• আজ শুক্রবার, ৭ মাঘ, ১৪২৮ ৷ ২১ জানুয়ারি, ২০২২ ৷

অবৈধ স্থাপনা রক্ষা করতে গিয়ে টঙ্গী সাতাইশ রোডে চৌদ্দ কোটি টাকা প্রকল্পের গোড়াতেই গলদের অভিযোগ


❏ বুধবার, আগস্ট ১০, ২০১৬ ঢাকা

রেজাউল সরকার(আঁধার), গাজীপুর প্রতিনিধি : সিটি করপোরেশনের টঙ্গীতে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পের গোড়াতেই মারাত্মক গলদের অভিযোগ উঠেছে।

আলোচিত সাতাইশ রোড সংস্কার ও ড্রেন নির্মাণ প্রকল্পটি বাস্তবায়নের আগে রোডের দুই পাশের অধিকাংশ অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করা হয়। শুধু বাকি থেকে যায় রোডের গোড়া বা প্রারম্ভিক অংশের বেশ কিছু অবৈধ স্থাপনা।
এলাকাবাসী ধরে নিয়েছিলেন হয়তো এসব স্থাপনা সবশেষে উচ্ছেদ করা হবে। কিন্তু এসব স্থাপনা বিদ্যমান রেখেই ওই অংশে প্রকল্পের মূল কাজ সমাপ্ত হতে দেখে এলাকাবাসীর ভুল ভাংগে। তারা এখন বুঝতে পারছেন উচ্ছেদ থেকে রক্ষা পাওয়া এসব স্থাপনার মালিকদের সাথে প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের হয়তো কোন রফাদফা হয়েছে।
সরজমিন গিয়ে দেখা গেছে, ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের টঙ্গীর গাজীপুরা বাসস্ট্যান্ড থেকে প্রকল্পটির শুরু। এই প্রারম্ভিক অংশে ফুটপাত রুদ্ধ করে গড়ে উঠা নয়তলা পোশাক কারখানাসহ বিভিন্ন পাকা দোকানপাট রয়েছে। সড়কের ওপর এগুলোর কোন কোনটির মূল ভীত ও বর্ধিতাংশ উচ্ছেদ না করেই প্রকল্পটির মূল কাজ ‘ডালাই’ সমাপ্ত করা হয়েছে। ডালাইয়ের বাকি অংশের সলিং ও ইউনি ব্লকের কাজও শুরু হচ্ছে। বিদ্যমান এসব স্থাপনার কারণে রোডটি গোড়ার অংশে চিকন বা সংকোচিত হওয়ায় দুটি মাঝারি সাইজের গাড়ি আব-ডাউনের পর আর কোন জায়গা অবশিষ্ট থাকে না। এতে করে দুই পাশে যদি বড় বা মাঝারি সাইজের গাড়ির লাইন পড়ে যায় তাহলে রিকশা বা অন্য ছোট বাহনের রাস্তায় দাঁড়ানোর জায়গা থাকে না। এ অবস্থায় মহাসড়কের পাশে রোডটির গোড়ার অংশে জটিল যানজটের সৃষ্টি হচ্ছে। একই কারণে রোডটির গার্মেন্টস পল্লীর ভিয়ালাটেক্ এলাকায়ও যানজটের সৃষ্টি হয়ে থাকে। গোড়ার অংশে চিকন এবং ভেতরের বাকি অংশে অপেক্ষাকৃত বেশি প্রসস্ত হওয়ায় মহাসড়কে ঢুকতে ও বের হতে গাড়ির স্বাভাবিক গতিপ্রবাহ স্লথ হয়ে জ্যাম লেগেই থাকে। এর জেরে প্রকল্পভুক্ত রোডটির অধিকাংশ এলাকা এমনকি কখনো পুরো রোড জুরেই যানজট দীর্ঘায়িত হয়।
ddস্থানীয়দের অভিযোগ, প্রকল্পের প্রারম্ভিক বা গাজীপুরা অংশের অবৈধ স্থাপনার মালিকরা সিটি করপোরেশনের সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীদের মোটা অংকের উৎকোচ দিয়েছেন অথবা ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে প্রকল্প প্রভাবিত করেছেন।
একটি সূত্র জানায়, সিটি করপোরেশনের প্রকৌশলীরা গাজীপুরা অংশে পুরনো আরসিসি ড্রেন বহাল  রাখার অজুহাত দেখিয়ে প্রকল্প প্রস্তাব চূড়ান্ত করেন। মূলত: ড্রেন রক্ষার নামে অবৈধ স্থাপনাগুলো রক্ষার উদ্দেশ্য ছিল তাদের। ড্রেনটি ভেঙ্গে অবৈধ স্থাপনার স্থলে নতুন করে ড্রেন নির্মাণ হলে রাস্তার প্রসস্ততা বাড়তো। রোডের পুরো অংশে প্রকল্পভুক্ত নতুন ড্রেন নির্মাণ হলেও প্রারম্ভিক অংশের এই পুরনো ড্রেন বিদ্যমান রাখায় একদিকে প্রকল্পের যেমন সৌন্দর্যহানী ঘটছে অপরদিকে রোডটি পুরোপুরি চালুর পর অতিরিক্ত যানবাহনের চাপে পুরনো ড্রেন ভেঙ্গে আরো জটিলতা সৃষ্টির আশঙ্কা থেকে যাচ্ছে।
গাজীপুর সিটি করপোরেশনের প্রকৌশল বিভাগ সূত্রে জানা যায়, এশিয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) অর্থায়নে নগরাঞ্চল উন্নয়ন প্রকল্পের (সিআরডিপি) আওতায় ১৩ কোটি ৭০ লাখ টাকা ব্যয়ে সাতাইশ রোড সংস্কার ও পাইপ ড্রেন নির্মাণ প্রকল্পের কাজ শুরু হয় ২০১৫ সালে। এক বছরের মধ্যে প্রকল্পের কাজ সমাপ্ত হওয়ার কথা ছিল। পরবর্তীতে আরো ৬ মাস সময় বাড়ানো হয়। বর্ধিত এই ৬ মাসের মধ্যেও প্রকল্প সমাপ্ত না হওয়ায় বর্তমানে আরো ৩ মাস সময় বাড়ানোর প্রক্রিয়া চলছে। প্রকল্পের এখনো ৩০ থেকে ৪০ ভাগ কাজ বাকি। এঅবস্থায় কাজের কচ্চপ গতির কারণে দ্বিতীয় দফা সময় বাড়ানোর পরও প্রকল্পটির পুরোপুরি বাস্তবায়নে অনিশ্চিয়তা রয়েছে। প্রকল্পটির দৈর্ঘ্য ২৭৮০ মিটার, ফুটপাত ও ড্রেনসহ প্রস্ত ৪০ ফিট, রোডের মাঝে ডালাই অংশ ১২ ফিট ২ ইঞ্চি, বাকি দুই পাশে মোট ১২ ফিট ১০ ইঞ্চি সলিংয়ের ওপর ইউনিব্লক হচ্ছে। তবে আলোচিত পুরনো ড্রেন ও অবৈধ স্থাপনা বিদ্যমান থাকায় গাজীপুরা এলাকায় রোডের প্রস্ত ৩০ থেকে ৩৫ ফিট।
রোডের মাঝের ডালাই অংশ বাদে বাকি কাজের (ইউনি ব্লক) স্থায়িত্ব নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন স্থানীয়রা। ভারি যানবাহনের চাপে সলিং বা ইউনিব্লক দেবে গেলে পরিস্থিতি আরো জটিল হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন এলাকাবাসী।
সোমবার সরজমিনে দেখা গেছে, স্থানীয় মাসকো গার্মেন্টস এলাকায় ইউনিব্লক অংশের বেজ ডালাই কাজে ব্যবহার হচ্ছে ছোট্ট রোলার মেশিন। এই ছোট্ট মেশিনটির চাপে মাটির বেজ ডালাই কতটুকু পোক্ত হবে এবং পরবর্তীতে রোডের ওই অংশ ভারি যানবাহনের চাপ সামলাতে পারবে কিনা এমন প্রশ্নও করছেন অনেকে। মূলত রোডের ১২ ফিট ডালাই অংশই মূল রোড। ভারি যানবাহনের চাপে ডালাইয়ের দুই পাশের বাকি অংশ দেবে গিয়ে আরো জটিল যানযট সৃষ্টির আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে। প্রকল্পের খরতৈল এলাকায় গিয়ে দেখা গেছে, রোডের মাঝ অংশ বড় রোলার মেশিন দিয়ে ডলা হচ্ছে। এর বেজ ডালাই কাজে যে মানের ইট ব্যবহার করা হচ্ছে শুকনো মাটিও এসব ইটের চেয়ে শক্ত। এসব ইট বালি দিয়ে ঢেকে রোলার দিয়ে সমান করা হচ্ছে। পরে এর ওপর রড-সিমেন্ট-পাথরের ডালাই দেয়া হবে। সেখানে দেখা গেছে রাস্তার পাশে পুরনো ও আকা-বাঁকা রড হাতুরি দিয়ে সোজা করে ডালাইয়ের জন্য প্রস্তুত করা হচ্ছে। নিম্মমানের ইট ব্যবহার এবং চিকন ও কোথাও পুরনো রড দিয়ে ডালাই কাজ করায় রোডটির স্থায়িত্ব নিয়েও আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন এলাকাবাসী।
স্থানীয় ওয়ার্ড কাউন্সিলর মজিবুর রহমান বলেন, যথা সময়ে কাজ সমাপ্ত করার জন্য ঠিকাদারকে বার বার চাপ দেওয়া হচ্ছে। সাইডে গিয়ে সংশ্লিষ্টদের শুধু ‘মাইর’ দেওয়া বাকি আছে। রাস্তার ডালাই বাদে বাকি অংশের টেকশই নিয়ে প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, ডিজাইজের বাইরে আমরা যেতে পারছি না।
এব্যাপারে গাসিক টঙ্গী আঞ্চলিক কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী এ.বি.এম সিদ্দিকুর রহমান খান বলেন, প্রকল্পটির যেভাবে ডিজাইন করা হয়েছে ঠিক সেভাবেই কাজ হচ্ছে। কোথাও কোন অনিয়ম হয়নি। গাজীপুরা অংশে আরসিসি ড্রেন থাকায় আমরা ড্রেনের বাইরে যেতে পারি নাই। প্রকল্পভুক্ত ফুটপাতে টাইলস হবে জানিয়ে তিনি বলেন, সাতাইশ রোডটি হবে গাজীপুর সিটি করপোরেশনের অত্যাধুনিক একটি দৃষ্টি নন্দন সড়ক। প্রকল্পটি সমাপ্ত না হওয়া পর্যন্ত এর বাস্তব দৃশ্য বুঝিয়ে বলা মুশকিল।