• আজ শুক্রবার, ১৪ মাঘ, ১৪২৮ ৷ ২৮ জানুয়ারি, ২০২২ ৷

আফগানিস্তানে ক্রীতদাসের চেয়েও খারাপ অবস্থায় ২৭ বাংলাদেশি


❏ রবিবার, আগস্ট ১৪, ২০১৬ ফিচার

সময়ের কণ্ঠস্বর ডেস্ক –  ‘ আমাদের বাঁচান, আমরা মরে যাচ্ছি, আমাদের দেশে নেওয়ার ব্যবস্থা করেন, আমরা পরিবারের কাছে যেতে চাই,  আমরা এখানে ক্রীতদাসের চেয়েও খারাপ অবস্থায় আছি’— সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এভাবেই আকুতি জানাতে লাগলেন আফগানিস্তানে ক্রীতদাসের চেয়েও খারাপ অবস্থায় থাকা ২৭ বাংলাদেশি  ।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁদের এই আকুতি শুনে পুরো ঘটনা জানতে চাইলে তাঁরা বলেন, কাজের সন্ধানে আফগানিস্তানে এসে তাঁরা একপ্রকার বন্দী হয়ে পড়েছেন। একটি বন্ধ হয়ে যাওয়া ইস্পাত কারখানার তিনতলা ভবনের একটি কক্ষে তাঁদের আটক করে রাখা হয়েছে। গত নয় মাস কোনো বেতন দেওয়া হয়নি। উল্টো ভিসার মেয়াদ ফুরিয়ে যাওয়ায় ৩৫ লাখ টাকা জরিমানা করেছে আফগান কর্তৃপক্ষ।

afgan

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভিডিও কলে দেখা যায়, একটি ঘরের মধ্যে গাদাগাদি করে বসে ও শুয়ে রয়েছেন ২৫ জন বাংলাদেশি। পরে টেলিফোনে তাঁরা তাঁদের দুরবস্থার কথা তুলে ধরেন। তাঁদের পাঁচজন মানিকগঞ্জের, দুজন ময়মনসিংহের, বাকিরা অন্য কয়েকটি জেলার।

এই ২৫ জন বাংলাদেশের বিভিন্ন ইস্পাত কারখানায় কাজ করতেন। বাংলাদেশে রামপ্রসাদ নামের ভারতীয় এক নাগরিকের সঙ্গে তাঁদের পরিচয় হয়। ভালো চাকরি ও বেতনের প্রলোভন দেখিয়ে তাঁদের নেওয়া হয় আফগানিস্তানের হেরাত প্রদেশে। সেখানে গজরা এলাকায় আফগান ফ্লোয়াড স্টিল মিলে চাকরিও দেওয়া হয়। এই কাজ পাওয়ার জন্য রামপ্রসাদকে দেড় লাখ টাকা করে দিয়েছেন একেক জন। কিন্তু ভিসার মেয়াদ মাত্র এক মাসের। ভিসা নবায়ন হবে এই ভরসায় কাজ শুরু করেন শ্রমিকেরা। কিন্তু দুই মাস পর ওই কারখানাই বন্ধ হয়ে যায়।

শ্রমিকেরা অভিযোগ করেন, কারখানা বন্ধ হওয়ার পর এখন তাঁদের ক্রীতদাসের মতো ওই কারখানারই চৌহদ্দির ভেতরে বিভিন্ন রকম কায়িক শ্রম করিয়ে নেওয়া হচ্ছে।

দুর্দশাগ্রস্ত কর্মীদের একজন রতন মিয়া। ফেসবুকের মাধ্যমে  জানান, বাংলাদেশে তাঁদের কাছে ‘ইনভাইটেশন লেটার’ আসে। এরপর ২০১৫ সালের ১০ অক্টোবর আফগানিস্তান দূতাবাস থেকে তাঁরা ভিসা নেন। এরপর আফগানিস্তানে ওই ইস্পাত কারখানায় তাঁরা কাজ শুরু করেন। মালিকের নাম আবদুল্লাহ কান্দাহারি। আফগানিস্তানে যাওয়ার পর দুই মাস মিলের কার্যক্রম ভালোই চলছিল। প্রথম অবস্থায় দুই মাসের বেতনও দেওয়া হয়। কিন্তু এরপর থেকে তাঁদের কোনো বেতন দেওয়া হয় না। প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে মালিক বা কোনো দায়িত্ববান প্রতিনিধি প্রতিষ্ঠানে আসেন না। ফেরতও পাঠায় না।

অরুণ দে, রিপন আলী, এরশাদ দরজি  বলেন, তাঁরা দেশে ফিরতে চান। কিন্তু কোনো উপায় পাচ্ছেন না।

বরগুনার মো. মাসুদের ভাই আল মামুন বলেন, ‘ভাই ওখানে না খেয়ে আছে, আর এখানে তার বউ-বাচ্চাদের দিন চলে না। ভাইয়ের স্ত্রী জমি বেচে চলছে। এখন বাসায় কাজ করে খায়। বাচ্চাদের পড়াশোনা বন্ধ।’

মানিকগঞ্জের আবদুল কাদেরের স্ত্রী রেণু বেগম বলেন, ‘সাত মাস ধরে প্রায় না খেয়ে চলছি। কিস্তিতে টাকা তুলে কোনোমতে দিন চালাচ্ছি। আমার স্বামী দেশে থাকতে বিভিন্ন স্থানে গিয়ে কাজ করেছে। তা-ও সুন্দর সংসার চলত। কেন যে না বুঝে গেল।’

আফগানিস্তানে বাংলাদেশের কোনো দূতাবাস নেই। তবে ঢাকায় আফগান দূতাবাস আছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে কাবুলে আফগান ওয়্যারলেস কমিউনিকেশন কোম্পানির রেডিও অ্যাকসেস নেটওয়ার্ক নামের টেলিকম কোম্পানির উপদেষ্টা হিসেবে কর্মরত বাংলাদেশি নাগরিক ইমাম আহসান  বলেন, বাংলাদেশ সরকার যদি আফগান সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ করে ভিসার মেয়াদ উত্তীর্ণ হওয়ার জন্য যে জরিমানা হয়েছে তা মওকুফ করার ব্যবস্থা করে, তাহলে তাঁরা এই বিপদ থেকে উদ্ধার পাবেন।

হেরাতে আটকে পড়া ব্যক্তিদের একজন নারায়ণগঞ্জের তাজু মিয়া বলেন, তাঁর পরিবারের লোকেরা ঢাকায় আফগান দূতাবাসে কয়েক দফা যোগাযোগ করেছেন। প্রতিবারই দূতাবাস জানায়, তাঁদের দেশে ফিরিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থা করা হবে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হেরাত অফিস থেকেও কর্মকর্তারা যোগাযোগ করেছেন। কিন্তু কেউ কোনো উদ্যোগ নেননি।

বরগুনার শাহ আলম হাওলাদারের স্ত্রী নাজমা বেগম বলেন, ‘গত সোমবার ঢাকায় আফগান দূতাবাস থেকে আমাদের ডেকে বলেছে, দ্রুত আমার স্বামীসহ অন্যদের দেশে ফিরিয়ে আনবে। কিন্তু এমন কথা পাঁচ মাস ধরে বলে আসছে।’

জানতে চাইলে উজবেকিস্তানে নিয়োজিত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মসউদ মান্নান (আফগানিস্তান দেখভালের দায়িত্বে নিয়োজিত) গতকাল  বলেন, ‘আমরা গত ৪ আগস্ট এ বিষয়ে জানতে পেরেছি। সঙ্গে সঙ্গে আমরা এখানকার আফগান রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে যোগাযোগ করেছি, সব জানিয়েছি। এ ছাড়া বাংলাদেশে পররাষ্ট্র ও প্রবাসী মন্ত্রণালয়ে বিষয়টি জানিয়েছি। আশা করি দ্রুত এ তারা ফিরতে পারবে।’