ্রকাশ।

কিশোরগঞ্জের বড়বাজার এলাকার শাহাবুদ্দীন মসজিদের ইমাম সোয়াইব আবদুর রউফ শোলাকিয়া মাঠের নিয়োগপ্রাপ্ত দ্বিতীয় (বিকল্প) ইমাম। শোলাকিয়ার মূল ইমাম মাওলানা ফরিদ উদ্দিন মাসউদের অনুপস্থিতে এ বছর ১৮৯তম ঈদ জামাতের ইমামতি করেন তিনি।

প্রসঙ্গত, জঙ্গিরা শোলাকিয়া ঈদগাহ প্রবেশের চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ায় সেখানেই কর্তব্যরত পুলিশ সদস্যদের ওপর বোমা হামলা চালায় সন্ত্রাসীরা। বোমা বিস্ফোরণে অন্তত পুলিশের ১১ সদস্য আহত হন। এ সময় আহত পুলিশ সদস্যরা আত্মরক্ষার্থে আশপাশের বিভিন্ন জায়গায় আশ্রয় নেয়। তাদের মধ্যে কনস্টেবল জহিরুল ইসলাম (৩০) মুফতি মোহাম্মদ আলী (রহ.) জামে মসজিদের সড়কের উপর অবস্থিত টয়লেটে আশ্রয় নেয়ার চেষ্টা করলে সেখানেই তাকে চাপাতি দিয়ে কোপায় হামলাকারীরা। আহত অবস্থায় পুলিশের আরেক সদস্য আনছারুল হকের (২৮) মৃত্যু হয়। পরে অতিরিক্ত পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে হামলাকারীদের ধাওয়া করলে তারা সবুজবাগ এলাকার দু’টি বাসায় অবস্থান নিয়ে পুলিশের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে লিপ্ত হয়। বন্দুকযুদ্ধে পুলিশের গুলিতে এক আবির রহমান নামে এক জঙ্গি ঘটনাস্থলেই মারা যায়।