সংবাদ শিরোনাম
  • আজ ৪ঠা কার্তিক, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

তুরস্কে সেনা অভ্যুত্থানের চেষ্টা: নিহতের সংখ্যা বেড়ে ৯০

২:০৭ অপরাহ্ণ | শনিবার, জুলাই ১৬, ২০১৬ আন্তর্জাতিক

আন্তর্জাতিক ডেস্ক- তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানের বিরুদ্ধে সেনাবাহিনীর একাংশ ট্যাংক ও যুদ্ধবিমান নিয়ে অভ্যুত্থানের চেষ্টা চালিয়েছে। আঙ্কারা ও ইস্তাম্বুলে শুক্রবার রাতভর সংঘর্ষ চলেছে। এ সময় বিস্ফোরণ ও গুলির শব্দ শোনা যায়। বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে অভ্যুত্থানকারীদের সংঘর্ষে এ পর্যন্ত ৯০ জন নিহত হয়েছে।

তুর্কি সরকারি সূত্র জানায়, এ পর্যন্ত ৭৫৪ জন সেনাকে আটক করা হয়েছে। সরকারি সংবাদ সংস্থা আনাদোলুর বরাত দিয়ে এএফপির খবরে দেশটির জ্যেষ্ঠ এক কর্মকর্তা জানান, নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে ১৭ জন পুলিশ কর্মকর্তা। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে বলে দাবি করেছেন এরদোয়ান।

এদিকে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংবাদ সংস্থাগুলোর বরাতে জানা যাচ্ছে, তুরস্কে ডানপন্থি সরকারকে হটাতে সেনাবাহিনীর অভ্যুত্থান কার্যত ব্যর্থ হয়েছে। সরকারের পক্ষে রাজপথে অবস্থান নিয়েছে জনতা, পুলিশ আটক করছে বিদ্রোহী সেনা সদস্যদের। তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তায়িপ এরদোয়ান শনিবার প্রথম প্রহরে ইস্তানবুলে পৌঁছে বিমানবন্দরে এক ভাষণে বলেছেন, অভ্যুত্থানচেষ্টাকারীরা রাষ্ট্রদ্রোহের অপরাধ করেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা হচ্ছে। রাজপথে অভ্যুত্থানকারীদের কর্তৃত্ব হারানোর প্রকাশ ঘটলেও তাদের পক্ষ থেকে এক ই-মেইল বার্তায় বলা হয়েছে, লড়াই চালিয়ে যাবেন তারা।

এরদুয়ান অবকাশে থাকার মধ্যেই শুক্রবার ন্যাটো জোটভুক্ত দেশটির পরাক্রমশীল সেনাবাহিনী অভ্যুত্থান ঘটিয়ে দেশের শাসনভার নেওয়ার দাবি করে, যা দেশটির টেলিভিশনে প্রচার করা হয়। আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যমের খবরে বলা হয়, রাজধানী আঙ্কারা এবং দেশটির বৃহত্তম শহর ইস্তানবুলে ট্যাংক নামে, পথে পথে পাহারায় বসেন সেনা সদস্যরা। সরকারি বিভিন্ন ভবনের নিয়ন্ত্রণও নেন তারা।

উপকূলের শহর মারমারাসি থাকা এরদোয়ান অভ্যুত্থানের খবর পেয়েই জনগণকে তা প্রতিরোধের আহ্বান জানান। এরপর তড়িঘড়ি করে তিনি ইস্তানবুল পৌঁছে এক ভাষণে বলেন, সেনাবাহিনীর ক্ষুদ্র একটি দল অভ্যুত্থানের চেষ্টা করেছিল, তারা রাষ্ট্রদ্রোহের অপরাধ করেছে, এজন্য তাদের চড়া মূল্য দিতে হবে।অভ্যুত্থানচেষ্টার নেতৃত্ব কারা ছিলেন কিংবা তাদের পেছনে কারও সমর্থন ছিল কি না, তা এখনও স্পষ্ট নয়।

সেনাপ্রধান জেনারেল হুলুসি আকার কোথায় আছেন, তা এখনও অজানা। বিদ্রোহী সৈন্যরা তাকে আঙ্কারায় সেনা সদর দপ্তরে জিম্মি করেছে বলে রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত বার্তা সংস্থা আনাদলুকে উদ্ধৃত করে জানিয়েছে বিবিসি। তুরস্কের বিচারমন্ত্রী বেকির বোজদারকে উদ্ধৃত করে রয়টার্স জানায়, ধর্মীয় নেতা ফেতুল্লাহ গুলেনের অনুসারী সৈন্যরা এই অভ্যুত্থানের চেষ্টা চালিয়েছিল।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্র তার নেতৃত্বাধীন ন্যাটো জোটভুক্ত দেশটির এই ঘটনায় এরদোয়ান সরকারের প্রতি পূর্ণ সমর্থন প্রকাশ করেছে। ন্যাটোও তুরস্ক সরকারের প্রতি সমর্থন জানিয়েছে। রয়টার্স জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি অভ্যুত্থানচেষ্টার খবর পেয়ে তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে টেলিফোন করে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত বেসামরিক সরকারের প্রতি ওয়াশিংটনের পূর্ণ সমর্থন প্রকাশ করেছেন। অভ্যুত্থানে জড়িত সেনা কর্মকর্তাদের গ্রেপ্তারের প্রক্রিয়া চলছে বলে প্রেসিডেন্ট এরদোয়ানকে উদ্ধৃত করে রয়টার্স জানায়।

তুরস্কের প্রধানমন্ত্রী বিনালি ইলদিরিমকে উদ্ধৃত করে স্থানীয় টেলিভিশনের খবরে বলা হয়, অভ্যুত্থানে জড়িত ১৩০ জন সেনা সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। টেলিভিশনের ছবিতে ইস্তানবুল ও আঙ্কারায় রাজপথে থাকা সেনা সদস্যদের পুলিশের কাছে অস্ত্র সমর্পণ করতে দেখা যায়। ট্যাংকগুলোতে উঠে সরকার সমর্থকদের উল্লাসের ছবিও এসেছে। তুরস্কের এনটিভির খবরে বলা হয়েছে, সেনা অভ্যুত্থান শুরুর পর শুধু আঙ্কারায়ই সংঘর্ষে অন্তত ৪২ জন নিহত হয়েছেন। নিহতদের পরিচয় তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত হওয়া না গেলেও তাদের অধিকাংশই বেসামরিক মানুষ।

ইস্তানবুলে দেশটির বৃহত্তম আতাতুর্ক বিমানবন্দরের নিয়ন্ত্রণ এখন সরকারের প্রতি আনুগত্যশীল সেনাবাহিনীর হাতে। কয়েক ঘণ্টা বন্ধ থাকার পর সেখানে বিমান উঠানামা স্বাভাবিক হচ্ছে বলে জানিয়েছে বিবিসি। তবে রাজধানীর আঙ্কারার বিমানবন্দরে বিমান উঠা-নামা বন্ধ রয়েছে। একযুগের বেশি সময় ধরে তুরস্ক শাসন করে আসা ডানপন্থি সরকারপ্রধান এরদোয়ানকে ক্ষমতা থেকে উৎখাতের এই চেষ্টা সফল হলে তা হত কয়েক বছরের মধ্যপ্রাচ্যে ক্ষমতার বড় ধরনের পালাবদল।

হঠাৎ অভ্যুত্থান, রাজপথে ট্যাংক

সামরিক অভ্যুত্থান চেষ্টার দীর্ঘ ইতিহাস আছে তুরস্কের; ১৯৯৭ সালে সর্বশেষ অভ্যুত্থানে ডানপন্থি সরকার ক্ষমতাচ্যুত হয়েছিল। তবে এবার কোনো ধরনের আভাস না পাওয়ার মধ্যেই আঙ্কারা ও ইস্তানবুলের সড়কে ট্যাংক দেখে হকচকিয়ে গিয়েছিল তুরস্কবাসী। শুক্রবার স্থানীয় সময় সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে সেনাবাহিনী রাজপথে অবস্থান নেয়। তারা ইস্তানবুলের বসফরাস ও সুলতান মেহমুত সেতুর উপর অবস্থান নিয়ে গাড়ি চলাচল বন্ধ করে দেয়।

সিএনএন-তুর্ক টেলিভিশনসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমের নিয়ন্ত্রণও নেয় বিদ্রোহী সেনারা। এরদোয়ানের দল এ কে পার্টির ইস্তানবুলের দপ্তরেও হানা দেয় বিদ্রোহী সেনা সদস্যরা। রাজধানী আঙ্কারার বিভিন্ন স্থানে গুলির শব্দ শোনা যেতে থাকে। আকাশে চক্কর দিতে থাকে সামরিক বাহিনীর বিমানগুলো। সামরিক বাহিনীর হেলিকপ্টার থেকে গোলাবর্ষণ হয় বলেও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়।

ইস্তানবুলের আকাশেও হেলিকপ্টারও উড়ছিল। ইস্তানবুলের আতাতুর্ক বিমান বন্দরের সব ফ্লাইট বাতিল করা হয়। আঙ্কারায় পার্লামেন্ট ভবনে আশ্রয় নিয়েছিলেন পার্লামেন্ট সদস্যরা। সেখানে বিদ্রোহী সৈন্যরা ট্যাংক থেকে গোলা ছোড়ার পর ধোঁয়া উড়তে দেখা যায়। পার্লামেন্ট ভবনে আশ্রয় নেওয়া একজন বিরোধী নেতা রয়টার্সকে বলেন, অন্তত তিনবার গোলা ছোড়া হয় এবং তাতে বেশ কয়েকজন আহত হন। এরপর স্থানীয় সময় রাত ৯টার দিকে রাষ্ট্রীয় টিভি টিআরটিতে খবর আসে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ও মানবাধিকার রক্ষার স্বার্থে সশস্ত্র বাহিনী তুরস্কের ক্ষমতা দখল করেছে। টেলিভিশনের পর্দায় পড়ে শোনানো ওই বিবৃতিতে বলা হয়, এখন ‘শান্তি পরিষদ’ দেশ চালাবে এবং সান্ধ্য আইন ও সামরিক আইন জারি থাকবে। একই সঙ্গে তুরস্কের বিদ্যমান বৈদেশিক সব সম্পর্ক বহাল থাকবে এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা প্রাধান্য পাবে বলে ওই বিবৃতিতে বলা হয়।

এরদোয়ানের আহ্বান

অবকাশে থাকা এরদোয়ানের অনুপস্থিতিতে এই অভ্যুত্থান ঘটার পর প্রেসিডেন্টের অফিস সূত্র থেকে আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যমগুলোকে জানানো হচ্ছিল, এই বিদ্রোহে গুটিকয়েক সেনা সদস্য জড়িত, পরিস্থিতি সরকার নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছে। রাত ৮টার দিকে প্রধানমন্ত্রী ইলদিরিম এক বার্তায় জনগণকে শান্ত থেকে পরিস্থিতি মোকাবেলার আহ্বান জানিয়ে বলেন, একদল সৈন্য সরকার উৎখাতের চেষ্টা চালিয়েছে, তাদের বশে আনতে নিরাপত্তা বাহিনী কাজ করছে।

রাত সাড়ে ৯টার দিকে এরদোয়ান এক টুইটার বার্তায় জনগণকে রাজপথে নেমে আসার আহ্বান জানিয়ে বলেন, সরকার উৎখাতের এই চেষ্টা রুখে দেওয়া হচ্ছে। গুরুত্বপূর্ণ সব স্থাপনার নিয়ন্ত্রণ ফিরিয়ে আনছে সরকার। এরপর সিএনএন-তুর্ক টেলিভিশনে এরদোয়ানের এক ভিডিও সাক্ষাৎকার প্রচারের পর দৃশ্যপট বদলে যেতে থাকে। সরকার সমর্থকরা ইস্তানবুল ও আঙ্কারা সড়কে নেমে আসে। পুলিশও অবস্থান নেয় সড়কগুলোতে। অন্যদিকে সামরিক বিমানগুলো থেকে বিদ্রোহিী সৈন্যদের হেলিকপ্টারে গুলি ছোড়া শুরু হয়।

এরপর বিভিন্ন স্থানে অবস্থান নেওয়া সেনা সদস্যদের হাত উঁচু করে পুলিশের কাছে আত্মসমর্পণ করতে দেখা যায়। আর ট্যাংকগুলোতে জাতীয় পতাকা নিয়ে উঠে পড়ে উল্লসিত সরকার সমর্থকরা। ইস্তানবুলে সেতুতে আত্মসমর্পণকারী সেনাসদস্যদের উপর এরদোয়ানের এ কে পার্টির সমর্থকদের হামলার খবরও প্রত্যক্ষদর্শীদের উদ্ধৃত করে জানিয়েছে রয়টার্স। এরপর ভোররাতে ইস্তানবুলে ফিরে এরদোয়ান সবাইকে আশ্বস্ত করে বলেন, আমি পালাইনি, আমি জনগণের সঙ্গেই রয়েছি। ইস্তানবুল বিমানবন্দরে তিনি যখন টেলিভিশনে কথা বলছিলেন, তখন তার চারপাশ ঘিরে ছিল উল্লসিত কর্মী-সমর্থকরা। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা হয়েছে, বলেও জনগণকে আশ্বস্ত করেন এরদোয়ান।

লড়াই চলবে

বিদ্রোহী সেনা সদস্যদের আত্মসমর্পণ এবং স্থাপনাগুলোর নিয়ন্ত্রণ সরকার নিলেও অভ্যুত্থানকারীদের পক্ষ থেকে এক ই-মেইল বার্তায় লড়াই চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা এসেছে বলে রয়টার্স জানিয়েছে। তুরস্কের সেনাবাহিনীর জেনারেল স্টাফ অফিস থাকা আসা ওই ই-মেইলে বলা হয়, তাদের লড়াই এখনও চলছে।নিজেদের পিস অফ হোম মুভমেন্ট পরিচয় দিয়ে ই-মেইলে লড়াইয়ের এই সময়ে জনসাধারণকে ঘরে নিরাপদ আশ্রয়ে থাকতে বলা হয়েছে।

আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া

যুক্তরাষ্ট্র নেতৃত্বাধীন ন্যাটো জোটভুক্ত তুরস্কে নির্বাচিত সরকারকে উৎখাতে এই অভ্যুত্থান প্রচেষ্টা সমর্থন পায়নি আন্তর্জাতিক কোনো মহল থেকে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা তুরস্কে গণতান্ত্রিক সরকারের পাশে থাকতে সব পক্ষের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন বলে হোয়াইট হাউস জানায়। এরপর দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি তুর্কি পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে টেলিফোন করে নির্বাচিত সরকারের প্রতি পূর্ণ সমর্থন প্রকাশ করেন। কেরি বর্তমানে রাশিয়া সফরে রয়েছেন।

রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভ রক্তপাত এড়ানোর আহ্বান জানিয়ে বলেন, তুরস্কের যে কোনো সমস্যার সমাধান দেশটির সংবিধান অনুসারেই হওয়া উচিৎ, অন্য কোনোভাবে নয়। ক্রেমলিনের এক বিবৃতিতে তুরস্ককে আঞ্চলিক শক্তি উল্লেখ করে বলা হয়,এই অঞ্চলে স্থিতিশীলতা রক্ষায় তুরস্কে শান্তি থাকা প্রয়োজন। মস্কো আশা করে, তুরস্কে যে সমস্যার উদ্ভব হয়েছে, তার সমাধান শান্তিপূর্ণভাবেই হবে।

তুরস্কের ঘটনায় উদ্বেগ জানিয়েছেন যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বরিস জনসন। দেশটির সরকার তুরস্কে থাকা যুক্তরাজ্যের সব নাগরিককে নিরাপদ অবস্থানে থাকার পরামর্শ দিয়েছে।

জার্মান চ্যান্সেলর অ্যাঙ্গেলা মেরকেল আশা করছেন, তুরস্কের সব পক্ষ গণতন্ত্রের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকবে। তুরস্কের অন্যতম মিত্র দেশ কাতার এরদোয়ানকে উৎখাতের সেনাঅভ্যুত্থানের চেষ্টার নিন্দা জানিয়েছে। ইরান বলেছে, তুরস্কের ঘটনায় তারা উদ্বিগ্ন।

জাতিসংঘের মহাসচিব বান কি-মুন তুরস্কের বিদ্যমান পরিস্থিতিতে সব পক্ষকে শান্ত থাকার আহ্বান জানিয়েছেন। ন্যাটো মহাসচিব জেন্স স্টলটেনবার্গ তুরস্কের গণতান্ত্রিক সরকারের প্রতি পূর্ণ সমর্থন জানিয়েছেন।