• আজ ২৩শে ফাল্গুন, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

দীর্ঘ ২০ বছর পর প্রকাশ হলো ওমর সানী-মৌসুমীর রোমাঞ্চকর প্রেমের অজানা গল্প !

৯:৫৫ পূর্বাহ্ন | সোমবার, জুলাই ১১, ২০১৬ বিনোদন, স্পট লাইট

বিনোদন ডেস্ক : সময়টা উনিশ’শ তিরানব্বই। নির্মাতা দিলিপ সোমের ‘দোলা’র সেটে প্রথম দেখা দু’জনের। পরিচয়টা সেখানেই জমে উঠে। শর্ট শেষেই বসতেন মুখোমুখি। চলতো আলাপ-সালাপ। কথায় কথায় মুগ্ধতা বাড়তে থাকে। যে মুগ্ধতার শেষ নেই। দিনে দিনে দু’জনের মাঝখানের দুরত্বটাও কমতে থাকে। পাশের মানুষটাকে মনোযোগ দিয়ে বোঝার সেকি আকুতি! পরিচয় পর্বেই আটকে রইল দুজনে। পাকাপাকিভাবে মনের বারান্দায় প্রবেশের আগেই শেষ হলো ‘দোলা’র শুটিং।

তারপর?
দু’জনের দেখা হয়না অনেকদিন। কথাও হয়না। মনের মাঝে গিজগিজ করে জমানো কথামালা। বুকের বামপাশটায় মোচড় দিয়ে উঠে। আসলে এমনটা তো হওয়ার কথা ছিলনা! তারা প্রেমে পড়েছেন? প্রশ্নটা তখন বাতাসে উড়ছিল। উত্তরটা মিলছিলো না। এই সম্পর্কটা আসলে কি? না প্রেম, না বন্ধুত্ব। তার মাঝামাঝিতে ঝুলে আছে দু’জনা। একে আসলে সংজ্ঞায়িত করা যায়না।

দুজনেই তখন ঢাকাই সিনেমার উঠতি তারকা। ডেব্যু ফিল্ম ‘কিয়ামত থেকে কিয়ামত’ দিয়ে মৌসুমী উঠে এসেছেন প্রাদপ্রদীপের আলোয়। তার অভিনয়ের ঝলকানিতে মুগ্ধ ঢাকাই সিনেমার দর্শক। আর‘চাঁদের আলো’তে অনবদ্য অভিনয় করে আলোচনিায় ছিলেন ওমর সানী। তাদের নিয়েই দর্শকদের আগ্রহটা একটু বেশিই ছিল। দুর্দান্ত ছিল ক্যামেরার সামনের কেমিস্ট্রি।

তারকা দম্পতি ওমর সানী-মৌসুমী। অভিনয় করতে গিয়ে দুজন দুজনার প্রেমে পড়েছিলেন তারা। তারপর বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন এই দম্পতি। এরপর কেটে গেছে দাম্পত্য জীবনের দীর্ঘ সময়।

hqdefault

ছবিটা মুক্তি পেল। সুপারহিট! হাউসফুল! হুল্লোড় পড়লো দেশজুড়ে। সালমান-শাবনুরের বিপরীতে বাংলা সিনেমায় নতুন এক জুটির আবির্ভাব হলো। নির্মাতারা নড়েচড়ে বসলেন। ছুটলেন দু’জনের কাছে। তাদেরকে সিনেমায় টানতে আদাজল খেয়ে নামলেন গাজী মাজহারুল আনোয়ার, শাহ আলম কিরন, শওকত জামিল,দেলোয়ার জাহান ঝনটু, মালেক আফসারি, এ জে মিন্টু, মনোয়ার খোকন, ওয়াকিল আহমেদ, জীবন রহমান, নুর হোসেন বলাই, রায়হান মুজিব, হাফিজউদ্দিন, মমতাজুর রহমান আকবর, নাদিম মাহমুদ,মতিন রহমান, এম এম সরকার, দিলিপ সোমরা।

রায়হান মুজিবের ‘আত্ম অহংকার’সহ আরো বেশ কটি সিনেমায় ফের একসঙ্গে তারা দু’জন। ঝুলে থাকা সম্পর্কটারও একটা গতি হলো। সংজ্ঞাহীন সম্পর্ক একটা সংজ্ঞায় দাড়ালো। সংজ্ঞার নাম ‘প্রেম’। প্রেমটা ছিল ছাইচাপা আগুনের মতো। বাইরে থেকে বুঝবার উপায় নেই ভেতরে কি চলছে! কিইবা জ্বলছে! প্রথমে তো কাকপক্ষীও টের পায়নি।

ঘটনাটা চাউর হওয়ার আগেই তড়িঘড়ি করে বিয়ে করে ফেললেন। ১৯৯৬ সালের ২ আগষ্ট। নতুন জীবন, সংসার। সংসারের মাঠে শুরু হলো নতুন ইনিংস। চলছে টেস্ট ম্যাচ। উইকেট ছাড়ার কোন তাড়া নেই। এক প্রান্তে সানী, আরেক প্রান্তে মৌসুমী। ব্যাটিং চলছে। রানও আসেছে। অপরাজিত কুড়ি।

তাই তো! কুড়িটা বছর কাটিয়ে দিলেন অনায়াশে। একটা ফ্যান, লাইট, মশারী, ছাদের নিচে। তাদের কোল আলো করে দু’ই সন্তান এলো। সন্তানরাও বড় হলো। নিজেদের বয়সও কম হলোনা। চল্লিশ ছাড়িয়েছেন দুজনেই। কিন্তু আজো ভালোবাসার কোন কমতি নেই। কানায় কানায় ভালোবাসায় পূর্ণ তাদের উত্তরার বাড়িটা। অনেকেই বলে আপনাদের মধ্যে নাকি ঝগড়ায় হয়না। কতোটা সত্য? মুচকি হেসে ওমর সানী জানালেন, ‘কে বলেছে ঝগড়া হয়না! আমরা তো প্রায়ই ঝগড়া করি। পেয়ারা নিয়ে ঝগড়া করি, কলা নিয়ে ঝগড়া করি!’ ঠিক কোন মন্ত্রে কুড়িটা বছর একসঙ্গে কাটিয়ে দিচ্ছেন? ‘শুধু বিশ্বাস’-বললেন সানী।

বিয়ের পরে অনেক অভিনেত্রীই অকালে হারিয়ে গেছে। বন্দি হয়েছে সংসার কারাগারে। মৌসুমীর সমসাময়িকদের মধ্যে শাবনুরসহ এমন অনেকেই হারিয়ে গেছেন। কিন্তু মৌসুমী আজো মিডিয়ায় সরব। আর এর জন্য সবচেয়ে বেশি অনুপ্রাণিত করেন তার স্বামী। যেমনটি জানালেন সানী, ‘সুজাতাকে যখন আজিম সাহেব বিয়ে করলো তারপর কিন্তু সুজাতা আর মিডিয়াই আসেনি। নাঈমের সঙ্গে বিয়ের পর শাবনাজেরও একই অবস্থা। শাবনাজ অনেক গুণী শিল্পী। তাকে পৃথিবী থেকে এক রকম বিচ্ছিন্নই রাখা হয়েছে। কিন্তু আমি চাইনি মৌসুমী হারিয়ে যাক। চেয়েছি ও মৃত্যুর আগ পর্যন্ত কাজ করুক। কারণ ব্যক্তি মৌসুমী আমার স্ত্রী কিন্তু অভিনেত্রী মৌসুমী সারা বাংলাদেশের মানুষের।’

বরং অভিনয়ের জন্য মৌসুমীকে পাশে থেকে সহযোগিতা করেছেন সানী। ‘আমি ওর শারিরীক গঠনে খেয়াল রেখেছি। দ্বিতীয় বাচ্চার নেয়ার সময় বলেছিলাম, তুমি ওয়াদা করো শরীর ফিট রেখে আবার অভিনয়ে ফিরবে তাহলে সন্তানটা নিতে পারো। ও আমার ওয়াদা রেখেছে। পরে আবার ফিরেছে অভিনয়ে।’ আপনার চোখে মৌসুমীর সবচেয়ে ভালো গুণ কি? ‘এমন মেয়ে সমাজে বিরল। সবাইকে সব পাত্রে রাখা যায়না। কিন্তু মৌসুমীকে যে পাত্রে রাখবেন সে পাত্রেই থাকবে। একজন প্রেসিডেন্টের সামনে কিভাবে কথা বলতে হবে সেটা যেমন জানে তেমনি একজন রিক্সাওয়ালার সঙ্গে কিভাবে কথা বলতে হবে সেটাও জানে।’

এবার ঈদ উপলক্ষে সম্প্রতি একটি টেলিভিশন অনুষ্ঠানে হাজির হয়েছিলেন এই জুটি। এ সময় তারা তাদের প্রেমে পড়ার গল্প শোনান। এ প্রসঙ্গে মৌসুমী বলেন, ‘সানী আমাকে প্রেমের প্রস্তাব দিয়েছিল। আসলে তখন আমার সিদ্ধান্ত নেওয়ার সাহস ছিল না। তাই সানীকে আমি না বলে দিয়েছিলাম। পরে সানী আমার সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ করে দেয়। শুধু তাই নয়, আমার সঙ্গে সিনেমা করবে না বলেও জানায়। তখন নিজেরই খুব খারাপ লাগতো। এভাবেই আমাদের প্রেমটা হয়েছিল। তারপর দুই দশকের বেশি ধরে একসঙ্গে আছি।’

মিডিয়াতে বিভিন্ন সময় তারকাদের নিয়ে নানা রকম খবর প্রকাশিত হয়। কিন্তু ওমর সানী-মৌসুমী পরস্পরের বন্ধনটা অনেক দৃঢ়। এ প্রসঙ্গে ওমর সানী বলেন, ‘আমরা দুজন-দুজনকে ভালোভাবেই বুঝি। যখন আমাদের নিয়ে নেতিবাচক কোনো খবর প্রকাশিত হয় তখন নিজেদের মধ্যে কথা বলি। পারস্পরিক বিশ্বাসই আমাদের ভালোবাসার শক্তি।’

বর্তমান প্রজন্মের অভিনেতা-অভিনেত্রীদের তারকা না হয়ে প্রকৃত শিল্পী হওয়ার পরামর্শও দেন সানী-মৌসুমী। পাশাপাশি দেশটাকে ভালোবাসতেও বলেন এই তারকা দম্পতি।

এ দম্পতির ফারদিন এহসান স্বাধীন নামের একটি পুত্র সন্তান ও ফাইনা নামের একটি কন্যা সন্তান রয়েছে। বর্তমানে ফারদিন লস অ্যাঞ্জেলেসে ফিল্মের উপর পড়াশোনা করছে। পাশাপাশি হলিউডের সিনেমায় সহকারী পরিচালক হিসেবেও কাজ শুরু করছে সানী পুত্র।

59667

‘দোলা’ সিনেমার মাধ্যমে প্রথম বড় পর্দায় জুটিবদ্ধ হন ওমর সানী-মৌসুমী। এরপর ‘আত্ম অহংকার’, ‘প্রথম প্রেম’, ‘মুক্তির সংগ্রাম’, ‘হারানো প্রেম’, ‘গরীবের রানী’,‘প্রিয় তুমি’, ‘শান্তি চাই’, ‘মিথ্যা অহংকার’, ‘লাট সাহেবের মেয়ে’ প্রভৃতি সিনেমায় অভিনয় করেন এই জুটি।