• আজ বৃহস্পতিবার, ১৭ অগ্রহায়ণ, ১৪২৮ ৷ ২ ডিসেম্বর, ২০২১ ৷

চাপাতি দিয়ে নৃশংসভাবে নিজ হাতেই ফুটফুটে দুই সন্তানের গলা কাটেন ‘কলঙ্কিত’ সেই মা !


❏ রবিবার, আগস্ট ১৪, ২০১৬ আলোচিত বাংলাদেশ, স্পট লাইট

সময়ের কণ্ঠস্বর – রাজধানীর বাসাবো এলাকায় গতকাল (১৩ আগস্ট) দুই শিশু নিহত হওয়ার ঘটনায় শিশুদের পিতা মাহবুব রহমান তার স্ত্রী তানজিনা রহমানকে একমাত্র আসামি করে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেছেন।

নিহত দুই শিশু হুমায়রা বিনতে মাহবুব তাকিয়া (৬) ও মাশরাফি ইবনে মাহবুব আবরার (৭)। ‘ষড়ঋতু’ নামের ছয়তলা ভবনটির চিলেকোঠায় এ ঘটনা ঘটে। এ ঘটনার পর তাদের মা তানজিনা রহমান বাসা ছেড়ে চলে যান। পরে গতকাল ভোর ৪টার দিকে বাসার কাছ থেকে তাকে আটক করা হয়।

এ বিষয়ে সবুজবাগ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুল কুদ্দুস ফকির বলেন, নিহত দুই শিশুর বাবা মাহবুবুর রহমান এ ঘটনায় মামলা দায়ের করেছেন। মামলায় নাম উল্লেখ করা একমাত্র আসামি শিশুদের মা তানজিনা রহমান। আমরা তাকে গ্রেফতার করেছি।

তানজিনা রহমানকে গ্রেফতারের বিষয়ে ওসি বলেন, ঘটনা জানার পরপরই আমরা পুরো এলাকায় চেকপোস্ট বসিয়ে দেই। টহল পুলিশ বৃদ্ধি করে লাশ উদ্ধার করি। রাতভর আমরা আলামত সংগ্রহ, লাশ উদ্ধার ও সুরতহাল প্রতিবেদন করে ময়নাতদন্তের জন্য লাশ ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠাই।

ওসি বলেন, ঘটনার পর থেকেই নিহত শিশুদের মা নিখোঁজ ছিলেন। আমরা তাকে খুঁজছিলাম। রাত সাড়ে ৪টা বা ৫টার দিকে সবুজবাগের মসজিদ গলিতে তিনি হাঁটাহাঁটি করছিলেন। এ সময় আমাদের টহল পুলিশ তাকে জেরা করে। তিনি কোথায় যাবেন জানতে চাইলে, তানজিনা বলেন, ‘বাসাবোর সাততলা (চিলেকোঠাসহ) ভবন খুঁজতেছি।’ এসময় পুলিশের সন্দেহ হয়। পরে পুলিশও তাকে বলে, আমরাও সাততলার মানুষ খুঁজতেছি। এরপর তাকে আটক করে থানায় নিয়ে আসা হয়।

শনিবার সকালে তাকে পুলিশ প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ করে। এসময় তানজিনা প্রাথমিকভাবে হত্যার বিষয় স্বীকার করলেও পুলিশ এবিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনও কথা বলতে চায়নি।

এ ব্যাপারে জিজ্ঞাসাবাদ করতে তানজিনাকে ৫ দিনের রিমান্ডে নেয়া হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, রিমান্ডে কি কারণে তিনি নিজের সন্তানকে এমন নৃশংসভাবে হত্যা করেছেন তা জানা যাবে।

তবে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে নিজের দুই শিশুকে হত্যার কথা স্বীকার করেছেন তাদের মা তানজিনা রহমান। গতকাল আটকের পর পুলিশের কাছে নৃশংস এ হত্যার কথা স্বীকার করেন তিনি। চাপাতি দিয়ে নিজ হাতেই গলা কেটে সন্তানদের হত্যার কথা জানান তানজিনা। তিনি বলেন, চাপাতি দিয়ে নিজ হাতে ওদের গলা কাটি।

শিশুদের বাবা মাহবুব রহমান ঢাকা ওয়াসায় চাকরি করেন। মাহবুব রহমান জানান, শুক্রবার তিনি এশার নামাজ পড়তে গিয়েছিলেন। বাসায় ফিরে দেখেন, দরজা বাইরে থেকে বন্ধ। পরে দরজা খুলে ভেতরে প্রবেশ করে বিছানার ওপর একজনের এবং পাশের কক্ষে অন্য সন্তানের লাশ দেখতে পান। ওই সময় স্ত্রী তানজিনা রহমান ঘরে ছিলেন না। নিহত দুই শিশু মাদরাসায় পড়াশোনা করতো।

এদিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে দুই শিশুর ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়েছে। মেডিকেল কলেজের সহকারী অধ্যাপক ডা. সোহেল মাহমুদ নিহত দুই ভাইবোনের ময়নাতদন্ত করেন। তিনি জানান, ধারালো অস্ত্রের আঘাতেই ওই দুই শিশুর মৃত্যু হয়েছে। যেভাবে তাদের ধারালো অস্ত্র দিয়ে আঘাত করা হয়েছিল, তাতে ঘটনাস্থলেই তাদের মৃত্যু হয়।

সোহেল মাহমুদ আরো জানান, নিহত হুমায়রা বিনতে মাহবুব তাকিয়ার (৬) গলা ভারী ও ধারালো অস্ত্রের আঘাতে এমনভাবে কেটেছে যে, তার গলা শরীর থেকে প্রায় বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। ঘাড়ের পেছনের চামড়ায় সামান্য লেগে ছিল মাথা। আর মাশরাফি ইবনে মাহবুব আবরারের (৭) ঘাড়ের ডানপাশে দু’টি আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। এতে তার স্পাইনাল কর্ডসহ ঘাড়ের বেশ কিছু অংশ কেটে গেছে।

child-murder101-2

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার শেখ মো. মারুফ হাসান বলেন, একটি লাশ বেডরুমের বিছানায়, অন্যটি পাশের রুমে ছিল। মাহবুব রহমান ওয়াসার কম্পিউটার অপারেটর পদে চাকরি করেন। তিনি সন্ধ্যার পর বাড়ির বাইরে যান। পরে ফিরে এসে এ অবস্থা দেখতে পান। এ হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে আর কেউ জড়িত কিনা তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

তিনি বলেন, বাসা থেকে একটি চাপাতি উদ্ধার করা হয়েছে। জানা যায়, গত আট মাস ধরে তারা ওই বাড়িতে ভাড়া থাকেন। বাড়িটি একবছর আগে তৈরি হয়েছে। নিহত শিশুদের ফুফু লাইলা নূর বলেন, ২০০৮ সালে তাদের পারিবারিকভাবে বিয়ে হয়।

লাইলা নূর আরও বলেন, তানজিনা রহমান প্রায়ই দুঃস্বপ্ন দেখতেন। স্বপ্নে দেখতেন, তিনি নিজেই তার দুই সন্তানকে মেরে ফেলেছেন। তিনি আরো দেখতেন তার মা তার দুই সন্তানকে মেরে ফেলেছেন। তানজিনা রহমান তার স্বামীকে মেরে ফেলেছেন এমন স্বপ্নও দেখতেন মাঝে মধ্যে। তিনি আরো বলেন, গত ৩রা জুন তারা সপরিবারে নারায়ণগঞ্জের আমাদের বাসায় বেড়াতে গিয়েছিলেন। তখন তিনি সুস্থ ছিলেন। লাইলা নূর বলেন, খিলগাঁওয়ের বাগিচা এলাকায় নিহত শিশুদের নানার বাড়ি। তাদের নানা বেঁচে নেই। নানি, মামা ও খালারা সেখানে থাকেন। নিহত আবরার গত এক বছর ধরে স্থানীয় একটি মাদরাসায় পড়াশুনা করতো। মেয়েটাও কিছুদিন আগে মাদরাসায় ভর্তি হয়।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা মুস্তাফিজুর রহমান বলেন, আটকের পর প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে আসামি জানিয়েছে, চাপাতি দিয়ে নিজ হাতেই তিনি তার সন্তানদেরকে গলা কেটে হত্যার কথা জানান। এই পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, এ কথা বলার সময় তিনি কাঁদছিলেন। তবে কি কারণে তাদেরকে হত্যা করেছেন তা রিমান্ডে জানা যাবে। গতকাল বিকালে ঢাকা মহানগর হাকিম গোলাম নবীর আদালত এই রিমান্ড মঞ্জুর করেন। সবুজবাগ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আবদুল কুদ্দুস ফকির তাকে আদালতে হাজির করে তার ১০ দিনের রিমান্ড চান। আদালত শুনানি শেষে পাঁচদিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।

দুই সন্তান হত্যা: ৫ দিনের রিমান্ডে ‘ইতিহাসের কলঙ্কিত’ সেই মা