• আজ বৃহস্পতিবার, ৫ কার্তিক, ১৪২৮ ৷ ২১ অক্টোবর, ২০২১ ৷

অবশেষে ‘সংশোধন আসছে’ নিখোঁজ ২৬২ জনের তালিকায়


❏ শনিবার, জুলাই ২৩, ২০১৬ Breaking News, আলোচিত বাংলাদেশ, ফিচার, স্পট লাইট

সময়ের কণ্ঠস্বর ডেস্ক –

নানা তথ্য উপাত্ত ও আলোচনা-সমালোচনার পরে অবশেষে নিখোঁজ ২৬২ জনের তালিকায় বেশকিছু পরিবর্তন আনতে চলেছে র‍্যাব। এর আগে গত ১৯ জুলাই মঙ্গলবার রাতে নিখোঁজ ২৬১ জনের একটি তালিকা নিজেদের ফেসবুক পৃষ্ঠায় প্রকাশ করে বাংলাদেশ র‍্যাব। ২৬১ জন নিখোঁজ ব্যক্তির যে তালিকা প্রকাশ করা হয় তার মধ্যে, রিকশাচালক থেকে প্রশিক্ষিত পাইলট রয়েছেন। দোকানী, রাজমিস্ত্রি, গার্মেন্টস কর্মী যেমন আছেন তেমনি প্রকৌশলী কিংবা চিকিৎসকের নামও রয়েছে।

আইএসের ভিডিও চিত্রে যে তিনজন তরুণকে দেখা গিয়েছিল তাদের একজনের নাম ডাক্তার আরাফাত হোসেন তুষার/নাহিদ রেজা তুষার পরিচয়ে তালিকায় এসেছে। তিনি প্রয়াত একজন মেজরের ছেলে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তালিকায় চিকিৎসক রয়েছেন আরও একজন। একজন আছেন মেরিন ইঞ্জিনিয়ার।

যদিও বেশিরভাগেরই শিক্ষাগত যোগ্যতা বা পেশা তালিকায় উঠে আসেনি। তবে কারও কারও শিক্ষাগত যোগ্যতা বিবিএতে অধ্যয়নরত, এমবিএ অধ্যয়নরত, অনার্স ২য় বর্ষে অধ্যয়নরত, কলেজ অধ্যয়নরত- এভাবে লেখা রয়েছে।

তবে আইনশৃংখলা বাহিনীর পক্ষ থেকে  নিখোঁজ ২৬২ জনের তালিকাটি প্রকাশের পরদিন থেকেই ফুটে ওঠে  ভিন্নচিত্র । এই তালিকা  ”বিতর্ক ও অনাস্থার খোরাকে পরিণত হয়েছে”  বলে মন্তব্য করছেন অনেকেই। তালিকায় প্রকাশিত ব্যক্তিদের অনুসন্ধানে দেখা যায়, যাদের নাম-পরিচয় এসেছে তাদের কিছুসংখ্যক বাড়িতেই আছেন। কেউ কেউ বাড়ি ছেড়েছেন প্রেমের টানে। এমনকি মৃত ব্যক্তিকেও নিখোঁজ দেখিয়ে তালিকাভুক্ত করা হয় বলেও অভিযোগ উঠে ।

শুধু সাধারন মানুষই নয়, খোদ পুলিশের আইজিপিও প্রশ্ন তুলেছেন এ তালিকা নিয়ে। পুলিশ প্রধান একেএম শহীদুল হক বৃহস্পতিবার চট্টগ্রামের এক অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের বলেন, ‘র‍্যাবের প্রকাশিত এ তালিকা অপূর্ণাঙ্গ। তালিকার সবাই জঙ্গি নন। এরকম তালিকা পুলিশের কাছেও আছে। পুলিশের পক্ষ থেকে যাচাই-বাছাই শেষে জঙ্গি কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্তদের একটি নতুন তালিকা প্রকাশ করা হবে।’

rab-missing-info-262

এদিকে, গত কয়েকদিন প্রকাশিত তালিকাটি নিয়ে জনমনে নানা প্রশ্ন দেখা দেবার পর ফের নতুন করে সংশোধন করা হচ্ছে র‌্যাবের প্রকাশিত নিখোঁজ তালিকা । র‍্যাব সুত্র জানিয়েছে সংশোধিত নতুন তালিকা থেকে যেমন বাদ পড়বে প্রকাশিত অনেকেরই নাম তেমনি যোগ হতে পারে আরও কিছু নতুন নাম ।

র‌্যাব সূত্র জানায়, স্বল্প সময়ে তালিকা তৈরি করায় সবার পূর্ণাঙ্গ তথ্য পাওয়া যায়নি। অনেকের বাবার নাম ও ঠিকানা বা প্রয়োজনীয় তথ্য তাৎক্ষণিকভাবে মেলেনি। তবে খুব কম সময়ের  মধ্যে একটি নির্ভুল তালিকা তৈরির চেষ্টা করা হয়েছিল। এখন সবার ব্যাপারে আলাদাভাবে তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। এতে কিছুটা সময় লাগবে।
র‌্যাবের এক কর্মকর্তা জানান, মূলত সবাইকে খুঁজে বের করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। কেউ যদি দীর্ঘদিন নিখোঁজ থাকার পর ফিরে আসেন, তাকেও জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। তার নিখোঁজ থাকার কারণ এবং ওই সময়ে তার কর্মকাণ্ড খতিয়ে দেখা হবে। সংশোধিত তালিকায় ফিরে আসা কিছু লোকের নাম যেমন বাদ যাবে, তেমনি যুক্ত হবে নতুন অনেক নাম।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, তালিকায় নিখোঁজ ২৬২ জনের মধ্যে অনেকেই ফিরে এসেছেন। তাদের সংখ্যা প্রায় ১০০। এ তালিকার অনেকেই আছেন বাড়িতে। কেউ কেউ আছেন কারাগারে। কেউ স্ত্রীর সঙ্গে ঝগড়া করে ঘর ছাড়লে তাকেও স্থান দেয়া হয়েছে এ তালিকায়।

জানা গেছে, তালিকায় যাদের নাম আছে তারা কে কোথায় আছেন, কী কারণে তারা নিখোঁজ ইত্যাদি সব তথ্য সঠিক জানার পর সংশোধিত তালিকা প্রকাশ করা হবে। পাশাপাশি প্রায় প্রতিদিনই বেরিয়ে আসছে নতুন নতুন নিখোঁজ ব্যক্তির নাম। তাদের কেউ মাত্র কয়েকদিন আগে, আবার কেউ বছরের পর বছর ধরে নিখোঁজ। নতুন করে আসা এসব ব্যক্তির নামও সংশোধিত তালিকায় ঠাঁই পাবে বলে জানা গেছে।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে, র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার মুফতি মাহমুদ খান সাংবাদিকদের জানান, তালিকায় থাকা সবার ব্যাপারে নতুন করে তদন্ত করে দেখছেন তারা । প্রকাশিত তালিকার  কেউ কেউ এরই মধ্যে বাড়ি ফিরে এসেছেন। আছেন কারাগারে বা প্রবাসে_ এমন তথ্য পেয়ে তালিকা আবার যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। প্রত্যেকের পূর্ণাঙ্গ খোঁজ-খবর নিয়ে সংশোধিত তালিকা তৈরির কাজ করছে র‌্যাব।

তিনি আরও জানান, বিভিন্ন থানার সাধারণ ডায়েরি (জিডি), র‌্যাবের কাছে আসা অভিযোগ ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিভিন্ন ইউনিটের কাছে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে প্রাথমিকভাবে একটি নিখোঁজ তালিকা তৈরি করা হয়। পরে তাদের কারও কারও খোঁজ পাওয়া যায় গণমাধ্যমের মারফত। সার্বিকভাবে তালিকায় কোনো ত্রুটি পাওয়া গেলে তা সংশোধন করা হচ্ছে।

nikhoj

এর আগে র‍্যাবের প্রকাশিত তালিকার সুত্রধরে  একটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত সংবাদে সেই তালিকার বিশ্লেষণে দেখা গেছে- ‘ঝিনাইদহ জেলার ২৯ জনের নাম আছে। তাদের মধ্যে দু’জন প্রতিবন্ধী। তারাসহ ২৪ জন বাড়িতেই আছেন। তাদের কেউই উগ্রবাদী বা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িত নন। তালিকার দু’জন ইতিমধ্যে মারা গেছেন। তারা হলেন ঝিনাইদহ পৌরসভার খাজুরা গ্রামের কমিশনার গোলাম মোস্তফার বড় স্ত্রীর ছেলে দেলোয়ার হোসেন দুলাল ও একই গ্রামের গোলাম আজম। ২০১৫ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি অজ্ঞাত দুর্বৃত্তরা তাদের হত্যা করে লাশ ফেলে যায়। অথচ নিখোঁজের তালিকায় তাদের নাম রয়েছে।

তালিকায় আছে ঠাকুরগাঁও পৌরসভার মুন্সীরহাট গ্রামের নূরুজ্জামান আরিফের নাম। অথচ তিনি বর্তমানে কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগারে। নিখোঁজের তালিকায় তার নাম দেখে নতুন করে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন তার বাবা আবু তালেব। তিনি জানান, ২০১৪ সালের ১ নভেম্বর সিরাজগঞ্জ রেল স্টেশন থেকে র‌্যাব তার ছেলেকে গ্রেফতার করে। র‌্যাব সদর দফতরে সাংবাদিকদের সামনে হাজির করে তাকে জেএমবির সদস্য বলে দাবি করা হয়। পরে তাকে সিরাজগঞ্জ রেলওয়ে থানায় সোপর্দ করা হয়। তার বিরুদ্ধে র‌্যাব বাদী হয়ে দুটি মামলাও দেয়। ওই মামলায় নূরুজ্জামান আরিফকে কারাগারে পাঠানো হয়। বর্তমানে আরিফ গাজীপুরের কাশিমপুর কারাগারে আছেন। এখন সেই র‌্যাবই তার নাম নিখোঁজের তালিকায় দেখাচ্ছে। আবু তালেব বলেন, ‘এসব ঘটনায় আমরা নতুন করে ভয়ের মধ্যে আছি।’

তালিকার ৬২ নম্বরে রয়েছেন রেজাউল করিম সোহেলের নাম। তিনি নিজ বাড়িতেই একটি ঘরে বন্দি বলে দাবি করেন তার বাবা। কারণ সোহেল মানসিক প্রতিবন্ধী। তালিকার ৬৩ নম্বরে থাকা মামুন রায়হান বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী। কালীগঞ্জ উপজেলার হেলাই গ্রামের মাজেদুল হক, দাদপুর গ্রামের আবু সাঈদ ও বলরামপুর গ্রামের মো. হাসান আলী নিজ বাড়িতে আছেন তারা।

২০৬ নম্বরে থাকা মহেশপুরের গোয়ালহুদা গ্রামের বাপ্পি ও ২৩২ নম্বরে থাকা একই গ্রামের ওয়াফিল বাড়িতেই আছেন। হরিণাকুণ্ডের কাচারিতোলা গ্রামের সবদুল হোসেন জানান তালিকায় নাম থাকা তার মেয়ের জামাই মো. মতিয়ার রহমান (৩০) মেয়ের সঙ্গে ঝগড়া করে নিজ গ্রাম সাগান্নায় চলে যান। বিপদের আশংকা করে ওই সময় সংশ্লিষ্ট থানায় একটি জিডি করেন তিনি।

৮১ নম্বরে থাকা একই উপজেলার আদর্শ আন্দুলিয়া গ্রামের শফিকুল ইসলামও বাড়িতেই আছে। পুলিশ বলছে জেলায় প্রকৃত নিখোঁজের সংখ্যা তিনজন।

ঢাকার কলাবাগান থেকে মাহমুদুর রহমান (কাজল) ১৪ মার্চ নিখোঁজ হওয়ার দু’দিন পর ফিরে আসেন। তার বাবা থানায় নিজে গিয়ে সেই খবর দিয়ে আসেন। অথচ তালিকায় তার নামও এসেছে।
ঢাকার আশুলিয়ার হাবিবুর রহমান সংবাদ মাধ্যমকে বলেন, ‘আমি তো নিখোঁজ না। বাড়িতে একটু ঝামেলা হয়েছিল। ১০-১২ দিন বাড়িতে ছিলাম না। তাই বড় ভাই থানায় জিডি করেন। তারপর ফিরে আসি। অথচ তালিকায় আমার নামও এসেছে।’
চট্টগ্রামের নিখোঁজের তালিকায় থাকা জানে আলম জানান, তার বাড়ি ময়মনসিংহে। তিনি ঝগড়া করে ২১ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রামে দ্বিতীয় স্ত্রীর কাছ থেকে প্রথম স্ত্রীর কাছে ময়মনসিংহে চলে যান। পরে আবার চট্টগ্রামের পতেঙ্গার বাসায় ফিরেছেন। তালিকার তার নামও রয়েছে।

নিখোঁজ তালিকায় থাকা রংপুরের বৈরাগীপাড়ার রেজওয়ানুর রহমান এখন রংপুর প্রেস ক্লাব ভবনের নিচ তলায় একটি কম্পিউটারের দোকানে কাজ করছেন। তালিকার আরেকজন শায়েস্তা খান এখন কুড়িগ্রাম সরকারি কলেজে হিসাববিজ্ঞান বিভাগের ছাত্র। তিনি বাড়িতে থেকে নিয়মিত ক্লাস করছেন।
নীলফামারীতে নিখোঁজ বরকতুল্লাহ ১৭ মে গ্রেফতার হয়ে কারাগারে আছেন। নরসিংদীর কমর উদ্দিন ও শাহাজ উদ্দিন আছেন বাড়িতেই। বরিশালের নিখোঁজ মো. জোবায়ের হোসেন ফারুক বর্তমানে মালয়েশিয়ায়। তিনি বাড়িতে নিয়মিত ফোন করেন এবং টাকাও পাঠান। হবিগঞ্জের নিখোঁজ মাধবপুরের সুন্দোল গ্রামের নাহিদুল ইসলাম ইমন ২৮ বাড়ি ছেড়ে ঢাকায় চলে যান। ১৪ জুলাই বাড়ি ফেরেন। কিন্তু তিনিও এখন তালিকাভুক্ত নিখোঁজ।

আপনার জেলার সর্বশেষ সংবাদ জানুন