ধর্মান্তরিত মেধাবী যুবক ওজাকিকে নিয়ে নবীনগরে আলোচনার ঝড়

১:৪৮ পূর্বাহ্ন | বৃহস্পতিবার, জুলাই ১৪, ২০১৬ আলোচিত বাংলাদেশ

সময়ের কণ্ঠস্বর ডেস্ক –  গুলশান ও শোলাকিয়ায় জঙ্গি হামলায় নিখোঁজ চার যুবকের জড়িত থাকার তথ্য প্রকাশের পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ঘরছাড়া আরও যে ১০ যুবকের তথ্য দিয়েছে তাদেরই একজন ওজাকি।

dhormantrito

এদিকে ছেলের নিখোঁজের খবরে শয্যাশায়ী তার পিতা জনার্ধন দেবনাথ। পরিবারের অন্য সদস্যরাও করছেন কান্নাকাটি। যদিও ওজাকি হিন্দু ধর্ম ছেড়ে মুসলমান হয়েছেন। জাপানে স্থায়ীভাবে বসবাসকারী মেধাবী ওজাকি নিখোঁজ হলেন কীভাবে সেটি ভাবিয়ে তুলেছে তার পরিবারকে। নবীনগরের জিনদপুরের কড়ুইবাড়ি গ্রামে বাড়ি ওজাকির। গতকাল জিনদপুর বাজার আর গ্রামের এখানে-সেখানে আলোচনা হচ্ছিল জনার্ধনের ছেলে ওজাকিকে নিয়ে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কর্তৃক সম্প্রতি প্রকাশিত এ তালিকায় ওজাকির ছবি থাকার বিষয়টি মঙ্গলবার জানতে পারেন জানার্ধন। এরপরই ভেঙ্গে পড়েন তিনি। বাড়িতে গিয়ে তাকে পাওয়া গেছে শয্যাশায়ী। আত্মীয়স্বজনরাও ছুটে এসেছেন দূরদূরান্ত থেকে। জনার্ধনের প্রশ্ন, সেতো জাপানে ইউনিভার্সিটিতে প্রফেসারি করে। তাহলে কি জাপানে নাই? জনার্ধনের ৩ ছেলে-মেয়ের মধ্যে সবার বড় ছিলেন সুজিত দেবনাথ (৩২)। ধর্মান্তরিত হওয়ার পর নাম ধারণ করে সে সাইফুল্লাহ ওজাকি। কয়েকমাস আগে নবীনগর থানা পুলিশ তদন্ত করতে গেলে হতবাক হন তার বাবা জনার্ধন দেবনাথ। পুলিশ তাকে জানায় তার ছেলে জঙ্গিদের অর্থায়ন করে। ঢাকার উত্তরা পশ্চিম থানার সন্ত্রাসবিরোধী আইনে দায়ের করা একটি মামলা সূত্রে (মামলা নং ২৩, তারিখ: ২৪/৫/১৫ ইং) পুলিশ তদন্তে যায়। ওই থানা থেকে নবীনগর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার কাছে পাঠানো অনুসন্ধান স্লিপে বলা হয়- ঘটনার সঙ্গে জড়িত পলাতক আসামি সুজিত চন্দ্র দেবনাথ, পিতা-জনার্দন দেবনাথ, গ্রাম কড়ুইবাড়ি, ডাকঘর: জিনোদপুর। সে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে। তার নাম পরিবর্তন করে সাইফুল্লাহ ওজাকি নাম ধারণ করে। বর্তমানে সে জাপানে বসবাস করছে। সে মাঝে মধ্যে বাংলাদেশে আসে ও বিভিন্ন জঙ্গি সংগঠনের সঙ্গে যোগাযোগ রাখে। সে জেএমবি’র সক্রিয় সদস্য এবং আইএস-এর সমর্থক। এ বছরের ৪ঠা জানুয়ারি এই অনুসন্ধান স্লিপটি নবীনগর থানায় পাঠানো হয়। এরপরই গুলশান ও শোলাকিয়া হামলার পর নিখোঁজ হিসেবে তার নাম প্রকাশিত হয়।

পরিবারের সদস্যরা জানায়- সুজিত জিনদপুরের হুরুয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে পঞ্চম শ্রেণিতে বৃত্তি পায়। এরপর ভর্তি হয় ফতেহপুর উচ্চ বিদ্যালয়ে। সেখান থেকে সিলেট ক্যাডেট কলেজে ভর্তি হয় সে। সিলেট ক্যাডেট কলেজ থেকে এসএসসি ও এইচএসসি পাস করে। এই দু-পরীক্ষায় মেধা তালিকার শীর্ষে জায়গা করে নেয় সে। এরপরই বৃত্তি নিয়ে জাপানে চলে যায়। সেখানকার এশিয়া প্যাসিফিক ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হয়ে কৃতিত্বপূর্ণ ফলাফলের মধ্য দিয়ে শিক্ষাজীবন শেষ করে। এরপর জাপানের একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা শুরু করে। সুজিত ২০০১ সালে জাপান যাওয়ার পর সেখানে স্থায়ী হন। সেখানে যাওয়ার পর ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন তিনি।

সুজিতের পিতা জনার্ধন দেবনাথ জানান- তার ধর্মান্তরিত হওয়ার বিষয়টি জানতে পারেন তিনি অনেক পরে। ২০০৬ সালের দিকে। তিনি বলেন, আমাদের আগে বাইরের মানুষ জানতে পারে। তারা আমাকে প্রশ্ন করে সে ধর্মান্তরিত হয়েছে কিনা। তাছাড়া সে তখন দাড়িও রাখে। জানান একবছর আগে বাড়িতে এসেছিল সুজিত। স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান আবদুর রউফের বাড়িতে আসে প্রথম। এরপর চেয়ারম্যানকে নিয়ে আমাদের বাড়িতে আসে। কিন্তু ১০/১৫ মিনিট পরেই আবার চলে যায়। জনার্ধন জানান- এরপর মাস সাতেক আগে ছেলের সঙ্গে তার কথা হয়। তখন সে খোঁজখবর নেয়। কিন্তু সে এখন কীভাবে নিখোঁজ অইলো তা বুঝতে পারছি না। জনার্ধনের আরেক ছেলে অশিত দেবনাথ মারা যায় ২০০৪ সালে। মেয়ে রীনা দেবনাথকে বিয়ে দিয়েছেন। সুজিতই ছিল তার আশা ভরসা। জনার্ধন বলেন, আমার জীবনডা শেষ। কোনো রকমে বাইচ্চা আছি। আশা-ভরসা বলতে কোনো কিছু নেই। যদি তাড়াতাড়ি মরতে পারতাম। জনার্ধন জিনদপুর বাজারে কাপড়ের ব্যবসা করেন। স্থায়ী দোকান খোলার আগে বিভিন্ন হাটে ঘুরে ঘুরে কাপড় বিক্রি করতেন। ছেলে সুজিতের পড়াশোনার জন্যে তার শ্রমঘামের প্রশংসা আছে গ্রামে। সাইকেলে করে ছেলেকে নিয়ে যেতেন প্রাইভেটে। প্রাইভেট শেষ হলে আবার নিয়ে আসতেন। ছেলে ধর্মান্তরিত হয়ে দূরে সরে গেলে তার ভালোবাসা কমেনি ছেলের প্রতি। বলেন সে ব্রিলিয়ান্ট ছেলে। কয়েকমাস আগে পুলিশ এসে এসব বলার পর হতবাক হয়েছিলাম। নিখোঁজের খবরে একই অবস্থা আমার। জিনদপুর ইউপি চেয়ারম্যান আবদুর রউফ বলেন- মেধাবী ছাত্র হিসেবে সবাই তাকে আদর করতো। খুবই ভালো ছেলে ছিল সে। জাপানে গিয়ে অনার্স মাস্টার্স করেছে। পিএইচডি ডিগ্রি নিয়েছে। সেখানে বিয়েও করেছে। তার ৫ ছেলে-মেয়ে রয়েছে। তিনি বলেন, কয়েকমাস আগে পুলিশ আসার পর তাকে ফোন করে আমি এবিষয়ে জানতে চেয়েছিলাম। তখন সে আমাকে বলেছে এই অভিযোগ ঠিক নয়। তার বন্ধুরা হিংসাত্মক হয়ে তার অনিষ্ট করার জন্যে এই অভিযোগ এনেছে। আমার ধারণা আন্তর্জাতিক কোনো সংস্থা তার ব্রেইন ওয়াশ করে থাকতে পারে। সুজিতের মামা শংকর দেবনাথ বলেন- জাপানে পড়াশোনায় কৃতিত্বপূর্ণ ফলাফলের জন্য তাকে পুরস্কার দেয়া হয়। জাতিসংঘ মহাসচিব কফি আনান তার হাতে সেই পুরস্কার তুলে দেন।