গুলশানে হামলাকারী জঙ্গিদের বর্বরতা বনের পশুর হিংস্রতাকেও হার মানিয়েছে


সময়ের কণ্ঠস্বর ডেস্ক –    নৃশংসভাবে হত্যা করা হয় গুলশানের হলি আর্টিজান বেকারি রেস্তোরাঁর ২০ জিম্মিকে। জঙ্গিরা এক বাংলাদেশি ও ১৭ বিদেশি নাগরিকের প্রত্যেককে বারবার ধারালো অস্ত্র দিয়ে নৃশংসভাবে কুপিয়ে, গুলি করে ও গলা কেটে হত্যা করে। এ ছাড়া বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত মার্কিন নাগরিক অবিন্তা কবীর ও এক জাপানি নারীকে মাথায় ভারী ও ভোঁতা অস্ত্রের আঘাতে হত্যা করা হয়। জিম্মিদের মধ্যে ভারতীয় তরুণী তারিশি জৈনের সারা শরীরে ৪০টির মতো আঘাত করা হয় ধারালো অস্ত্র দিয়ে। হলি আর্টিজানের জিম্মিদশায় নিহত দেশি-বিদেশি নাগরিক ও জঙ্গিদের ময়নাতদন্তে এসব তথ্য উঠে এসেছে।

borborota
ময়নাতদন্ত-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, হামলাকারী জঙ্গিদের বর্বরতা বনের পশুর হিংস্রতাকেও হার মানিয়েছে। হামলার ধরন দেখে মনে হচ্ছে, নারীদের ওপর জঙ্গিদের আক্রোশ ছিল বেশি।
সেনাবাহিনীর কমান্ডো অভিযান ‘অপারেশন থান্ডারবোল্ট’ শেষে জিম্মি ও জঙ্গিদের মরদেহ উদ্ধারের পর সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) রাখা হয়। ৩ জুলাই সকাল ১০টা থেকে পরদিন সকাল ৮টা পর্যন্ত লাশের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের ৪ জন চিকিৎসক ও ৫ জন সহকারী সব লাশের ময়নাতদন্ত করেন। ফরেনসিক সূত্র জানিয়েছে, ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন চূড়ান্ত করার কাজ চলছে। দু-একদিনের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দেওয়া হবে।
২০ জিম্মি ও ৬ জঙ্গির মরদেহের ময়নাতদন্ত প্রসঙ্গে গতকাল ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. সোহেল মাহমুদ সাংবাদিকদের জানান, নিহত সব জঙ্গির শরীরে গুলির চিহ্ন পাওয়া গেছে। আর তিনজনের শরীরে বোমার স্পিøন্টারের আঘাত পাওয়া গেছে। বোমার কারণে কয়েক জঙ্গির হাত ও পা উড়ে গেছে। নিহত ২৬ জনের মাসল টিস্যু ও চুল থেকে ডিএনএ সংগ্রহ করা হয়েছে। আগামী সপ্তাহের মধ্যে ময়নাতদন্ত রিপোর্ট দেওয়া যাবে বলে তিনি জানান। তিনি বলেন, ১ জুলাই রাত ১২টার আগেই হত্যা করা হয় জিম্মিদের। জিম্মিদের সবাইকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে হত্যা করা হয়। এর মধ্যে ৭ জনের শরীরে ৮টি গুলি পাওয়া গেছে।
সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ডা. সোহেল মাহমুদ বলেন, হলি আর্টিজান রেস্তোরাঁয় হামলার আগে জঙ্গিরা কোনো প্রকার শক্তিবর্ধক ওষুধ সেবন করেছিল কিনা সে বিষয়ে নিশ্চিত হতে তাদের ভিসেরা ও রক্ত সংগ্রহ করা হয়েছে। জঙ্গিদের হামলায় নিহত নারীদের ধর্ষণ করা হয়েছে কিনা তা পরীক্ষার জন্যও হাইভেজোনাল সফট সংগ্রহ করা হয়েছে।
সোহেল মাহমুদ বলেন, নিহত জঙ্গিদের ভিসেরা পরীক্ষার জন্য তাদের যকৃৎ, কিডনি, পাকস্থলী  ও পাকস্থলীতে থাকা খাবারের নমুনা মহাখালী রাসায়নিক পরীক্ষাগারে পাঠানো হয়েছে। আগামী সপ্তাহে রিপোর্ট পাওয়া যেতে পারে। এর পর নিশ্চিত হওয়া যাবে তারা কোনো ধরনের শক্তিবর্ধক ওষুধ সেবন করেছিল কিনা।
ডা. সোহেল মাহমুদ আরও বলেন, ২০ জিম্মির মধ্যে ৭ জনের দেহে আটটি গুলি এবং অন্যদের শরীরে ধারালো অস্ত্রের আঘাত পাওয়া গেলেও অবিন্তা কবীর ও জাপানি এক নারীর বেলায় ভিন্নতা ছিল। তাদের মাথায় ভোঁতা অস্ত্র দিয়ে আঘাত করা হয়। ১ জুলাই রাত পৌনে ৯টার দিকে হলি আর্টিজানে হামলা চালায় জঙ্গিরা। তারা ১৭ বিদেশি নাগরিকসহ ২০ জনকে হত্যা করে। এ ছাড়াও জঙ্গিদের বোমায় নিহত হন দুই পুলিশ কর্মকর্তা। পরে সেনাবাহিনীর কমান্ডো অভিযানে ৫ জঙ্গি নিহত হয়। অপারেশনের পর ডিএমপির কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিট (সিটি) বিষয়টি তদন্ত করছে। নিহত জিম্মিদের মধ্যে ৩ বাংলাদেশি হলেন ফারাজ হোসেন, ইশরাত আখন্দ ও অবিন্তা কবীর। অবশিষ্ট ১৭ জনের মধ্যে ইতালির ৯ জন, জাপানের ৭ জন ও ভারতের একজন।
তদন্তের একপর্যায়ে কাউন্টার টেররিজম ইউনিট গতকাল জঙ্গিদের ভিসেরা এবং রক্ত সংরক্ষণের জন্য আদালতের মাধ্যমে ঢামেক হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগে চিঠি পাঠায়।
এ মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের ইন্সপেক্টর হুমায়ুন কবির সোমবার ঢাকার সিএমএম কোর্টে পাঁচ জঙ্গির ডিএনএ পরীক্ষার অনুমতি নেন।
পুলিশের প্রসিকিউশন বিভাগের ভারপ্রাপ্ত উপ-কমিশনার আমিনুর রহমান জানান, ডিএনএ পরীক্ষার অনুমতি চাইলে আদালত তাদের আবেদন মঞ্জুর করেন। নিহতদের পরিচয় নিশ্চিত হতে তাদের পরিবারের সদস্যদের ডিএনএ পরীক্ষার নমুনা সংগ্রহের অনুমতি চেয়ে আবেদন করা হয়। এ ছাড়াও নিহত পাঁচ জঙ্গির অস্থি-মজ্জা ও রক্তমাখা জামা-কাপড়, রক্ত, চুল জব্দ ও সংগ্রহ করার অনুমতি চাওয়া হয়েছে আদালতের কাছে। আদালতের নির্দেশনা পেয়ে ভিসেরা পরীক্ষার জন্য সংগ্রহ করা নমুনা রাসায়নিক পরীক্ষাগারে পাঠানো হয়।
এর আগে গত ৬ জুলাই এ মামলার এফআইআর আদালতে উপস্থাপন করা হলে ২৪ আগস্ট মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়। তদন্ত-সংশ্লিষ্টরা জানান, ঘটনাস্থল থেকেও শতাধিক আলামত সংগ্রহ করা হয়েছে।

◷ ২:৫১ পূর্বাহ্ন ৷ বৃহস্পতিবার, জুলাই ১৪, ২০১৬ আলোচিত বাংলাদেশ