• আজ শনিবার, ৫ আষাঢ়, ১৪২৮ ৷ ১৯ জুন, ২০২১ ৷

কাশ্মির নিয়ে পাল্টাপাল্টি অবস্থানে ভারত-পাকিস্তান: উত্তপ্ত রাজনৈতিক পরিবেশ


❏ শনিবার, জুলাই ১৬, ২০১৬ আন্তর্জাতিক

4bk74b44093020abem_800C450


আন্তর্জাতিক ডেস্কঃ

জম্মু-কাশ্মির নিয়ে ভারত ও পাকিস্তান পাল্টাপাল্টি অবস্থান নেয়ায় দুই দেশের মধ্যকার সম্পর্ক অবনতি হওয়ার পাশাপাশি পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। কাশ্মিরে স্থানীয় হিজবুল মুজাহিদীন কমান্ডার বুরহান ওয়ানি নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে নিহত হওয়ার পর রাজ্যটিতে আইনশৃঙ্খলার ব্যাপক অবনতি হয়েছে।

বুরহান হত্যার প্রতিবাদে সেখানকার মানুষজন রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ দেখানোর সময় নিরাপত্তা বাহিনীর হামলায় এ পর্যন্ত ৪৩ ব্যক্তি নিহত হয়েছেন। এছাড়া, সংঘর্ষে ৩ হাজার ১০০’র বেশি মানুষ আহত হয়েছে। আহতদের মধ্যে হাজার দেড়েক নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যও রয়েছে। নিরাপত্তা বাহিনীর ছোঁড়া গুলি, পেলেট গানের ছররা, কাঁদানে গ্যাসের সেল নিক্ষেপে বেসামরিক মানুষজন মারাত্মকভাবে আহত হয়েছে। ছররা গুলির আঘাতে এরইমধ্যে বেশ কিছু যুবকের দৃষ্টিশক্তি হারানোর উপক্রম হয়েছে।

কাশ্মিরে হুররিয়াত নেতা এবং অন্যান্য সংগঠনের নেতাদের গৃহবন্দী করে, উপত্যাকা জুড়ে কঠোরভাবে কারফিউ জারি করে পরিস্থিতি সামাল দেয়ার চেষ্টা করছে রাজ্য এবং কেন্দ্রীয় সরকার। অন্যদিকে, প্রতিবাদকারীদের পক্ষ থেকে একটানা বনধের ডাক দেয়ায় সেখানকার জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে।

গতকাল শুক্রবার জুমা নামাজ শেষে বড় ধরনের গোলমালের আশঙ্কায় রাজ্যের ১০ টি জেলাতেই কঠোরভাবে কারফিউ জারি করা হয়। পুলিশ এবং আধাসামরিক বাহিনী দিয়ে মুড়ে ফেলা হয় উত্তেজনাপ্রবণ সমস্ত এলাকা। এসবের জেরে উপত্যকার বহু জায়গায় শুক্রবারে জুমা নামাজ অনুষ্ঠিত হতে পারেনি। নিরপত্তা বাহিনীর কঠোরতায় এ দিন শ্রীনগরের ঐতিহাসিক জামিয়া মসজিদেও জুমা পড়া সম্ভব হয়নি।

গুজব ছড়ানো বন্ধ করতে গোটা উপত্যকায় মোবাইল পরিষেবা বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। মোবাইল ইন্টারনেটও একটানা বন্ধ রয়েছে সেখানে। হুররিয়াত নেতা মীরওয়াইজ ওমর ফারুক হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, অবিলম্বে প্রশাসনের জারি করা কারফিউ তুলতে হবে, প্রতিবাদ জানানোসহ মানুষকে স্বাধীন জীবনযাত্রা চালানোর অধিকার দিতে হবে, এ ছাড়া তাদের শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক কর্মসূচি চালাতে দিতে হবে। নইলে বনধ কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়া হবে।

কাশ্মিরের চলমান সহিংসতাকে কেন্দ্র করে আগেই পাকিস্তানের পক্ষ থেকে নিন্দা জানিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। সেদেশের প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরীফের পক্ষ থেকে এক বিবৃতিতে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। ভারতের পক্ষ থেকে পাল্টা বিবৃতি দিয়ে পাকিস্তানের বক্তব্যকে নাকচ করে দেয়া হয়।

পাকিস্তান এরপর বিষয়টি জাতিসংঘসহ নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য দেশের প্রতিনিধিদের কাছে কাশ্মির পরিস্থিতি তুলে ধরে। এ ছাড়া ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং ৫৭ টি মুসলিম দেশের রাষ্ট্রদূতদের কাছেও কাশ্মিরের অশান্ত পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে পাকিস্তান।

পাকিস্তানের নালিশের পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে জাতিসংঘে ভারতের স্থায়ী প্রতিনিধি সৈয়দ আকবরউদ্দিন নজিরবিহীনভাবে পাকিস্তানের কঠোর সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, ‘দুর্ভাগ্যজনকভাবে জাতিসংঘের মঞ্চ অপব্যবহারের চেষ্টা করা হচ্ছে। পাকিস্তান এমন একটি দেশ, যে বরাবর সন্ত্রাসবাদীদের প্রশয় দিয়েছে। অন্য দেশের এলাকা দখল করার চেষ্টা করে। পাকিস্তানের জাতীয় নীতিও বরাবর সন্ত্রাসবাদীদের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে ভুল পথে এগিয়েছে। জাতিসংঘ যাদেরকে জঙ্গি বলে চিহ্নিত করেছে, তাদের গুণকীর্তন করেছে পাকিস্তান। আর নিজেদের এই অপকীর্তিকে মানবাধিকার রক্ষার নামে বারবার চালাতে চেয়েছে।’

আকবরউদ্দিন আরো বলেন, ‘পাকিস্তানে মানবাধিকারের অবস্থা এতটাই খারাপ যে, একাধিকবার চেষ্টা করেও তারা জাতিসংঘের মানবাধিকার পরিষদের সদস্য হতে পারেনি। অতীতেও ভারতকে বদনাম করার উদ্দেশ্যে পাকিস্তান এ ধরনের অপচেষ্টা চালিয়েছে। কিন্তু প্রত্যেকবারের মতো এবারেও আন্তর্জাতিক মহলের সমর্থন তারা আদায় করতে পারেনি।’

ভারতের পাল্টা হিসেবে জাতিসংঘে পাকিস্তানের প্রতিনিধি মালিহা লোধি আন্ডার সেক্রেটারি জেনারেল এডমন্ড মিলেটের সঙ্গে দেখা করেন। পাক প্রশাসনের তরফে এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘কাশ্মীরে ভারতীয় সেনার নারকীয় অত্যাচার নিয়ে জাতিসংঘে তদন্তের আবেদন জানানো হয়েছে। আমরা চাই, কাশ্মীরে গণহত্যার তদন্ত করুক জাতিসংঘ। স্বাধীনতার আন্দোলনকে সন্ত্রাসবাদ বলা যায় না।’

জাতিসংঘের পাক প্রতিনিধি মিলেটের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে বলেন, ‘কাশ্মিরে ভারতীয় সেনাবাহিনী নারকীয় অত্যাচার চালাচ্ছে। সাধারণ মানুষকে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়া হচ্ছে। বাদ যাচ্ছে না শিশুরাও। সংঘর্ষে নিহত হিজবুল কমান্ডার বুরহান ওয়ানিকে কাশ্মিরের জনপ্রিয় যুবনেতা বলেও অভিহিত করেছেন মালিহা লোধি।

কাশ্মীর ইস্যুতে ভারতের পক্ষ থেকে কঠোর সমালোচনা সত্ত্বেও পাকিস্তান মোটেও যে পিছু হঠেনি তার প্রমাণ পাওয়া গেছে শুক্রবার পাক প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরীফ এবং সেদেশের প্রতিরক্ষা মন্ত্রী খাজা মুহাম্মদ আসিফের মন্তব্যে।

শুক্রবার পাকিস্তান সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ১৯ জুলাই পাকিস্তানে কাশ্মিরের সমর্থনে তারা ‘কালা দিবস’ পালন করবে। মন্ত্রী পরিষদের জরুরি বৈঠকে নওয়াজ শরীফ কাশ্মিরিদের আন্দোলনকে ‘স্বাধীনতার সংগ্রাম’ বলে আখ্যা দিয়ে তাদের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারকে প্রতিষ্ঠা করতে পাকিস্তান কাশ্মিরিদের সব রকম নৈতিক, রাজনৈতিক এবং কূটনৈতিক সমর্থন দেবে বলে ঘোষণা করেছেন।

গণমাধ্যমে প্রকাশ, ওইদিন নওয়াজ শরীফ আরো মন্তব্য করেন, ‘ভারতের বর্বরতা কাশ্মীরিদের আন্দোলনকে আরো তীব্র করবে।’ উপত্যকায় ভারত যে ৭ লাখ সেনা মোতায়েন করে রেখেছে, তা কাশ্মিরিদের আন্দোলনকে দমন করতে পারবে না বলেও পাক প্রধানমন্ত্রী মন্তব্য করেছেন।

এদিকে, পাক প্রতিরক্ষা মন্ত্রী খাজা মুহাম্মদ আসিফ ২০০২ সালের গুজরাট দাঙ্গার প্রসঙ্গ তুলে ধরে ভারতের বিরুদ্ধে সুর চড়িয়েছেন। তিনি টুইটার বার্তায় বলেছেন, ‘মোদী গুজরাতে যে গণহত্যা চালিয়েছিলেন, কাশ্মিরেও তারই পুনরাবৃত্তি হচ্ছে’!

অন্যদিকে, শুক্রবার ভারতের পররাষ্ট্র দফতরের পক্ষ থেকে দেয়া এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘আমাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে পাকিস্তান যেভাবে একনাগাড়ে নাক গলানোর চেষ্টা করে যাচ্ছে, তাতে আমরা গভীর উদ্বিগ্ন। বিভিন্ন সন্ত্রাসবাদী সংগঠনের জঙ্গিদের নানা ভাবে প্রশংসা করা হচ্ছে, উৎসাহ দেয়া হচ্ছে এবং মর্যাদা দেয়া হচ্ছে। এ থেকে এটা স্পষ্ট হয়েছে যে, ওই সন্ত্রাসবাদীদের প্রতি পাকিস্তানের এখনও সহানুভূতি রয়েছে। এটা কিছুতেই মেনে নেওয়া যায় না।’

কাশ্মির নিয়ে এভাবে পাল্টাপাল্টি অবস্থানে দুই দেশের মধ্যে সম্পর্কের অবনতি তথা রাজনৈতিক পরিবেশ উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে।