• আজ বুধবার, ৭ আশ্বিন, ১৪২৮ ৷ ২২ সেপ্টেম্বর, ২০২১ ৷

শিক্ষা ধ্বংসে আত্মঘাতি প্রবণতা : বছরে কোচিং বাণিজ্যে লেনদেন হচ্ছে ৩২ হাজার কোটি টাকা


❏ বুধবার, জুলাই ২০, ২০১৬ শিক্ষাঙ্গন, স্পট লাইট

সময়ের কণ্ঠস্বর ডেস্ক –   দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা এখন কোচিং নির্ভর। প্রথম শ্রেণি থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায় পর্যন্ত ভর্তি হতে এখন কোচিং করার রেওয়াজ শুরু হয়েছে ভর্তিচ্ছুদের। এছাড়া সকল পরীক্ষাতেই কোচিং করছেন শিক্ষার্থীরা। অনেকের কাছে শিক্ষাবোর্ড কর্তৃক নির্ধারিত পাঠ্যবইয়ের চেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে গাইড বই। ফলে এখন চলছে রমরমা কোচিং বাণিজ্য। প্রতিবছর কোচিংয়ে লেনদেন হচ্ছে ৩২ হাজার কোটি টাকা। কোনো ভাবেই রোধ করা যাচ্ছে না শিক্ষা ধ্বংসের এই আত্মঘাতি প্রবণতা। কোচিং কেন্দ্রিক শিক্ষায় পরীক্ষায় নাম্বার তুলতে পারছেন শিক্ষার্থীরা, হয়ত ভর্তিও হতে পারছেন কিন্তু শিক্ষার ঝুলিটা থাকছে শুন্যই থাকছে তাদের।

দেশজুড়ে ব্যঙের ছাতার মত গজিয়ে উঠছে কোচিং সেন্টার। রাজধানীর বড় বড় নামকরা স্কুলে ও পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ভর্তিযুদ্ধকে কেন্দ্র করে বাড়ছে কোচিং বাণিজ্যের বিস্তার। এক দশক ধরে রমরমা বাণিজ্য করছেন এক শ্রেণির শিক্ষা ব্যবসায়ীরা। এতে একদিকে যেমন বাড়ছে পাশ করা শিক্ষার্থীর সংখ্যা অপরদিকে সীমিত আসনে বাড়ছে প্রতিযোগির সংখ্যা। কিন্তু সেই হারে বাড়ছে না শিক্ষার্থীর মান।

জানা গেছে, শিশুদের পিএসসি পরীক্ষাকে ঘিরে কোচিং সেন্টার চালুর হিড়িক পরে যায় সারাদেশে। কেবল রাজধানীতেই এ ধরনের কোচিং সেন্টারের সংখ্যা প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার। নিজ বাসায় কোচিং সেন্টার খুলে বসেছেন নামি দামি স্কুল কলেজের অনেক শিক্ষকরা। অভিযোগ রয়েছে, যেখানে না পড়লে তার রোসানলে পড়েন শিক্ষার্থীরা। পরীক্ষায় নম্বর কমিয়ে দেয়ার ভয় দেখিয়ে শিক্ষার্থীদের কোচিংয়ে বাধ্য ওই সকল শিক্ষকরা। শুধু রাজধানী ঢাকা নয়, এ অভিযোগ আছে দেশের অধিকাংশ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের বিরুদ্ধেই। কোচিং বাণিজ্যে পিছিয়ে নেই জঙ্গি উগ্র মৌলবাদী গোষ্ঠী। ধর্মের নামে সেখানে সুকৌশলে শিক্ষার্থীদের জঙ্গিবাদী পাঠ দেয়া হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে। ফোকাস, রেটিনাসহ অন্তত ১০টি কোচিং সেন্টার রয়েছে, যারা বিশ্ববিদ্যালয় ও মেডিকেল কলেজে ভর্তির কোচিং দেয়ার পাশাপাশি মৌলবাদী তৎপরতা অব্যাহত রাখছেন জামায়াতের ছাত্র সংগঠন ছাত্র শিবিরের ক্যাডাররা। বিশেষজ্ঞদের মতে, মূলত নিত্যনতুন শিক্ষা ও পরীক্ষা পদ্ধতির চালু, মানসম্পন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অভাব, শ্রেনী কক্ষে মানসম্পন্ন শিক্ষা না পাওয়া আর সরকারি অর্থের অপ্রতুলতার কারনে কোচিং নির্ভর হয়ে পড়ছে প্রাথমিক, মাধ্যমিকসহ পুরো শিক্ষা ব্যাবস্থা। রাষ্ট্রের পরিবর্তে শিক্ষা ব্যায়ের চাপ বাড়ছে পরিবারের ওপর।

বাড়ছে শিক্ষা ব্যয় :

সরকারি হিসাব ও দেশি বিদেশী গবেষণা সংস্থার পরিসংখ্যান বলছে, দেশে এই মুহুর্তে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ৫৯ শতাংশ ও সরকারি সহায়তাপ্রাপ্ত (এমপিওভুক্ত) মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ব্যায়ের ৭১ শতাংশই নির্বাহ করে পারিবার। আর এই অর্থের সবচেয়ে বড়ো অংশই ব্যয় হয় কোচিংয়ে। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ৪৩ শতাংশ এবং মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ৮৫ শতাংশ শিক্ষার্থী আটকে আছে কোচিংয়ে। এডুকেশন ওয়াচের এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, পারিবারিক ব্যায়ে প্রাইভেট কোচিংয়ের ওপর নির্ভরতা শিক্ষা ক্ষেত্রে বড় ধরনের সংকট তৈরি করছে। প্রাথমিক পর্যায়েও ব্যাপকভাবে প্রইভেট কোচিংয়ের ওপর নির্ভর হয়ে পড়ছে শিক্ষা ব্যবস্থা।

তথ্য মতে, মাধ্যমিক পর্যায়ে সরকারি স্কুলের ক্ষেত্রে ৮৮ শতাংশ, বেসরকারি স্কুলের ক্ষেত্রে ৭৮ শতাংশ এবং মাদ্রাসার ক্ষেত্রে ৭০ শতাংশ অভিভাবক ছেলে মেয়েদের জন্য প্রাইভেট কোচিংয়ের ব্যবস্থা করে থাকেন। আর প্রাথমিক পর্যায়েও ৩০ থেকে ৪৩ শতাংশ অভিভাবক প্রাইভেট শিক্ষক নিয়োগ করে থাকেন। এই অবস্থা আবার সরকারি স্কুলের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ৪৩ শতাংশ। গবেষণায় দেখা গেছে, প্রাইভেট কোচিংয়ে খরচ হচ্ছে পারিবারিক ব্যায়ের সবচেয়ে বড়ো অংশ। মোট বার্ষিক মাথাপিছু ব্যায়ের ১৬ থেকে ২৪ শতাংশ প্রাথমিক পর্যায়ে এবং ২১ থেকে ৪২ শতাংশ মাধ্যমিক পর্যায়ে। দরিদ্র পরিবারগুলোর পক্ষে প্রাইভেট শিক্ষক নিয়োগ করা সম্ভব হয় না। ফলে এসব পরিবারের ছেলে মেয়েরা স্বচ্ছ্বল ঘরের ছেলে মেয়েদের তুলনায় অনেক বেশি পিছিয়ে থাকতে বাধ্য হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, শিক্ষায় পারিবারিক ব্যায় ও প্রাইভেট শিক্ষকের ওপর নির্ভরতা শিক্ষাক্ষেত্রে সমতা বিধানের পথে সমস্যা সৃষ্টি করছে।

পরীক্ষা পদ্ধতিতেই বড় সমস্যা :

অনেকে মনে করেন, নিত্যনতুন শিক্ষা ও পরীক্ষা পদ্ধতির চালু, মানসম্পন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অভাব, শ্রেনী কক্ষে মানসম্পন্ন শিক্ষা না পাওয়ায় কোচিং নির্ভর হয়ে পড়ছে শিক্ষার্থীরা। আর এই সুযোগে নানা পন্থায় শিক্ষার নামে বেপরোয়া বাণিজ্য চলছে দেশজুড়ে। তেজগাঁওয়ের তেজকুনিপাড়ার একটি কোচিং সেন্টারের নাম ‘সিটাডেল কোচিং সেন্টার’। এই কোচিংয়ের শিশু শিক্ষার্থীদের মায়েরা অভিযোগ করলেন, এখানে কোচিং বানিজ্য এমন পর্যায়ে চলে গেছে যে অধিকাংশ সময় কর্তৃপক্ষ হাজার টাকার ফি নেন। কিন্তু মডেল টেস্ট নিয়ে নিজেরা খাতা পর্যন্ত মুল্যায়ন করেন না। নতুন নতুন ব্যাচ তৈরি করে মডেল টেস্টের নামে অর্থ আদায় করেন। প্রথম শ্রেনীতে ভর্তি পরীক্ষা না থাকলেও অন্যান্য শ্রেনীতে ভর্তির জন্য কোচিং চলছে। আর ’ভাল স্কুলে’ ভর্তির জন্য প্রতিযোগিতাও কাজে লাগায় কোচিং ব্যবসায়ীরা।

এদিকে কোচিংয়ের অভিযোগ আছে ঢাকাসহ দেশের সকল বড় শহরের প্রধান প্রধান শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের বিরুদ্ধেই। তিন বছর আগে শিক্ষকদের কেবল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অধিনে কোচিংয়ের নির্দেশ দেয়া হয়েছিল সরকারিভাবে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় নিষিদ্ধ করা হয়েছিল শিক্ষকদের প্রাইভেট কোাচিং। কিন্তু কোন উদ্যোগেই ইতিবাচক ফল দেয়নি। গনসাক্ষরতা অভিযানের পরিচালক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধুরী বলেন, ‘এটি আজ একটি ব্যাধী হয়ে দাঁড়িয়েছে। আসলে, ভালো মানের স্কুল কম, তাই এই কম স্কুলে ভর্তির জন্য শুরু হয় অসুস্থ্য প্রতিযোগিতা।’

জাতীয় শিক্ষানীতি প্রনয়ন কমিটির সদস্য সচিব অধ্যাপক শেখ ইকরামুল কবীর জানান, কোচিং নির্ভরতা এখন ভয়াবহ সমস্যা হয়ে উঠেছে। স্কুৃলে শিক্ষার্থীদের কোচিংয়ে বাধ্য করা হচ্ছে। আবার বাইরেও দোকান খুলে হাজার হাজার কোটি টাকার কোচিং বানিজ্য হচ্ছে। এগুলো বন্ধ করা জরুরি।

মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদফতরের (মাউশি) মহাপরিচালক অধ্যাপক ফাহিমা খাতুন বলেন, ‘শ্রেনী কক্ষে ছাত্র শিক্ষকের অনুপাত ঠিক করতে না পারলে সমস্যার সমাধান হবে না। একেকটি ক্লাশে ৭০ থেকে ৮০ জন শিক্ষার্থীকে একজন শিক্ষক পড়ালে আসলে কিছুই হয়না। উন্নত দেশগুলোতে এটা করা হয়না। স্বল্প সংখ্যক শিক্ষার্থীর জন্য একজন শিক্ষক নিশ্চিত করা খুব জরুরী। শ্রেনী পক্ষে মানসম্মত পাঠ গ্রহন করতে পারলে শিক্ষার্থীরা বাইরে কোচিংয়ে যাবে না। বিদ্যালয়ে শিক্ষাটা হলে বাইরে হাজার হাজার টাকা খবচ করে কোচিং করার প্রয়োজন হবে না। আসলে আইন দিয়ে জোর করে সমস্যার সমাধান হবেনা।

প্রতিবছর দেশজুড়ে কমপক্ষে ৩২ হাজার কোটি টাকার কোচিং বাণিজ্য চলে বলে মনে করেন খোদ শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ। বহু ক্ষেত্রেই মানহীন শিক্ষকরা সেখানে পাঠদান করছেন। রাজধানী কেন্দ্রিক গড়ে ওঠা বৃহৎ কোচিং সেন্টারগুলো ঢাকার বাইরে একের পর এক শাখা খুলছে। জয়েন্ট স্টক কোম্পানি থেকে নিবন্ধন গ্রহণ করা হয়েছে। একই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস, ভুয়া পরীক্ষার্থী সরবরাহ ও মোটা টাকার বিনিময়ে পরীক্ষায় অসদুপায় অবলম্বনে সহযোগিতা করারও জোরালো অভিযোগ উঠেছে কিছু কিছু কোচিং সেন্টারের বিরুদ্ধে।

শিক্ষা নিয়ে কাজ করা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর মতে, দেশের প্রাথমিক, মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক, স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যন্ত প্রায় সাড়ে পাঁচ কোটি শিক্ষার্থী রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় চার কোটি ২৪ লাখ ছাত্রছাত্রী কোনো না কোনোভাবে মূল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বাইরে অর্থের বিনিময়ে কোচিং নিচ্ছে। এ সংখ্যা প্রায় ৭৭ দশমিক শূন্য ৯ শতাংশ। দেশজুড়ে ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় দুই লাখ কোচিং সেন্টার রয়েছে

আপনার জেলার সর্বশেষ সংবাদ জানুন