• আজ মঙ্গলবার, ৪ মাঘ, ১৪২৮ ৷ ১৮ জানুয়ারি, ২০২২ ৷

ডিমলায় ২ হাজার পরিবারের বসতবাড়ী সহ গুরুত্বপূর্ন স্থাপনা বিলীন


❏ শনিবার, আগস্ট ৬, ২০১৬ দেশের খবর, রংপুর

মাজহারুল ইসলাম লিটন, ডিমলা প্রতিনিধি: আমাগো আর ত্যারানের (ত্রানের) পয়জন (প্রয়োজন) নাই। আমাগোরে বাঁচাইতে চাইলে নদীর মইদ্দে (মধ্যে) বাদের (বাঁধের) ব্যবস্থা কইরা দ্যানগো বাবা। আমাগোরে বাচাঁন। আমরা আর ত্যারান (ত্রান চাইনা)। বাঁচবার নাইগা নদীর মইদ্দে বাদ দিয়া দ্যান। তিস্তার বন্যায় সব হারানো ৯০ উর্দ্ধ বৃদ্ধ আফজাল হোসেন কেঁদে কেদেঁ কথাগুলো বল্লেন। তিস্তার পাড়ের ক্ষতিগ্রস্থ পরিবারগুলো আর ত্রান চায় না বন্যার কবল থেকে রক্ষা পেতে দ্রুত সময়ের মধ্যে তিস্তা নদীতে বন্যা নিয়ন্ত্রন বাঁধ নির্মানের দাবী করেছেন।

pani

গত ২৪ দিনের টানা বন্যার কারনে তিস্তার বসতভিটা বিলিন হয়ে ১ হাজার ৮৬৩ পরিবার বাঁধ সহ উচু স্থানে আশ্রয় নিয়েছে। প্রতিটি পরিবারের জন্য সরকারী ভাবে ৪ দফায় ৭০ কেজি করে চাল, শুকনো খাবার প্যাকেট ও নগদ ১ হাজার টাকা বিতরন করা হয়েছে। এছাড়া বিভিন্ন এনজিও সহ আ’লীগ, ছাত্রলীগের উদ্দ্যেগে ত্রান বিতরন করা হয়েছে। দীর্ঘ ২৪ দিন থেকে রান্না করা খাবার বিতরন করেছে। গত মঙ্গলবার বন্যা ত্রান দূর্য়োগ ও পূর্নবাসন মন্ত্রী মোয়াজ্জল হোসেন মায়া সহ আওয়ামীলীগের ৫ সদস্যের প্রতিনিধি দল বন্যায় ক্ষতিগ্রস্থ এলাকা পরিদর্শন শেষে। প্রতিনিধি দলটি তিস্তার হেলিপ্যাড মাঠে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্থ পরিবারগুলোর জন্য উপজেলা প্রশাসন ও ত্রান মন্ত্রানালয়ের উদ্দ্যেগে ৩০ কেজি করে চাল ও নগদ ১ হাজার করে টাকা বিতরন করেন। এবং বন্যায় নিঃস্ব পরিবারের অতি দ্রুত তালিকা তৈরী করে নিঃস্ব পরিবার গুলির মাঝে ৩ বান্ডিল করে টিন ও নগদ ৩ হাজার করে টাকা প্রদানের জন্য নীলফামারী জেলা প্রশাসককে নির্দেশ প্রদান করেন।

এ সময় বে-সরকারী বিমান পর্যটন ও পরিবহন স্থায়ী কমিটির সভাপতি, সাবেক বানিজ্যমন্ত্রী ও আওয়ামীলীগের আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক কর্নেল ফারুক খান এমপি, আওয়ামীলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির দপ্তর সম্পাদক অসীম কুমার উকিল, নীলফামারী জেলা প্রশাসক জাকীর হোসেন, নীলফামারী-১ আসনের সংসদ সদস্য মুক্তিযোদ্ধা আফতাব উদ্দিন সরকার, সংরক্ষিত মহিলা আসন ৩০২ লালমনিরহাট এ্যাডভোকেট সফুরা বেগম, লালমনিরহাট জেলা পরিষদের প্রশাসক ও জেলা আওয়ামীলীগের সাধারন সম্পাদক মতিয়ার রহমান উপস্থিত ছিলেন। ত্রান ও দুর্যোগ মন্ত্রনালয়ের সহকারী পরিচালক গিয়াস উদ্দিন আহম্মেদ বলেন, সরকারী ভাবে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্থ পরিবারের জন্য পর্যাপ্ত পরিমানের ত্রান মজুদ রয়েছে। ত্রান দূর্যোগ ও পূর্নবাসন মন্ত্রী মোফাজ্জল হেসেন চৌধুরী মায়া বলেন, বর্ষার পর তিস্তা নদী খনন করে নদীর দুই পাশে বাঁধ তৈরী করা হবে। ক্ষতিগ্রস্থ পরিবারগুলোকে পূর্নবাসনের ব্যবস্থা করা হবে।

তিনি আরো বলেন, শেখ হাসিনার সরকার নদীতে বিশেষ গুরুত্ব নিযে খনন করার প্রস্ততি নিচ্ছে। তিস্তা নদীতে শিগ্রই পলি অপসারনের কাজ শুরু করা হবে। বুধবার কেন্দীয় ছাত্রলীগের একটি প্রতিনিধি দল উপজেলার বন্যা এলাকা পরিদর্শন ও ত্রান বিতরন করেন। এ সময় কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সভাপতি মোঃ সাইফুর রহমান সোহাগ, সহ-সভাপতি আমিনুল ইসলাম, নুরুল করিম, তুহিন, আবু নাসের রুবেল, যুগ্ন সাধারন সম্পাদক রেজাউল ইসলাম রেজা, বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয় সম্পাদক আনন্দ শাহা পার্থ, সহ-সম্পাদক রূহুল আমীন, নীলফামারী জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি স্বজল কুমার ভৌমিক, ডিমলা উপজেলা ছাত্রলীগের সভাপতি আবু সায়েম উপস্থিত ছিলেন। তিস্তার ভাঙ্গনে সর্বশান্ত হয়ে দুই হাজার পরিবার বাঁধ সহ উচু স্থানে আশ্রয় নিয়েছে। তিস্তা নদীর ভরাট হওয়ায় ফলে গত ২৪ দিনে তিস্তার মূল অংশের বাইরে চরখড়িবাড়ী হয়ে নতুন একটি চ্যানেল তৈরি হয়েছে। টেপাখড়ি বাড়ী ইউনিয়নের চরখড়িবাড়ী, মধ্য খড়িবাড়ী, পুর্ব খড়িবাড়ী, একতার বাজার, দীঘির পাড়, টাবুর চর সহ ১০টি গ্রামের ২ হাজার ২৪০টি পরিবার বসবাস করলেও ইতিমধ্যে ১ হাজার ৬শ পবিবারের বসতভিটা, আবাদী জমি, বিদ্যালয়, রাস্তাঘাট, পুল কালভার্ট বিলিন হয়েছে। ঝুনাগাছ চাপানি ইউনিয়নের ছাতুনামা ও ফরেষ্টের চরের ৩৪৫টি পরিবার নদী গর্ভে বিলিন হয়েছে।

খগাখড়ি বাড়ী ইউনিয়নের কিসামত ছাতনাই গ্রামের ৩৫টি পরিবার ও খালিশা চাপানি ইউনিয়নের ২৫টি পরিবারের বসতভিটা তিস্তা নদীতে বিলিন হয়েছে। উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন অফিস সুত্রে জানা যায়, তিস্তার বাঁধ সহ উচু স্থানে ১ হাজার ৮৬৩টি পরিবার বসতভিটা ভেঙ্গে বাঁধে আশ্রয় নিয়েছে। উপজেলা প্রশাসন ও ত্রান মন্ত্রানালয়ের উদ্দ্যেগে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্থদের তালিকা প্রস্তুত সহ সহযোগীতার জন্য ৭টি তথ্য কেন্দ্র খোলা হয়েছে। তথ্য কেন্দ্রে সুত্রে জানা যায়, তিস্তার সিলট্রাপে ৫১৬টি পরিবার, তিস্তার ক্যাঞ্জার ড্যাম (কলম্বিয়া বাধে) ১৪৭টি পরিবার, তেলির বাজার ১২০টি, চেয়ারম্যান বাড়ী সংলগ্ন বাঁধে ৮৪টি, যৌথ বাঁধে ১৭৭টি, সানিয়াজান বাঁধে ২১৭টি, ফ্লাড ফিউজ সংলগ্ন বাধে ১৮৭টি পরিবার, খগাখড়িবাড়ী ইউনিয়নের দোহলপাড়া বাঁধে ৫০টি পরিবার, কালীগঞ্জ যৌথ বাঁধে ৪০টি পরিবার, ঝুনাগাছ চাপানি ইউনিয়নের পুর্ব ছাতুনামা ৩৪৫টি পরিববার আশ্রয় নিয়েছে। এছাড়া ৮টি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ১টি উচ্চ বিদ্যালয়, ২টি কমিইউনিটি সহ বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ন স্থাপনা তিস্তাগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে।

তিস্তা নদীর নতুন করে চ্যানেল তৈরি হওয়ার ফলে চরখড়িবাড়ী হয়ে নতুন নদীটি পথ পরিবর্তন করায় নীলফামারীর ডিমলা ও লালমনিরহাট জেলার হাতিবান্ধা উপজেলার ৪টি ইউনিয়ন সহ ৪ হাজার পরিবার ও তিস্তার ফ্লাড ফিউজ চরম হুমকির মধ্যে পড়েছে। বন্যায় ক্ষতিগ্রস্থ পরিবারের জিঞ্জির পাড়ার মকদুম আলী (৮০), পূর্ব ছাতনাই ইউনিয়নের জাহেদুল ইসলাম (৬৫), ছবিতন বেওয়া ময়না (৪৫), কিসামত ছাতনাই চরের আব্দুল করিম যাদু (৫৫), ছাতুনামা ভেন্ডাবাড়ীর কুলসুম বেওয়া (৭৫) সহ বন্যা ও ভাঙ্গনের কারনে নদী গর্ভে পরিবার গুলির অনেকে বলেন, আমরা সরকারের নিকট ত্রান চাইনা বাঁচার জন্য তিস্তা নদীতে বন্যা নিয়ন্ত্রন বাঁধ চাই। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রেজাউল করিম বলেন, তিস্তার ভাঙ্গনের ক্ষতিগ্রস্থ পরিবারের মাঝে ত্রান মন্ত্রনালয়ের ৩শ ৬০ মেট্রিক টন চাল ও নগদ ১০ লক্ষ ৫৫ হাজার টাকা ও শুকনো খাবারের ২ হাজার ৫শ প্যাকেজ বিতরন করা হয়েছে। এবং সরকারীভাবে চাহিদা অনুযায়ী প্রতিদিন ত্রান বিতরন অব্যাহত রয়েছে।

বন্যায় ক্ষতিগ্রস্থদের জন্য ত্রানের জন্য কোন ঘাটতি নেই। বন্যায় ক্ষতিগ্রস্থ উপজেলার টেপাখড়িবাড়ী ইউপি চেয়ারম্যান রবিউল ইসলাম শাহীন, খগাখড়িবাড়ী ইউপি চেয়ারম্যান রবিউল ইসলাম লিথন, ঝুনাগাছ চাপানী ইউপি চেয়ারম্যার আমিনুর রহমান ও পূর্বছাতনাই ইউপি চেয়ারম্যান প্রভাষক আব্দুল লতিফ খান বলেন, বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার গুলির মাঝে সরকারী ভাবে পর্যাপ্ত ত্রান বিতরন করা হয়েছে। এবং ত্রান বিতরন অব্যাহত রয়েছে। তারা বলেন, ক্ষতিগ্রস্থ পরিবারগুলি আর ত্রান চায়না। তারা সরকারের কাছে ত্রানের পরিবর্তে বন্যা নিয়ন্ত্রন বাঁধ চায়।