উত্তাল সাগর: ইলিশ না পেয়ে খালি ফিরছে ফিশিং ট্রলার


naf

বরগুনা প্রতিনিধি: গভীর বঙ্গোপসাগরে সঞ্চারণশীল মেঘমালা সৃষ্টি ও টানা বর্ষণ হওয়ায় সাগর প্রচন্ডভাবে উত্তাল হয়ে উঠেছে। আবহাওয়া বিভাগ ৩ নম্বর সতর্কতা সঙ্কেত জারি করায় এবং প্রচন্ড ঢেউয়ের সাথে টিকতে না পেরে সহস্রাধিক ফিশিং ট্রলার সাগর তীরবর্তী বিভিন্ন নদ-নদীতে নিরাপদে আশ্রয় নিয়েছে। ইলিশ মাছ না পাওয়ায় খালি হাতে ফিরতে হচ্ছে তাদের।

বরগুনা জেলা ফিশিং ট্রলার শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি আ: মান্নান জানান, সাগরে প্রচন্ড ঢেউ এবং আবহাওয়া বিভাগ ৩ নং সতর্কতা সঙ্কেত জারি করার পর ইলিশ আহরণ বন্ধ রেখে গত শুক্রবার ভোরে সমুদ্র ছেড়েছে অসংখ্য ফিশিং ট্রলার। ইলিশের ভরা মওসুম শুর হলেও জেলেদের জালে ধরা পড়ছে না পর্যাপ্ত ইলিশ। এ কারণে সমুদ্র উপকূলীয় জেলে পরিবারে চরম দুর্দিন চলছে। অন্য দিকে দুই-একটি ইলিশ ধরা পড়লেও চড়া দামে কিনতে হচ্ছে ক্রেতাদের। এ কারণে নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্তের নাগালের বাইরে ইলিশের দাম।

ইলিশের প্রজনন ও বংশ বিস্তার নানাভাবে বাধাগ্রস্থ হওয়ায় সমুদ্র উপকূলীয় নদীতে কমছে এ মাছের পরিমাণ এমনটিই ধারণা স্থানীয় বিশেষজ্ঞদের। যা ধরা পড়ছে তা দিয়ে খরচের টাকাই হচ্ছে না জেলেদের। বরগুনার বাজারগুলোতে দুষ্প্রাপ্য হয়ে উঠেছে ইলিশ। প্রয়োজনের চেয়ে স্বল্প মাত্রায় সরবরাহের কারণে ইলিশের দামও চড়া।

ভোজন রসিক বাঙালির কাছে মাছের রাজা ইলিশ। স্বাদে ও রূপে অনন্য এ মাছ ক্রমেই বঙ্গোপসাগর উপকূলীয় দণিাঞ্চলের নদ-নদী থেকে হারিয়ে যাচ্ছে। তাই রসনার তৃপ্তি মেটাতে পারছেন না তারা। চলতি ভরা মওসুমেও দণিাঞ্চলের নদ-নদীতে জেলেদের জালে ধরা পড়ছে না ইলিশ।

অল্প দিনের মধ্যেই এ অঞ্চল মাছশূন্য হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন বিশিষ্টজনেরা। অপর দিকে জেলেরা সাগরে নামতেই জলদস্যুদের অপহরণের শিকার হচ্ছেন। তাই প্রতি বছরের মতো এবারো জলদস্যুু আতঙ্ক বিরাজ করছে বরগুনাসহ উপকূলীয় জেলে পল্লীতে। প্রতি বছর বঙ্গোপসাগরে একের পর এক জলদস্যু হামলার শিকার হয়ে শত শত জেলে নিঃস্ব হয়েছেন। যার কারণে অনেক জেলে ইলিশ ধরা বন্ধ করে দিয়েছেন বলে জানা গেছে। বামনা উপজেলার কলাগাছিয়া জেলে পল্লীর জেলে চল্লিশোর্ধ্ব মিন্টু দাসের ৮ সদস্যের পরিবার।

থাকেন বিষখালী নদী তীরবর্তী বেড়িবাঁধের পাড়ে। এ পরিবারটির জীবন চলে বিষখালী নদীতে মাছ ধরে। এ মাছ ধরার কাজে তিনি মহাজন, ব্যাংক ও বিভিন্ন এনজিওর ঋণের জালে আটকা পড়েছেন। তবু ইলিশ মাছ ধরে কোনোমতে চলছিল এ পরিবারটির ভরণপোষণ। হঠাৎ বিষখালী ও পায়রা নদীতে মাছের আকাল দেখা দিয়েছে। সারা দিন জেলেরা নদীতে জাল ফেলেও ইলিশ না পেয়ে শূন্য হাতে ফিরছেন। এমন মাছের আকালে শুধু জেলে মিন্টু দাস নন, বরগুনার উপকূলীয় পায়রা, বিষখালী নদী ও বঙ্গপসাগর তীরবর্তী জেলে পল্লীর কয়েক হাজার পরিবার অনাহারে-অর্ধাহারে দিন কাটাচ্ছে।
মিন্টু দাস আক্ষেপ করে আরো বলেন, ‘গত ২৮ বছর বিষখালী গাঙ্গে (নদীতে) মাছ ধইরা খাই, এবার গাঙ্গে আকাল পড়ছে। হারাদিন (সারাদিন) জাল পাইত্যা কোনো ইলিশ পাইতেছি না। যেদিন মাছ পাই হেদিন দুইডা খাওয়া জোডে, আর যে দিন পাই না হে দিন পোলা-মাইয়া লইয়া অর্ধাহারে-অনাহারে থাহি।’
তিনি জানান, ভরা মওসুমের দেড় মাস পার হয়ে গেলেও বিষখালী নদীতে ইলিশের দেখা মিলছে না। তাই জেলেদের ঘরে ঘরে এখন অভাব আর অভাব। অনেকে ঋণের চাপে গাঢাকা দিয়ে বেড়াচ্ছেন।
সরেজমিনে দেখা গেছে, ভরা বর্ষা মৌসুমেও জেলেদের জালে ইলিশ ধরা না পড়ায় দেনার দায়ে দিশেহারা তারা। অনাহারে-অর্ধাহারে মানবেতর জীবন কাটাতে হচ্ছে তাদের। কষ্টে জীবন চলছে জেলার জেলে ও মাছ ব্যবসার সঙ্গে জড়িত পরিবারগুলোর। মহাজনের দায়দেনা সত্ত্বেও সংসার চালাতে ফের একাধিক এনজিও থেকে লোন নিয়ে কিস্তি শোধ করতে পারছে না তারা। ফলে দেনার দায়ে অনেক জেলে এখন এলাকাছাড়া। ঘাটে শত শত নৌকা ও ট্রলার বাঁধা। নদীতে মাছ না থাকায় জেলেরা এখন বেকার হয়ে পড়ে বাড়িতে অলস সময় কাটাচ্ছেন।
আমতলী ও বরগুনার বিভিন্ন হাট-বাজার ঘুরে দেখা যায়, বাজারে দুই-একটা ইলিশ উঠলেও তার দাম সাধারণ ক্রেতাদের ক্রয়মতার বাইরে। এখানে প্রতি কেজি ইলিশ বিক্রি হচ্ছে ১২ শ’ থেকে ১৫ শ’ টাকায়।

খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, বাজারে স্বল্প ইলিশ উঠলেও জেলে, আড়ৎদার ও শ্রমিকসহ অনেকেই বসে বসে পুঁজির টাকা খরচ করছেন।
জেলা ট্রলার মালিক সমিতির সভাপতি গোলাম মোস্তফা চৌধুরী বলেন, ইলিশ মওসুম চললেও সাগরে আগের মতো মাছ পড়ছে না। এ কারণে এ পেশা ছেড়ে দিচ্ছেন অনেক জেলে। ইলিশনির্ভর উপকূলীয় এলাকার মানুষের চোখেমুখে এখন অভাবের ছাপ। ফলে অনেক জেলে এলাকা ছেড়ে শহরমুখী হতে শুরু করেছেন।

বরগুনা জেলা মৎস্য কর্মকর্তা বলেন, জাটকা নিধন, জলবায়ু পরিবর্তন এবং অনাবৃষ্টির কারণে নদীতে মাছের আকাল দেখা দিয়েছে। ফলে জেলেদের জীবনে দুর্দিন নেমে এসেছে। আষাঢ়ের ঘনবৃষ্টি হচ্ছে, আশা করি উপকূলীয় নদ নদীতে ইলিশের আনাগোনা বাড়তে পারে।

◷ ২:১৮ অপরাহ্ন ৷ সোমবার, জুলাই ১৮, ২০১৬ দেশের খবর, বরিশাল